জেলা-উপজেলার হরেক কালারের সংবাদকর্মীদের কাসুন্দি

তখন সন্ধ্যা ৬টা। সহকর্মী দুই সংবাদকর্মীকে নিয়ে টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানায়। এক ধর্ষণ মামলার তথ্য জানতে গমণ। হাজির হবার মিনিট পাঁচেক পর পুলিশ কর্মকর্তার ফোন বেঁজে উঠলো। তিনি কল রিসিভ করলেন। কথার শুরুতেই মোবাইল নড়াচড়ায় অসাবধানতাবশতঃ লাউড স্পীকার অন হলো। ফলে উভয়ের টক আমাদের কানে এসে ধাক্কা গেলো। অপর প্রান্তে যিনি ছিলেন, তিনি একটি জাতীয় দৈনিকের সাবেক জেলা প্রতিনিধি। টেলিভিশন চ্যানেলেও কাজ করতেন। নিজের একটি পত্রিকাও রয়েছে। টাঙ্গাইল প্রেসক্লাব থেকে কয়েকমাস আগে তাকে বহিস্কার করা হয়েছে। প্রেসক্লাবের সভাপতি জাফর আহমেদ জানিয়েছিলেন, অনৈতিক ও অপেশাদার সুলভ কাজের অভিযোগেই তাকে বহিস্কার করা।

অথচ ওই বহিস্কৃত সাংবাদিক ওই জাতীয় দৈনিকের পরিচয়ে, যে দৈনিক থেকে তিন বছর অাগেই প্রতিনিধির পদ থেকে বাদ পড়েছেন, সেটির পরিচয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তার নিকট আর্থিক সহযোগিতা চান। তাকে বললেন, অফিসের সব কম্পিউটার নষ্ট হয়ে গেছে, সাংবাদিকতার কাজ করা যাচ্ছেনা, তাই ডোনেশন দরকার। ওই পুলিশ অফিসার ডোনেশনের কথা শুনে কিছুটা চুপসে গেলেন। মৃদূস্বরে বললেন, ভাই, নতুন এসেছি, পরে জানাবো। দপ করে তিনি হাতের যন্ত্রটি বন্ধ করলেন। আমাদের কৌতূহল উদ্দীপক চোখমুখ দেখে কিছুটা বিব্রত হলেন। সহসা আলোচনায় ভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণায় হালকা হতে চাইলেন।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী নামক একটি উপজেলা রয়েছে। সেই উপজেলায় বেশুমার সাংবাদিক রয়েছে। সেখানে ঘরে ঘরে বিরাজ করছে সংবাদকর্মী । সেখানে দুতিনটে প্রেসক্লাব, সাংবাদিক সংস্থা ও সাংবাদিক সমিতি রয়েছে। ইদানিং সাংবাদিক ইউনিয়ন ও গড়ে উঠেছে। সাংবাদিকে গিঁজগিজ করায় এ উপজেলায় অনেক সময় তাদের স্থান সংকুলাণ হয়না। এজন্য বাড়তিরা প্রায়শঃ পাশ্ববর্তী উপজেলা ঘাটাইল, মধুপুর, ধনবাড়ী, গোপালপুর বা ভূঞাপুর উপজেলায় হিজরত করে থাকেন। চকচকে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে তারা ওই সব উপজেলার অফিস আদালত বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঘুরে বেড়ান বা সওয়াল করেন। প্রথমে দামি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটান। ছবি তোলেন। এরপর নানা অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে আনেন। বাঙলাদেশে তো অনিয়ম আর দুর্নীতির অভাব নেই; সে সবকে উপজীব্য করে কোনঠাসার কোঁশেস চালান। সুযোগ বুঝে আর্থিক চাপ দিয়ে থাকেন। নিচের পোস্টে দেয়া ক’টি ভিজিটিং কার্ডে চোখ বুলালেই বুঝতে পারবেন উনারা কতো কতো বড় সাংবাদিক বা পন্ডিত।

ঢাকা থেকে এক সময়ে বের হতো ‘দৈনিক শ্যামবাজার’। ২০০৫ সালের জুন মাসে ওই পত্রিকার চীপ রিপোর্টার আবুল কালাম এলেন মধুপুর। একটি যৌন অপরাধের ঘটনা তদন্তে। সাথে ছিলেন কালিহাতী উপজেলার এক সাংঘাতিক (সাংবাদিক)। এরা মধুপুরের জটাবাড়ী গ্রামে আসামীর বাড়ি হাজির হয়ে ভয়ভীতি দেখালেন। কিছু পথ কর ও আদায় করলেন।

এরপর তারা পাশ্ববর্তী পোদ্দারবাড়ী গ্রামে ভিক্টিমের বাড়ি গমণ করেন। ভিক্টিমের বাবামা অপ্রীতিকর বিষয়টি চেপে যেতে চেয়েছিলেন বলে কোনো আইনের আশ্রয় নিতে চাননি। কিন্তু শ্যামবাজারের চীপ রিপোর্টার ভিক্টিমের বাবামাকে চাপাচাপি শুরু করেন। বলা হয়, তারা পুলিশের বাপ। তাদের কাছে সব কথা অকপটে বলতেই হবে। এরপর ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ভিক্টিমের ছবি তুলতে গেলেই বাঁধে গোল। ভিক্টিমের আত্মীয় ছিলেন মধুপুর উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আমজাদ হোসেন। তাকে ফোন করা হয়। তিনি ওই দুই সাংঘাতিককে বেঁধে মধুপুর শ্রমিক দলের অফিসে নিয়ে যেতে নির্দেশ দেন।

কথামতো পিঁঠমোড়া করে বেঁধে শ্রমিক দলের অফিসে নেয়া হলো। বেশ কিছু উত্তমমধ্যম দেয়া হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় মিডিয়া কর্মীরা গিয়ে মারধোরে অবস্থা খুব কাঁহিল দেখলাম। আটককৃতদের পুলিশে সোপর্দ করার পরামর্শ দেয়া হলো। এর মধ্যে শ্যামবাজারের এডিটরকে ফোন করা হলো। তিনি পুরো কাহিনী শুনে বললেন, ‘ওকে মধুপুর যেতে কোনো এ্যাসাইনমেন দেয়া হয়নি। কাজেই উদ্ভুদ পরিস্থিতির জন্য অফিস দায়ী নয়’ বলেই ফোন কেটে দেন। শ্রমিকরা ওদের নিয়ে মধুপুর থানায় যান। ওসি আবুল খায়ের সুনির্দিষ্টভাবে মামলা দায়ের ছাড়া এদের গ্রহনে অস্বীকৃতি জানান। কেউ মামলার বাদী হতে না চাওয়ায় শ্রমিকরা বেকায়দায় পড়েন। শেষ পর্যন্ত হোটেলে পেটপুরে খাওয়িয়ে নাইটকোচে ওদের তুলে দেন ঢাকার উদ্দেশ্যে।

ঢাকাতে যারা মিডিয়া কর্মী বা সাংবাদিকতা করেন তাদের নিয়ে বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। কারণ আমি কাজ করি, থাকি মফস্বলে। কয়েকটি উপজেলা- জেলার আনাচেকানাচে আমার বিচরণ। এ পরিসরে যারা মিডিয়ায় কাজ করেন, তাদের অনেককেই চিনি গোড়া থেকে শিরদাঁড়া পর্যন্ত। সিন্ডিকেটে ধান্ধাবাজিই অধিকাংশের মূলমন্ত্র। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে যারা কাজ করেন তাদের নিয়ে কথা না বলাই ভালো। বেকার, বেয়াদব, বেশরম, বেহায়া, বেলাজরা এ পেশায় কিলবিল করছেন। মাঝে ভালো দু’চারজন যারা রয়েছেন তারা সুস্থভাবে কাজ করার সুযোগ পান না। হতাশ তারা।

বছর দশেক আগে ঢাকার একটি টেলিভিশন চ্যানেলে “চাঁদাবাজ জব্বর আলী” শিরোনামে নাটক দেখে ছিলাম। এতে পত্রিকার এডিটর চরিত্রে অভিনয় করেন প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন। পুরো কাহিনী জুড়ে ছিল সংবাদকর্মী ও মিডিয়া জগতের চাঁই থেকে চাঁদাবাজদের কল্পকাহিনী। মালিক বা এডিটর ধান্ধাবাজ হলে তৃণমূল পর্যন্ত গ্রামীন সাংবাদিকতায় শক্ত চেইন গড়ে তোলে কিভাবে শাখরেদরা মলমূত্র ভক্ষণ করে, তার সরেস বর্ণনা ছিল এ নাটকে। ঢাকাইয়া মিডিয়ায় এখনো অনেক জব্বর আলী বিরাজমান। আর জব্বরদের শিষ্যরা কিলবিল করছে জেলা উপজেলায়।

অনেকেই মফস্বল সংবাদকর্মিদের এমন নষ্টামীর জন্য খোদ মিডিয়া মালিক বা নীতি নির্ধারকদের দায়ী করেন। এখন দেশে বড় বড় করপোরেট হাউজ মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করায় এসএসসি পাশ লোকরা কোনো কোনো হাউজের এডিটর, নিউজ এডিটর বা কর্মাধ্যক্ষ। কখনো শিক্ষিতরা এসব পদ অলঙ্কৃত করলেও তারা ব্যক্তিত্মহীন, পদলেহনকারি অথবা স্বার্থান্ধ। মফস্বলের দিকে তাদের সুদৃষ্টি নেই। এ সুযোগে পুরোটাই দখলে নেয় নষ্টারা। গ্রামীন সাংবাদিকতায় সেই নষ্টা কবিতার প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই। ‘নষ্টা তুমি, নষ্ট বানাও, নষ্ট করো ঘর, নষ্ট হয় সমাজ, সংসার, নষ্ট হয় দেশ।

(জয়নাল আবেদীন, সিনিয়র সাংবাদিক/ ঘাটাইলডটকম)/-