টাকা: একই অঙ্গে নানা রূপ

টাকা (৳, BDT) বাংলাদেশের মুদ্রা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশটির মুদ্রা হিসেবে ‘টাকা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই টাকাকে আমরা নানা কাজে ব্যবহারের সময় আমরা নানান রূপে দেখতে পাই। ব্যবহারের প্রকৃতি অনুযায়ী বদলে যায় যেন টাকার শাব্দিক অর্থ।

কাগুজে টাকা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ কর্তৃক প্রবর্তিত, আর ধাতব মুদ্রা বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রচলিত হয়। টাকার ভগ্নাংশ হল পয়সা, যার মূল্যমান ৳১-র ১০০ ভাগের ১ ভাগ। বাংলাদেশে ৳১, ৳২, ৳৫, ৳১০, ৳২০, ৳৫০, ৳১০০, ৳৫০০ এবং ৳১০০০ মুল্যমানের কাগুজে নোট প্রচলিত রয়েছে। এছাড়াও ১ পয়সা, ৫ পয়সা, ১০ পয়সা, ২৫ পয়সা, ৫০ পয়সা, ৳১, ৳২ এবং ৳৫ মূল্যমানের ধাতব মুদ্রাও প্রচলিত। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের পক্ষে কাগুজে নোট প্রচলন এবং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। ১ পয়সা, ৫ পয়সা, ১০ পয়সা, ২৫ পয়সা ও ৫০ পয়সা বর্তমানে অচল।

ভাষাবিদগণের মতানুসারে বাংলা টাকা শব্দটি সংস্কৃত ‘টঙ্ক’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যার অর্থ রৌপ্যমুদ্রা। বঙ্গ রাজ্যে সবসময় টাকা শব্দটি যেকোনো মুদ্রা বা ধাতব মুদ্রাকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। ১৪ শতাব্দীতে ইবন বতুতা লক্ষ্য করেছিলেন যে বাংলা সালতানাতের লোকজন, সোনা এবং রূপার ধাতবকে দিনার না বলে ‘টাকা’ বলতো। ১৯৭২ সালের ৪ঠা মার্চ বাংলাদেশি কারেন্সিকে ‘টাকা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।

১ হাজার টাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানের নোট। নোটটি ২০০৮ সালের ২৭শে অক্টোবর ইস্যু হয়। এর সামনের অংশে শহীদ মিনার এবং পেছনের অংশে কার্জন হলের ছবি রয়েছে। এতে মোট ১১টি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।

রাশিয়ার একটি অনলাইন এন্টারটেইনমেন্ট আউটলেটে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে বাংলাদেশী ৳২ নোট পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাংক নোটের মর্যাদা পেয়েছে। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুদ্রাও প্রতিযোগিতায় ছিল।

টাকাকে আমরা নানা সময়ে নানান রূপে দেখতে পাই। টাকার ব্যবহার অনুযায়ী টাকা আমাদের নিকট ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। টাকার খরচ করার বিভিন্ন উপায়ের কারণে এটি নানা রুপ ধারণ করে থাকে।

টাকা মসজিদ মাদ্রাসায় দিলে হয় দান। জনকল্যাণমূলক কাজে দিলে অনুদান। মন্দিরে দিলে হয় দক্ষিণা। স্কুলে দিলে তা বেতন বা ফিস। বিয়ের সময় জামাইকে দিলে সেটি হয় পণ। বিয়ের সময় স্ত্রীকে দিলে টাকা হয়ে যায় দেনমোহর। তালাকের সময় দিলে টাকা খোরপোশ। কাউকে দিলে টাকা হয় ধার বা ঋণ। ব্যাংক থেকে নিলে ঋণ। আদালতে টাকা দিলে জরিমানা। সরকারকে দিলে সেটি কর, ভ্যাট বা ট্যাক্স। সেই টাকাই অবসরে নিলে সেটি পেনশন। অপহরণে দিলে টাকা মুক্তিপণ রূপে। হোটেল বয়কে বা কাউকে খুশি হয়ে দিলে সেটি টিপস বা বখশিশ। কর্মচারীকে দিলে বেতন। শ্রমিককে দিলে মজুরী। বয়স্কদের দিলে ভাতা। অবৈধভাবে পেলে ঘুষ। লভ্যাংশ দিলে টাকা ধরা দেয় সুদ রূপে। অনুপ্রাণিত করতে দিলে ভর্তুকি। ফকিরকে দিলে ভিক্ষা। কিছু ব্যবহারের পর দিলে ভাড়া। বিশেষভাবে দিলে গিফট বা উপহার। অতিরিক্ত কাজের জন্য দিলে টাকা ওভারটাইম। নষ্ট করে দিলে ক্ষতিপূরণ। মানত করে দিলে সাদকা। বিশেষ পর্বে দিলে সেলামী। বিশেষ সময়ে দিলে আশীর্বাদ। অর্ডারের সময় দিলে টাকার রূপ অগ্রিম।

তাছাড়া অবৈধ টাকাকে কালো টাকা বলা হয়ে থাকে। অবশ্য সরকারকে কর দিয়ে কাল টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও আমরা টাকা জমাই সরকারি বেসরকারি ব্যাংকে বা নিজেদের ঘরে সংরক্ষিত স্থানে। বিপদের সময় সেই টাকা খরচ করে আমরা সেখান থেকে উদ্ধারে সহযোগিতা পাই।

টাকা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। টাকা ছাড়া আমাদের জীবন চালনা একেবারেই অচল। তাই আমাদের টাকা ব্যবহারে অধিক সংযত ও হিসেবের মাধ্যমে করা উচিৎ। যদিও বর্তমানে বিপুল পরিমাণের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা হতাশাজনক। এদিকে ধনীরা আরও ধনী ও গড়িবরা আরও গড়িব হয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় মুদ্রাস্ফীতির নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে।

টাকা তৈরির সময় এর কিছু শৈল্পীক দিক দেখা হয়। এর কাগজের মান, রং, নিরাপত্তার বিষয় দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় টাকায় পরিবর্তন এনে থাকে। জাল প্রতিরোধের জন্যই এ কাজটি করে তারা। তবে আগের থেকে টাকার গুণগত মান অনেক উন্নত হয়েছে। যদিও টাকা ছাপানোর ক্ষেত্রে কাঠামোগত কোনো আদর্শ দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো নীতিমালা না থাকায় এমনটা ঘটেছে বলে ধারণা। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের রদবদলের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রার নকশা ও আকার পরিবর্তন করা হয়। বাইরের দেশগুলো টাকা ছাপানোর ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রযুক্তির দিক থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইলডটকম)/-