জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান

ভবন, শ্রেণিকক্ষ ও আসবাবপত্রসহ নানা সংকটের কারণে রাষ্ট্রপতির হাতে পুরস্কারপ্রাপ্ত টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা সদরের নারী শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠদান চলে খোলা আকাশের নিচে। বর্তমান দক্ষ পরিচালনা পরিষদ ও শিক্ষকমণ্ডলীর অক্লান্ত শ্রমের ফলে বিদ্যালয়ের ফলাফল সন্তোষজনক হলেও নানা সমস্যায় বিদ্যালয়টি জর্জরিত।

শনিবার (২৯ মার্চ) বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ইংরেজি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক খুঁশী মোহন সরকার বিপুল সংখ্যক ছাত্রীদের নিয়ে প্রখর রোদে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করছেন। তার মত অনেক শিক্ষকই গাছের নিচে ছাত্রীদের পাঠদান করাচ্ছেন।

বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম মাখন বলেন, আমরা কয়েকজন স্কুল পরিচালনা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। বিদ্যালয়টি উন্নয়নে কার ভূমিকা কী তাও পরিস্কার করে বলতে পারছি না। টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুক বিদ্যালয়টি পরিচালনা পরিষদের সভাপতি। অপরদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. একাব্বর হোসেন মির্জাপুর আসনের এমপি। মির্জাপুরের কৃতি সন্তান এই দুই নেতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়টির করুন অবস্থা।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন বাইমহাটি মৌজায় ২৫৫ শতাংশ জমির ওপর মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাবেক এমপি ফজলুর রহমান খান ফারুক। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে উপজেলা সদরসহ আশপাশের কমপক্ষে অর্ধশত গ্রামের ছাত্রীরা শিক্ষার সুযোগ পায়। ইতোমধ্যে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্রী উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন দফতরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়টি সফলতার জন্য ২০০৪ সালে জাতীয় পুরস্কারও পায়।

বর্তমানে এই নারীশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে এসএসসি সাধারণ শাখা ও ভোকেশনালের তিনটি ট্রেডসহ ১ হাজার ৫৪১ জন ছাত্রী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষার্থীদের চাপের কারণে চারটি শাখায় পাঠদান করা হয়। বিদ্যালয়টিতে রয়েছে চরম শিক্ষক সংকট। নীতিমালা অনুয়ায়ী বিদ্যালয়টিতে ৪০ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও রয়েছে ২৫ জন শিক্ষক।

ক্লাস রুম ও বেঞ্চ সংকটের কারণে গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করতে হয় ছাত্রীদের। অনেক সময় উপস্থিতি বেড়ে গেলে বারান্দা ও খোলা আকাশে নিচে মাঠে বসে ক্লাস করতে হয় ছাত্রীদের। তাও আবার এক শিক্ষক দিয়ে দুই পাশে দুই শাখার ছাত্রীদের বসিয়ে ক্লাস নিতে হয়। বিদ্যালয়টিতে একাডেমিক কোন ভবনও নেই।

জানা গেছে, বর্তমান সরকারের সময়ে এ উপজেলার প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণসহ রাস্তা-ঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ করে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করা হলেও নারীশিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখা এই বিদ্যালয়টিতে নতুন কোন ভবন নির্মাণ না হওয়ায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সুলতান উদ্দিন বলেন, টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান খান বিদ্যালয়টি প্রধান ফটকে একটি গেট, ছাত্রীদের জন্য ওয়াশ রুম ও শ্রেণিকক্ষের সিলিং নির্মাণ কাজে দুই অর্থ বছরে ৪১ লাখ টাকা বরাদ্ধ দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, বিদ্যয়লয়টি থেকে গত বছর ২২৬ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪৫ জন জিপিএ-৫সহ ২১৯ জন এবং ৩৫৩ জন ছাত্রী জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৬০ জন জিপিএ-৫ সহ ২৮৫ জন পাস করে।

অভিবাবক আসাদুজ্জামান বাবুল বলেন, বিদ্যালয়টিতে লেখাপড়ার মান ভালো। বিদ্যালয়টিতে বহুতল কোন ভবন নেই। বছরের প্রায় ছয় মাস ছাত্রীদের উপস্থিতি অনেক বেশি থাকে। সে সময় শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করতে হয়। অনেক সময় মাঠে ও বারান্দায় বসে ক্লাস করতে হয়। এখন বৃষ্টির দিন অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষের চাল দিয়ে পানি পড়ে। এতে লেখাপড়ার মারাত্মক ক্ষতি হয়।

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, নারী শিক্ষায় ভূমিকা রাখায় বিদ্যালয়টি ২০০৪ সালে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে জাতীয় পুরস্কার ও ২০১৪ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে উদ্দীপনা পুরস্কারও পায়।

মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতান উদ্দিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যালয়টিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন করা প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, বিদ্যালয়টিতে ভবন ও শিক্ষক সংকট রয়েছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনের জন্য চেষ্টা করছে। কি কারণে হচ্ছে না তা তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন।

(মির্জাপুর সংবাদদাতা, ঘাটাইল.কম)/-