জাতীয় অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান আর নেই

দেশবরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান আর নেই। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার দিবাগত রাত ৩টায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না … রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের ছেলে সাদিদ মুনির তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আজ বেলা ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকে গাজিপুরের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হবে।

তালুকদার মনিরুজ্জমানের জন্ম সিরাজগঞ্জের তারাকান্দি গ্রামে ১৯৩৮ সালের ১লা জুলাই। পিতা আবদুল মজিদ তালুকদার ছিলেন স্কুলশিক্ষক। কৈশোর কেটেছে গ্রামেই। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন তারাকান্দি মাইনর স্কুলে। এরপর ভর্তি হন সিরাজগঞ্জ হাইস্কুলে। এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। মেধাতালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। ঢাকার জগন্নাথ কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। এইচএসসিতে মেধাতালিকায় প্রথম হন।

১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। অনার্সে প্রথম শ্রেণি এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় শ্রেণি লাভ করেন। বৃত্তি নিয়ে ১৯৬৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান কানাডায়। পড়াশোনা করেন কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৬৬ সালে দেশে ফিরে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বছরই বিয়ে করেন একই বিভাগের ছাত্রী রাজিয়া আক্তার বানুকে। প্রায় সাত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে ১৯৭৪ সালে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন ২০০৬ সালে। এর আগে তাকে জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করা হয়।

তিনি বই লিখেছেন নয়টি। আটটি ইংরেজিতে, একটি বাংলায়। অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের জনক।

অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান স্মরণে তার একটি সাক্ষাৎকার ঘাটাইলডটকম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল__

জাতীয়তাবাদের সঙ্ঘাতই রাজনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ: তালুকদার মনিরুজ্জামান

প্রায় শয্যাশায়ী অধ্যাপক তালুকদার মনিুজ্জামান (টিএম) সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান মনিটর (এসএএম)’র তাইয়িব আহমেদের সঙ্গে বাংলাদেশ, দেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন।

তাদের কথোপকথনের অংশবিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো:

এসএএম: একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

টিএম: খুবই হতাশাজনক। আমি আশাবাদী হওয়ার মতো কিছুই দেখছি না। রাষ্ট্রের সব অঙ্গ ভেঙে পড়েছে।

এসএএম: আপনি কি ২০১৮ সালের শেষ দিকে নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার কোনো সুযোগ দেখছেন?

টিএম: নির্বাচনকে অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।

এসএএম: নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা শুরু করেছে। এটি কি সব রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জনে সহায়তা করবে?

টিএম: আমি মনে করি না, এই নির্বাচন কমিশন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের মতো সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

এসএএম: কেন?

টিএম: দুই রাজনৈতিক শিবিরই অনড়। আমি মনে করি না, ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার কাঠামো থেকে বাইরে রেখে আওয়ামী লীগ কোনো নির্বাচন আয়োজন করবে না। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। দুই প্রধান দলের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার কোনো সুযোগ আমি দেখছি না। আমি আবারো একতরফা নির্বাচনের আশঙ্কা করছি।

এসএএম: এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি কী করবে?

টিএম: বিএনপি রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শনের চেষ্টা করবে।

এসএএম: বিএনপি সফলভাবে রাজপথে বিক্ষোভ করলে সরকার হয়তো বিএনপির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে- এমন আশঙ্কা কতটুকু?

টিএম: এটি নির্ভর করবে সরকারের কৌশলের বিরুদ্ধে বিএনপি কোন ধরনের কৌশল নেয়। ওই আন্দোলন দমনের জন্য সরকার কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরও নির্ভও করবে।

এসএএম: ধারণা করা হয়, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ আছে।

টিএম: অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ থাকতে পারে। তবে মনে হচ্ছে না, আওয়ামী লীগ সরকার ওই চাপ গ্রহণ করবে। তাছাড়া প্রতিবেশী ভারত চূড়ান্তভাবে আওয়ামী লীগের সাথেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অন্যরা চাপ বাড়াবে, কিন্তু তারা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না।

এসএএম: রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন দেয়নি ভারত। আপনি বিষয়টি কিভাবে দেখেন?

টিএম: রোহিঙ্গারা মুসলিম বলেই বাংলাদেশের পাশে থাকছে না ভারত। কাশ্মির ইস্যু সবসময় ভারতের মাথায় ভর করে থাকে। রোহিঙ্গাদের মুসলিম পরিচিতি মনে হচ্ছে, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অপরাধ। চীনও জিনজিয়াংয়ের মুসলিমদের নিয়ে ভয়ে থাকে। চীন, রাশিয়া ও ভারত একসাথে দাঁড়িয়েছে, কারণ এটি একটি মুসলিম ইস্যু। ভারত যদি রোহিঙ্গা ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন না করলেও ‘বিএনবি-বনাম-আওয়ামী লীগ’ ইস্যুতে তারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে। চূড়ান্তভাবে আওয়ামী লীগের পাশেই থাকবে ভারত।

এসএএম: আপনি বিএনপির রাজপথে বিক্ষোভের কথা বলেছেন। দলটি ২০১৪ সালের রাজপথে প্রবল বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।

টিএম: বাস্তবসম্মত কারণেই স্বৈরতান্ত্রিক সরকার খুব সহজে বিদায় নেয় না।

এসএএম: আপনি কি মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকার আরো সময় শাসন করবে?

টিএম: মনে তো হচ্ছে।

এসএএম: নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে দেশ কোথায় যাবে বলে আপনার মনে হচ্ছে?

টিএম: আপনার মনে রাখতে হবে, বড় দুই দলের বিপুল সমর্থন রয়েছে। পরবর্তী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ না হলে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। রক্তপাতের আশঙ্কা আছে।

এসএএম: এই প্রেক্ষাপটে আপনি কি সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দেখছেন?

টিএম: সামরিক হস্তক্ষেপ হবে বলে মনে হয় না। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলই তা চায় না।

এসএএম: আপনি কি মনে করছেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়া ভেঙে পড়েছে?

টিএম: আরো সংক্ষিপ্ত বিরতিতে বাংলাদেশের নির্বাচন হওয়া উচিত। পার্লামেন্টের মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর হওয়া উচিত। তখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন নিশ্চিত করা যাবে।

এসএএম: আপনি বলেছেন, আপনি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান দেখতে পাচ্ছেন না। তাহলে শেখ হাসিনার পর কে ক্ষমতায় আসবেন?

টিএম: হাসিনার পর আসবেন জয়। আর খালেদার দলের দায়িত্ব নেবেন তারেক।

এসএএম: রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের নিরাপত্তাগত অবস্থাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

টিএম: যেকোনো ব্যাপারেই আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারছি না। মিয়ানমারের মতো দেশও এখন শক্তি প্রদর্শন করছে।

এসএএম: এমনটা কেন এবং কিভাবে ঘটল?

টিএম: আমরা অন্যান্য দেশের সাথে সমান বা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করিনি। ছোট দেশ হওয়ায় আমরা মনে হয় একটি বড় হাঙরের পেটের মধ্যে ঢুকে পড়ছি। আমাদের প্রতিবেশীরা পরাশক্তির মতো আচরণ করছে।

এসএএম: অনেকে মনে করে, বাংলাদেশ হয়ে পড়েছে ভারত ও চীনের শক্তি প্রদর্শনের জায়গা। আপনি কী বলেন?

টিএম: এটা অনিবার্য। আমি মনে করি, এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রশমিত করতে সহায়তা করবে।

এসএএম: বাংলাদেশের ভবিষ্যত কী?

টিএম: তরুণরাই ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। তারা নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। তারা সোনার বাংলা নির্মাণের স্বপ্ন দেখে।

এসএএম: আপনি কেন মনে করেন, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও বাংলাদেশ রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে বের হতে পারবে না?

টিএম: এর কারণ হলো ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ মধ্যকার সঙ্ঘাত। জাতীয়তাবাদ ইস্যুতে দীর্ঘ দিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি প্রবলভাবে মেরুকরণ হয়ে পড়েছে। এটি দেশের রাজনীতিকে অবনতির দিকেই নিয়ে যাবে।

এসএএম: তরুণদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী? দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তারা কোন জাতীয়তাবাদ অনুসরণ করবে?

টিএম: বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ।

এসএএম: কেন?

টিএম: বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি বর্জনমূলক ধারণা। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্য ভাষাভাষী লোকজনকে বাদ দিয়ে কেবল বাংলা ভাষাভাষী লোকজনের কথা বলে। অন্যদিকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ভূখ-গত জাতীয়তাবাদ। এটি এই ভূখ-ে থাকা ধর্ম, বর্ণ, নৃতাত্ত্বিক অবস্থান-নির্বিশেষে সবার কথা বলে। এর চেয়েও বড় কথা, বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ হিন্দু সংস্কৃতি ঘেঁষা। ফলে বাঙালি সংস্কৃতি মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। এটি সমাজে কোনোভাবেই শান্তি আনতে পারে না।

এসএএম: জীবনের এই পরিণত বয়সে আপনার প্রত্যাশা কী?

টিএম: আমি সবসময় চাই, চিন্তা করি এবং আকাক্সক্ষা করি: বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হোক।

এসএএম: আপনাকে ধন্যবাদ।

টিএম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইলডটকম)/-