জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন ও টাকা ভাগাভাগির গল্প

0Shares

এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা। এর মাঝে প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হবে ৪৫০ কোটি টাকা। তৈরি হবে পাঁচটি ছাত্রাবাস। স্থান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু গোল বেঁধেছে দুটি সংবাদে। প্রথমটিতে বলা হয়েছে, ছাত্রাবাস নির্মাণ করতে গিয়ে ঠিকাদাররা ইতিমধ্যে ৫০০ গাছ কেটে ফেলেছেন। আর দ্বিতীয় সংবাদটি আরও ভয়ঙ্কর-ঠিকাদারদের ‘কাজ’ নিশ্চিন্ত করতে ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা দিতে হয়েছে। খোদ উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্যরা নাকি তার নিজের বাসায় মিটিং করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে এই টাকা ভাগ করে দেন- এমন অভিযোগ উঠেছে। এর পেছনে কতটুকু সত্যতা আছে, জানি না। কিন্তু একাধিক সংবাদপত্রে এ খবর ছাপা হয়েছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, এ ধরনের টাকা ভাগাভাগির সঙ্গে দুর্নীতির প্রশ্ন যেহেতু জড়িত, সেহেতু কেউই এটা স্বীকার করে না। উপাচার্য ও ঠিকাদাররাও এটা স্বীকার করেননি। তবে উপাচার্য এটা স্বীকার করেছেন যে, তার বাসায় তিনি ছাত্রলীগের নেতাদের নিয়ে মিটিং করেছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক। ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নিয়ে তিনি মিটিং করতেই পারেন; কিন্তু টাকা ভাগাভাগির বিষয়টি যখন ওঠে, তখন তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয় বৈকি।

দুঃখ লাগে তখনই, যখন দেখি ছাত্ররা কেটে ফেলা গাছে কাফনের কাপড় জড়িয়ে ক্যাম্পাসে ‘শবযাত্রা’ করছে। রাতের বেলা পালা গানের আয়োজন করে স্লোগান তুলছে। জাবিতে নাকি টাকার বাগান রয়েছে- এ রকম একটা ব্যানারও দেখলাম। তাতে লেখা- ‘স্বৈরাচার্যের মাস্টারপ্ল্যান চ্যাট’! উপাচার্য আর স্বৈরাচার- দুটিকে এক করে ছাত্ররা শব্দ বানিয়েছে ‘স্বৈরাচার্য’। কী লজ্জার কথা।

একজন উপাচার্য স্বৈরাচার হবেন কেন? এ জন্যই কি বিশ্ববিদ্যালয়! আমার দুঃখ লাগে, এই বিশ্ববিদ্যালয়েই আমি আমার শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছি। কী বিশ্ববিদ্যালয় রেখে যাচ্ছি আমরা। সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে’ এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু এই টাকা নিয়ে নয়ছয় হবে, তা কাম্য নয়।

উপাচার্য তার দায় এড়াতে পারেন না। শিক্ষকতা জীবনের অনেকদিন তো পার করলাম। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের নিয়োগ আর উপাচার্যদের নানা কাহিনী যখন কাগজে ছাপা হয়, তখন শিক্ষক হিসেবে আমাদের মানমর্যাদা আর থাকে না। একজন উপাচার্যের কাহিনী কাগজে ছাপা হয়েছিল। তিনি প্লেনে চড়ে সকাল-বিকেল অফিস করেন। মাসের বেশিরভাগ সময় ঢাকাতেই থাকেন। আরেকজন উপাচার্য নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল অবৈধ সন্তানের পিতৃত্বের। দেশে প্রায় ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি। খুব কম সংখ্যক উপাচার্যই আছেন যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে এর আগেও অভিযোগ করেছিলেন তার সহকর্মীরাই। যারা অভিযোগ করেছিলেন, তারা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক। সম্প্রতি তারা আবারও একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন আর তা ছাপাও হয়েছে সংবাদপত্রে। শিক্ষকরা ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতি আর আত্মীয়করণের দাবি তুলে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। অভিযোগটি গুরুতর, সন্দেহ নেই তাতে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা ইউজিসি অভিযোগ কতটুকু আমলে নেবে, নিশ্চিত করে তা বলতে পারব না। কিন্তু দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো বাছবিচার করা ঠিক না। শিক্ষকও যদি দুর্নীতি করেন, তাকেও সবার মতো আইনের আওতায় আনতে হবে। সংবিধান আমাদের সমদৃষ্টিতে দেখেছে। অর্থাৎ আইনের চোখে সবাই সমান।

একজন ডিআইজি মিজান যদি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাবরণ করতে পারেন, একজন জেলার পার্থের কাছে যদি অবৈধভাবে অর্জিত ৮০ লাখ টাকা পাওয়া যায় এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে জাহাঙ্গীরনগরের ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে যদি আদৌ কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকে, তার বিচার হবে না কেন? বিশ্বাস রাখতে চাই, এ ঘটনায় উপাচার্য নির্দোষ। তার নিজের সম্মান ও উপাচার্যের পদের সম্মানের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে তিনি উল্লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারেন। ইউজিসি কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও পারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে।

আমার মনে আছে, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই উপাচার্যকে দুদক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তাদের চিঠি দিয়ে তলব করেছিল। দুদকের ওই সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হয়েছিল। শিক্ষকরাও যে ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ নন, তা দুদকের নোটিশ পাওয়ার পর প্রমাণিত হয়েছিল। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ওই উপাচার্যদের একজন সেখানে নিয়োগে বাণিজ্য করেছিলেন। অপরজন প্রতিদিন নাশতার সাত হাজার টাকা বিল করে ও উত্তোলন করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন। এখন জাহাঙ্গীরনগরে দুই কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে উপাচার্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনেছেন স্বয়ং শিক্ষকরা। সুতরাং একটি তদন্ত কমিটি গঠন অত্যন্ত জরুরি।

গাছ কাটার অভিযোগ তো প্রমাণিত। উপাচার্যই দায় এড়ান কীভাবে? বিশ্বব্যাপী গাছ লাগানোর ব্যাপারে যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে, সে ব্যাপারে কি উপাচার্য অবগত নন? পরিবেশ রক্ষায় গাছের প্রয়োজন অনেক বেশি। বিশ্বের উষ্ণতা রোধকল্পে গাছের কোনো বিকল্প নেই। গাছ লাগানোর ব্যাপারে যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে, তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে।

নিউজিল্যান্ড সরকার ১০০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করছে পরিবেশ রক্ষার জন্য (Educate inspire change, 19 , ১৯ আগস্ট)। দেশটি ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চায়। এ জন্যই গাছ লাগানোর এই পরিকল্পনা। ফিলিপাইন নতুন একটি আইন প্রণয়ন করেছে, ওই আইনে একজন শিক্ষার্থী ১০টি গাছ না লাগালে তাকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি দেওয়া যাবে না। ইতিমধ্যে আইনটি ফিলিপাইনের আইন সভায় পাসও হয়েছে (inrider, ২৯ মে ২০১৯)।

ভারতের দৃষ্টান্ত দিই। উষ্ণতা রোধকল্পে উত্তরপ্রদেশের উত্তরাঞ্চলে স্কুল শিক্ষার্থীরাসহ সবাই একদিনে ২২ কোটি গাছ লাগিয়েছে। অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশের মোট বাসিন্দা ২২ কোটি। সবাই একটি করে গাছ লাগিয়েছেন ১৪,৩০,৩৮১টি জায়গায়, যার মাঝে আছে ৬০ হাজার গ্রাম আর ৮৩ হাজার জঙ্গলের চিহ্নিত এলাকা। এই তথ্য দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। (USA Today, ৯ আগস্ট ২০১৯)।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে তিনটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে উল্লেখ করেছিলেন- ÔClimete change is a security threat. We must act now. অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি। এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শেখ হাসিনা সম্মেলনে বলেছিলেন- ‘ÔThe time to act on climate changes is now, if anyone still doubts climate change, even shightly, I invite you to visit Bangladesh. I am ready to walk with you to show how climate change silently impacts the lives of million.Õ (WEFORUM. ORG, 26 March, 2019)।

সুতরাং গাছের প্রয়োজনীয়তা যে কতটুকু তা কি উপাচার্য জানেন না? নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে এটা তার অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু তারপরও তার প্রশাসন ৫০০টি গাছ কাটার অনুমতি দিলো কীভাবে? যেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তিনটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান, সেখানে আমরা ৫০০ গাছ কেটে ফেললাম!

আমাদের উন্নয়ন দরকার। ছাত্রাবাস দরকার। শিক্ষকদের জন্য আবাসন দরকার। গবেষণাগার দরকার। কিন্তু গাছ কেটে আবাসিক ভবন আমরা নির্মাণ করব না। জাহাঙ্গীরনগরে অনেক পরিত্যক্ত জায়গা রয়েছে, সেখানে ভবন নির্মাণ করা যেত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশবিজ্ঞান কিংবা আরবান প্ল্যানিং বিভাগ রয়েছে। তাদের পরামর্শ নেওয়া যেত কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ে উপাচার্য পরিবেশবাদীদের কাছ থেকে মতামত নিতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা নিলেন না। দুঃখ এখানেই।

এখনও সময় আছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করা যেতে পারে। আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা পুনঃমূল্যায়ন করা সম্ভব। ৫০০ গাছ কেটে আমরা অনেক ক্ষতি করে ফেলেছি। আসুন, ওই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একদিন সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি করে গাছ লাগাই। এই গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের ‘ভুল’ সংশোধন করতে পারি।

(তারেক শামসুর রেহমান, অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, tsrahmanbd@yahoo.com, ঘাটাইলডটকম)/-