জাল দলিল দিয়ে মির্জাপুরে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা উত্তোলন

নাম মেছের উদ্দিন। বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই নাজিরপাড়া এলাকায়। তার সহায়-সম্বল নেই বললেই চলে। তার ক্রয় করা চার শতাংশ জমিও জাল দলিল করে দখল করে নিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ফিরোজ হায়দার খান। শুধু দখল নিয়েই খান্ত হননি, সেই জাল কাগজপত্র দিয়ে তুলে নিয়েছেন গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন রাস্তার প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের টাকাও।

এমন অভিযোগ করেছেন জমির প্রকৃত মালিক মেছের উদ্দিন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ফিরোজ হায়দার খান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গোড়াই মমিননগর মৌজার ১৮২১ খতিয়ানের ৩৩০৫ দাগের চার শতাংশ জমি বাবার ওয়ারিশ থেকে পাওয়া মৃত আফাজ উদ্দিনের মেয়ে ছাহেরা বেগম ১৯৯৪ সালের ৯ জানুয়ারি একই এলাকার আব্দুল কদ্দুছ খানের কাছে বিক্রি করে দেন।

আর এ জমি বিক্রির সময় দলিলের চেনা সাক্ষী হন ছাহেরার ভাই বেল্লাল হোসেন।

পরবর্তীতে ছাহেরার অপর ভাই মেছের উদ্দিন বিক্রিকৃত সেই চার শতাংশ জমি নিজে কিনে নেবেন বলে কদ্দুছ খান ও স্থানীয় মাতবরদের অবহিত করেন।

পরে এ নিয়ে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে কদ্দুছ খান ক্রয় করা চার শতাংশ জমি ১৯৯৫ সালের ১৪ নভেম্বর মেছের উদ্দিনের কাছে বিক্রি করে দেন।

বোনের জমি ফেরত নিয়ে মেছের উদ্দিন ভোগদখল শুরু করেন।

বছর দুই পরেই তৎকালীন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ফিরোজ হায়দার খান জাল দলিল করে বিএনপি সরকারের সময় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সেই জমি থেকে মেছের উদ্দিনকে উচ্ছেদ করেন।

পরে বাধ্য হয়ে মেছের উদ্দিন একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে চলমান রয়েছে।

এদিকে সেই চার শতাংশ জমির মধ্যে দুই শতাংশ জমি চার লেন রাস্তার প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়ে যায়।

আর এ সুযোগে বিএনপি নেতা ফিরোজ হায়দার খান সরকারি কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে জমির জাল কাগজপত্র দিয়ে দুই শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণের টাকাও তুলে নেন।

এরপর বাকি ভূমিতে গড়ে তোলা হয়েছে দ্বিতীয় তলা একটি ভবন। তার নিচতলা ভাড়া দেয়া হয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে। আর দ্বিতীয় তলা এখনও নির্মাণাধীন।

এছাড়া ইয়ুথ মিলস সংলগ্ন পাঁচতলা নির্মাণাধীন ভবন দেখিয়ে সাত কোটি টাকা, কমফিট মিল সংলগ্ন পাঁচতলা নির্মাণাধীন ভবন দেখিয়ে সাত কোটি টাকা, অন্যের জমি জাল দলিল করে তিনতলা নির্মাণাধীন ভবন দেখিয়ে আট কোটি টাকা ও ভূমি অধিগ্রহণের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ নিয়ে স্থানীয় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মীর এনায়েত হোসেন মন্টু ভূমি মন্ত্রণালয় বরাবর গত ৯ জুলাই একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অপরদিকে বিএনপি নেতা ফিরোজ হায়দার খান উপজেলার গোড়াই মমিননগর এলাকায় খতিয়ান নং-ইজা-১ (৩০৯), দাগ নং- ২৮৬১, শ্রেণি পুকুর ও জমির পরিমাণ ০.৮৪ একর ভূমি রাতের আঁধারে সরকারি খাসপুকুর ভরাট করে চারিদিকে দেয়াল নির্মাণ করতে শুরু করেন।

পরে উপজেলা প্রশাসন খবর পেয়ে সরকারি খাসপুকুর ভরাটের কাজ বন্ধ করে দেন এবং চারিদিকে দেয়া দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়।

সেই সাথে সেখানে একটি বিলবোর্ড টাঙিয়ে দেয় প্রশাসন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবদুল মালেক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জুবায়ের হোসেন।

ফিরোজ হায়দার খান জানান, ৩৩০৫ দাগের জমি মেছের উদ্দিনের ছোট ভাই বেল্লাল হোসেনের কাছ থেকে তিনি ক্রয় করেছেন এবং তিনি সেই ভূমির দুই শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের কিছু টাকা পেয়েছেন এবং কিছু টাকা এখনও বাকি রয়েছে; তা কিছুদিনের মধ্যে পাওয়া যাবে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জুবায়ের হোসেন জানান, মূল কাগজপত্র মোতাবেক ৩৩০৫ দাগের ভূমির প্রকৃত মালিক মেছের উদ্দিন।

কিন্তু কীভাবে ওই জমি ফিরোজ হায়দার খান দখল নিয়েছেন তা তার জানা নেই।

তবে মেছের উদ্দিন উচ্ছেদের কোনো মামলা করলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়া যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে সরকারি খাসজমি দখল করতে চায় তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(মির্জাপুর সংবাদদাতা, ঘাটাইল ডট কম)/-