জেলে বসে এমপি রানা ঘাঁটছেন ঘাটাইল

টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের এমপি আমানুর রহমান খান রানা। তিনি এলাকায় না থাকলেও বিভিন্ন সময়ে তাঁর পক্ষে সভা-সমাবেশ করার চেষ্টা করেছে তাঁর অনুসারীরা। তারা নিয়মিত রানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবুর নেতৃত্বে দলের কয়েকটি কর্মসূচি পালনকালে পাল্টাকর্মসূচি দেয় রানার অনুসারীরা। ফলে সহিংসতা এড়াতে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে উপজেলা প্রশাসন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, আত্মসমর্পণ করার পর এমপি রানা কারাগারে গেলে তাঁর অনুসারীদের অনেকের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। কেউ কেউ অন্য পক্ষেও চলে যায়। তবে রানার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অনুসারী দলের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে। তারা এমপি রানার কর্মী, সমর্থক ও অনুসারীদের চাঙ্গা রাখতে চেষ্টা করছে।

ঘাটাইলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আমানুর রহমান খান রানার অনুপস্থিতিতে তাঁর গ্রুপ আগলে রাখছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান সামু, ভাইস চেয়ারম্যান মো. আরিফ হোসেন, জামুরিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহিদুল ইসলাম হেস্টিংস, যুবলীগ নেতা সুজন তালুকদার, পৌর আওয়ামী লীগ নেতা খলিল তালুকদার, একসময়ের বিএনপি নেতা ধলাপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ববিন হায়দার চৌধুরী সাদীসহ কয়েকজন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলা ও এমপি রানার ফাঁসির দাবিতে যখন সোচ্চার, তখন এমপি রানার অনুসারীরা তাঁর মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় ছিল। উপজেলার পাহাড়িয়া অঞ্চলে এমপি রানার তৈরি করা বলয় এখনো আছে। এর প্রভাব পড়েছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ছয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিপরীতে রানার অনুসারীরা প্রার্থী হন। রসুলপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে তাঁদের প্রার্থী বিজয়ী হন। সংগ্রামপুর ইউনিয়ন ছাড়া বাকি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীদের পরাজয়ের পেছনেও রানার অনুসারীদের ভূমিকাকে দায়ী করে স্থানীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ।

ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু বলেন, আমানুর রহমান খান রানা কারাগারে বসেই তাঁর কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করতে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ভোটের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে। তিনি আরো বলেন, এমপি রানা কারাগারে যাওয়ার আগে টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন বরাদ্দ তাঁর ‘বাহামভুক্ত’ লোকদের দিয়েছেন। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে সব কিছু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এভাবে তিনি একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। সেই বাহিনীর সদস্যরা এখনো প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে।

ঘাটাইল জিবিজি কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি আবু সাঈদ রুবেল জানান, কাশিমপুর কারাগারে থাকা আমানুর রহমান খান রানার নির্দেশে সন্ত্রাসীরা ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি জুব্বার ওরফে বাবু আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নির্দেশদাতা হিসেবে রানার নাম উল্লেখ করেন।

রুবেল আরো জানান, ২০১৩ সালে ৬ নভেম্বর গভীর রাতে রানার ক্যাডার বাহিনী উপজেলার জোড়দিঘীর মালিরচালা গ্রামের ফার্নিচার ব্যবসায়ী সোহরাবের স্ত্রী মমতাজ বেগমকে ঘর থেকে বের করে মারধর করে। আরো দুটি বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ডিম থেকে শুরু করে সব কিছু থেকেই কমিশন নিত রানার অনুসারীরা।

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরন বলেন, এমপি আমানুর রহমান খান রানার অনিয়ম, দুর্নীতি, জমি দখল, খুন-খারাবির খবর টাঙ্গাইলের সবাই জানে। তিনি প্রশাসনকে জিম্মি করে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছিলেন। তিনি প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদা, কমিশন আদায় করেছেন। ঘাটাইলে ঝড়ের সময় টাঙ্গাইল শহরের দোকান থেকে যে টিন বিতরণ করা হয় সে টিনের দাম তিনি পরিশোধ করেননি। রানা কারাগারে থেকেও তাঁর সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করেননি। তাঁর বাহিনী এখন বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে প্রভাবিত করছে।

তবে এমপি রানার অনুসারী ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহিদুল ইসলাম হেস্টিংস বলেন, ‘এমপি রানা ঘাটাইলের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তিনি প্রায় তিন বছর ধরে এলাকায় নেই। তার পরও তাঁর মাঠ তাঁরই আছে। এমপি রানা কারাগারে থাকায় তাঁর নেতাকর্মী-অনুসারীদের ঘাটাইলে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। রানাকে ছাড়া বর্তমান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। মাত্র একটিতে তাদের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। আমাদের প্রভাব না থাকলে সবগুলোতে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করতেন। আমরা নৌকার জন্য সর্বস্ব দিয়ে কাজ করতে পারি। তাঁকে (রানাকে) মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘাটাইলে রানার মতো নেতার বিকল্প নেই।’

(অরণ্য ইমতিয়াজ, কালেরকণ্ঠ/ ঘাটাইল.কম)/-