টাঙ্গাইলের নদী-খাল ও বিলগুলোতে চাষ হচ্ছে ধান

টাঙ্গাইলের নদী-খাল ও বিলগুলো ক্রমাগত ভরাট হয়ে দখল আর দূষণে হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময়ের খরস্রোতা নদীও এখন প্রায় সরু খালে পরিণত হয়েছে। সেইসঙ্গে নদীতে চাষ করা হয়েছে ধান।

মিল-কারখানার বর্জ্যে পানি দূষিত হয়ে জলজপ্রাণি প্রায়ই নদীতে ভেসে উঠছে। স্থানীয়দের অসচেতনতা ও প্রভাবশালীদের দখল প্রতিযোগিতায় নদী খালগুলো ঘর-বাড়ি, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও আবাদি জমিতে পরিবর্তিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, টাঙ্গাইল জেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া ১০টি বড় নদীর মধ্যে শুধুমাত্র যমুনা এখনও তার প্রমত্তা ধরে রেখেছে। ধলেশ্বরী, বংশাই, লৌহজং, খিরু, যুগনী, ফটিকজানি, এলংজানি, লাঙ্গুলিয়া ও ঝিনাই এবং শাখা নদীগুলো দখল আর দূষণে খালে পরিণত হচ্ছে। অথচ এসব নদীগুলোই এক সময় জীবনাচারের নিত্যসঙ্গী ছিল।

জেলার ভূঞাপুর ও বাসাইল উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝিনাই ও বংশাই নদী। বাসাইলের লাঙ্গুলিয়া নদী, মধুপুরের টোকনদী, গোপালপুরের বৈরান নদী, কালিহাতীর নিউ ধলেশ্বরী, এলংজানি, ফটিকজানি, মির্জাপুরের বংশাই এক সময় ছিল খরস্রোতা।

প্রমত্তা এসব নদী দিয়ে মহাজনী নৌকা চলাচল করত। নদী পাড়ের জেলেসহ অনেকেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এসব নদীর অধিকাংশই পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। তবুও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে নদীর বেশিরভাগ জায়গা। নদী দখল করে কোথাও পাকা ইমারত, কোথাও ইটভাটা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘর-বাড়ি, এমনকি আবাদি জমি বানিয়ে রীতিমত ধান চাষ করা হচ্ছে। এবারও এসব নদীর বুকে ধান রোপণ করা হয়েছে।

বংশী বা বংশাই নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। এটির দৈর্ঘ্য মোট ২৩৮ কিলোমিটার। নদীটি জামালপুর জেলার শরীফপুর ইউনিয়ন অংশে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণে টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলা অতিক্রম করে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

নদীটি সাভারের কর্ণতলী নদীর সঙ্গে মিলে কিছুদূর প্রবাহিত হয়ে আমিনবাজারে এসে তুরাগ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তুরাগ নদী আরও কিছুদূর প্রবাহিত হয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে। বংশাই নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২৩৮ কিলোমিটার। এই নদী চারটি জেলা যথাক্রমে জামালপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা এবং ১০টি উপজেলা যথাক্রমে জামালপুর সদর, মধুপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, বাসাইল, মির্জাপুর, সখিপুর, কালিয়াকৈর, ধামরাই, সাভার এবং ৩২১টি মৌজার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

মির্জাপুরের হাটুভাঙ্গা এলাকায় নদী দখল করে ১০-১৫টি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। বাসাইলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বংশাই নদীর দুই পারে গড়ে উঠেছে ইটভাটা আর রাইসমিল। লাঙ্গুলিয়া নদী পাড়ের বিশাল এলাকাজুড়ে বানানো হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। অনেক জায়গায় বাঁধ দিয়ে চলছে মাছ চাষ। কালিহাতীর বংশাই, সাপাই, ঝিনাই, ফটিকজানি, লাঙ্গুলিয়া ও নাংলাই নদীর দুই পাড় দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ঘর-বাড়ি, মিল ও কারখানা।

গোপালপুর উপজেলা সদরের বৈরান নদীর অস্তিত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশে পুরোটাই বোরোর আবাদ হয়। গোপালপুর পৌরসভার অংশে নদীর উভয় পাড় দখল করে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে ভূমিদস্যুরা।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাজাহান সিরাজ জানান, টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থানে অনেক নদী, খাল, বিল রয়েছে। বাসযোগ্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদী, খাল, বিল অপরিসীম ভূমিকা রাখে। ধলেশ্বরী, নিউ ধলেশ্বরী, লৌহজং, এলংজানি, ঝিনাই নদীতে প্রতিবছর পলি জমে। ওই পলি কেটে নেয়া এবং অপরিকল্পিতভাবে মাটি-বালু উত্তোলনের ফলে নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তন হয়।

তিনি আরও জানান, নিউ ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত অবাধ পানিপবাহ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অগ্রাধিকার ভিত্তিক ‘বুড়িগঙ্গা নদী খনন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে। নদী খনন করার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্ক অর্ডারও দেয়া হয়েছে। দ্রুত কাজটি শুরু হবে।

(টাঙ্গাইল সংবাদদাতা, ঘাটাইল.কম)/-