ছাঁইচাপা পড়া রাজাকার কমান্ডার কোহিনুর ও কালো চশমার কেচ্ছা

চশমা তো নাকে বসিয়ে দুচোখের দৃষ্টি প্রসারন বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির কথা। কিন্তু তা যখন নাক থেকে চাদিতে নিয়ে রাখা হয়, তখন পুরনো দিনের গল্প মনে পড়ে যায়।

বাল্যে গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল রাজ কাচারির নায়েব বাতেন উল্লাহকে দেখতাম নাক-চোখের চশমা চাদিতে ঠেলে রাখতে। এ ফ্যাসান নাকি শিখেছিলেন তদানিন্তন গোপালপুর থানার সিও বা সার্কেল অফিসার (এসিল্যান্ড পদমর্যাদার) রেফাত উল্লাহর নিকট।

আর চতিলা গ্রামের পেয়াদা নাজের উল্লাহও এমনভাবে চাদিতে চশমা রাখতেন।

আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে চশমা চাদিতে ঠেকিয়ে ফ্যাসান করতেন বাতেন উল্লাহ, রেফাত উল্লাহ ও নাজের উল্লাহরা।

সেই উল্লাহদের যুগ কবে চলে গেছে। রেফাত উল্লাহ জামালপুরে চাকরিকালে একাত্তরে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনীর হাতে শহীদ হন।

বাতেন উল্লাহ মুসলিম লীগ পছন্দ করতেন। একাত্তরে সাধের পাকিস্তান রক্ষায় পীচ কমিটির সদস্য হন। জন্মস্থান ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায়। ঘর জামাই ঘাটাইলের সাগরদীঘির।

পীচ কমিটির মিটিং শেষে টাঙ্গাইল থেকে ফেরার পথে ধলাপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের করতলগত হন। তারপর নাই হয়ে যান।

চতিলার নাজের উল্লাহ জিন্নার পাকিস্তান রক্ষায় রাজাকারে নাম লেখান।

বেড়াডাকুরির মুসলিম লীগ নেতা সবুর মাস্টারের পুত্র কোহিনূরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। একাত্তরে কোহিনূর রাজাকার বাহিনীর লিডার হলে তার ডাকে সাড়া দেন নাজের উল্লাহ। ভর্তি হন রাজাকারে।

গোপালপুরের অনেক যুবককে কোহিনূর রাজাকারে ভর্তি করিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পলশিয়ার আবুল হোসেন সর্দার, পলশিয়ার আশরাফ (যিনি পরবর্তীতে মাদ্রাসায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক এবং গোপালপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর ছিলেন), মাহমুদপুরের মহির উদ্দীন কুঠাল, মোঃ আবদুল্লাহ, শামসুল হক মাস্টার, এবং আমার নিজ গ্রামের ফজলুল হক (অরিজিনাল বাড়ি সরিষাবাড়ী উপজেলার ঢোলভিটি) সহ অনেকেই।

স্বাধীনতার পর নাজের উল্লাহ ও ফজলুল হক পালিয়ে সিরাজগঞ্জ চলে যান। যমুনা চরে বিয়েথা করে বসতি গাড়েন।

ফজলূল হক বেঁচে আছেন।

নাজের উল্লাহ বহু আগেই মারা গেছেন।

মহির উদ্দীন কুঠাল ও আবুল সর্দার একাত্তরের ১২ ডিসেম্বর কালিহাতীর যুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে নিহত হন।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনারা রমনা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করেন।

পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোহিনূরের সুসম্পর্ক ছিল। অপরদিকে কাদেরিয়া বাহিনী কোহিনূরের কুকীর্তির জন্য যারপরনাই ক্ষিপ্ত ছিলেন।

দেশ হানাদার মুক্ত হবার পর মুক্তিযোদ্ধারা কোহিনূরকে হন্যে হয়ে খুঁজেছে। ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ও ঘোষণা করেছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা কোনোদিনই কোহিনূরের নাগাল পাননি।

৯৩ হাজার বর্বর পাকিস্তানী খান সেনা, যারা যৌথ বাহিনীর নিকট
আত্মসমর্পন করেছিলেন, তারাই কোহিনূরের প্রাণ রক্ষায় এগিয়ে আসেন। সুকৌশলে পাকিস্তান আর্মির সদস্য পরিচয়ে তাকে সারেন্ডার করানো হয়।

এভাবেই রাজাকার কমান্ডার কোহিনূর পাকিস্তানী সোলজার সেজে সেদিন রেহাই পেয়েছিলেন।

তারপর। তারপর কোহিনূর পাকিস্তানী সেনাদের সাথেই ভারতের জেলখানায় বন্দী ছিলেন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানী সেনারা ভারতের কারাগার থেকে মুক্তি পান। তাদের সাথেই কোহিনূর চলে যান পাকিস্তানে।

কোহিনূর ছিলেন খুব চৌকস ও বুদ্ধিমান।

পাকিস্তানে অবস্থান কালে তিনি বসে থাকেননি। খন্দকার মোশতাকের শাসনামলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কনফেডারেশন গঠনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত যেসব বাঙ্গালী প্রাণপাত করছিলেন কোহিনূর ছিলেন তাদের অন্যতম।

সুযোগ পেলেই তিনি পাকিস্তানে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মূখ্য মন্ত্রী নূরুল আমীনের সাথেও দেখাসাক্ষাৎ করতেন।

ওই নূরুল আমীন ছিলেন বায়ান্ন সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ সরকারের মূখ্যমন্ত্রী। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের বুকে গুলি চালানোর অভিযোগে যিনি বাঙ্গালীর নিকট ছিলেন ধিকৃত, ঘৃণিত।

১৯৭০ সালে নিখিল পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেমব্লী নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সব আসন আওয়ামী লীগ লাভ করলেও ময়মনসিংহে নৌকার প্রার্থী রফিক উদ্দীন ভূইঁয়াকে পরাজিত করে পিডিবির নূরুল আমীন এম.এম.এ নির্বাচিত হয়েছিলেন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় নূরুল আমীন নির্লজ্জভাবে পশ্চিমাদের পদলেহন শুরু করেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গণ হত্যাসহ সার্বিক কার্যক্রমকে তিনি সর্বান্তকরনে সমর্থন করেন।

ডিসেম্বরে বাঙ্গালীর বিজয় লাভের আচ পেয়ে ধূর্ত শেয়ালের মতো নূরুল আমীন জান বাঁচাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান।

মরার আগ পর্যন্ত এ বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তানেই অবস্থান করছিলেন। সাধের পাকিস্তানের মাটিতেই নূরুল আমীনকে দাফন করা হয়।

এদিকে পাকিস্তানে বেশ কয়েক বছর অবস্থানের পর রাজাকার মণি কোহিনূর জাপান চলে যান। দীর্ঘদিন সেখানেই চাকুরি করতেন। বেশ ক’বছর আগে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন। এখন ঢাকায় সেটেল্ট। অর্থবিত্তে বলশালী।

রাজাকার মণি কোহিনূরের অপরাধ ও কুকর্ম আজ ছাঁইচাপা পড়ে
গেছে।

গোপালপুরের নতুন প্রজন্ম দুর্ধর্ষ রাজাকার কোহিনূরের নামই হয়তো এখন জানেন না।

কোহিনূরের ছোট ভাই মহসীন পানকাতা ইসলামীয়া হাইস্কুলে আমার সাথে পড়তেন। লজিং থাকতেন নিয়ামতপুর গ্রামের ফকির বাড়ীর আবুল কাশেম ফকিরের বাড়ীতে।

কাশেম ফকির ছিলেন আমার দূর সম্পর্কের মামা। তিনিও রাজাকারে গিয়েছিলেন।

একাত্তরে টাঙ্গাইল শহরে অবস্থানকালিন রাজাকার কমান্ডার কোহিনূরের নেতৃত্বে তিনিও পাকিস্তান রক্ষায় যুদ্ধ করেছেন।

কাশেম মামার কাছেই শোনা সে গল্প; একাত্তরে টাঙ্গাইল শহরে রাজাকার লীডার কোহিনূরের নাকি খুব দাপট ছিল। দাপটের কারণ রাজাকার কমান্ডার হিসাবে এক পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনের সাথে বাড়তি হৃদ্যতা।

টাঙ্গাইল শহরে সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রাজাকার ক্যাম্পগুলোতে দুজন এক সাথে পরিদর্শনে যেতেন। ওই পাকি ক্যাপ্টেনের মতো তার চোখেও শোভা পেতো রঙিন গগলস।

কখনো সখনো সেটি নাক থেকে চাদিতে উঠিয়ে প্রশিক্ষণরত রাজাকারদের সামনে শ্লোগান ধরতেন “পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কওমে রাজাকার পাইন্দাবাদ, হিন্দুস্তান মুর্দাবাদ।”

একাত্তর সাল থেকে কাশেম ফকিরের সাথে কোহিনূরের এই যে সম্পর্ক সেটির সূত্র ধরেই স্বাধীনতার পর কাশেম ফকিরের বাড়িতে লজিং থাকতেন তার ছোট ভাই মহসীন।

কাশেম ফকির বেঁচে থাকতে এসব নিয়ে বিস্তর গল্প করতেন আমার সাথে। রাজাকারে যাওয়ায় তিনি অনুতপ্তও ছিলেন।

৭৪ সাল পর্যন্ত টানা আড়াই বছর দালাল আইনে জেলে ছিলেন কাশেম মামা। আর কোহিনূরের অনুজ মহসীন গোপালপুর কলেজে গ্র্যাজুয়েশনের সময় ছাত্র শিবির করতেন। সালটা ১৯৭৮-৭৯।

রাজাকার লীডার কোহিনূরের বোন জামাই ছিলেন মোকছেদ আলী। মোকছেদ ছিলেন আমার গ্রাম চাতুটিয়ার বাসিন্দা। পেশায় ছিলেন গোপালপুর থানা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের ভেন্ডার ও দলিল লেখক।

একাত্তরের জুন মাসের মাঝামাঝি কাদেরিয়া বাহিনীর যোদ্ধারা উন্নত অস্ত্রসস্ত্র ও প্রশিক্ষণের জন্য ইন্ডিয়া গমন করেন। তখন কিছু দিনের জন্য পুরো টাঙ্গাইল মুক্তিযোদ্ধা শূণ্য হয়ে পড়ে। তখন গ্রামগঞ্জে পীচ কমিটির তৎপরতা বেড়ে যায়। রাজাকার- আলবদরের দাপট সীমা ছাড়াতে থাকে।

সেই সময় আমার পড়শি মোকছেদ আলী একবার টাঙ্গাইল যান। সেখানে তার সুমুন্দী ও রাজাকার কমান্ডার কোহিনূরের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেন। ভগ্নীপতি মোকছেদকে কমান্ডার কোহিনূর একজোড়া রঙিন চশমা উপহার দেন।

সেই রঙিন চশমা জোড়া মোকছেদ কখনো নাক থেকে নামাতেন না। হাটবাজার, অফিস-আদালত অথবা ব্যক্তিগত কাজে যখন যেখানে যেতেন রঙিন চশমা নাসিকায় বসানো থাকতো।

কখনোসখনো এ চশমা চাদিতে তুলে তিনি হাঁটাচলা করতেন। সদর্পে বলতেন, ‘কমান্ডার কোহিনূর এ চশমা উপহার দিয়েছেন। এটি খাটি পাকিস্তানী চশমা। একদম পাকসাফ চশমা।’

গ্রামগঞ্জে গল্প ছড়িয়ে পড়লো, বাপের বেটা মোকছেদ এমন এক পাক চশমা এনেছেন যেটি দিয়ে মক্কা ও মদীনা শরীফ দেখা যায়। পাকিস্তান দেখা যায়। লাহোর দেখা যায়। এমনকি এ চশমা দিয়ে দেশবিদেশে গোপন বার্তা ও আনানেয়া করা যায়।

দিন দিন এ যাদুকরী চশমার গাজাখুরি গল্প যতোটা না বিস্তার ঘটলো তারচে বেশি ছাড়িয়ে গেলো মোকছেদের অহঙ্কার ও দাম্বিকতা। আর সেই দাম্বিকতার দরুন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে একদিন তিনি প্রাণ হারালেন। প্রাণ হারানোর সেই গল্পটাই এবার বলা যাক।

সম্ভবত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে কাদেরীয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা আবার দেশে ফিরলেন। রণাঙ্গনে গেরিলা যুদ্ধ চাঙ্গা করা শুরু করলেন।

কাদেরীয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বাঙ্গাল ভেঙ্গুলা বাজারে আস্তানা গাড়েন। প্লাটুন কমান্ডার তোরাপ আলী শিকদার (বর্তমানে গোপালপুর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি) চাতুটিয়া প্রাইমারী স্কুলে অবস্থান নিলেন।

আমি তখন বয়সে তরুণ। দিনে পাঁচবার গোঁফে তা দিয়ে বেড়াই। লম্বা চুলে বেণী গাঁথি। কমান্ডার তোরাপ শিকদার একদিন ক্যাম্পে এসেই এলাকার লিস্ট করা স্বেচ্ছাসেবকদের ডেকে বসলেন।

হুকুম খাবার চাই। খাবার। ক্যাম্পে মিলিত হওয়া সড়কের দুরবর্তী মোড়ে রাতদিন চব্বিশ প্রহরে সিগন্যাল বসানো চাই।

মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো চাওয়ার সাথে কেউ দ্বিমত পোষণ করতেন না।

মানুষ নিজে না খেয়ে হলেও তাদের মুখে সহাস্যে অন্ন তুলে দিতেন।

হাদিরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত এসএম ইব্রাহীম মৌলভী, প্রধান শিক্ষক প্রয়াত আনোয়ার হোসেন বিএসসি এবং হামিদ মাস্টারকে সাথে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাবার সওয়াল করলাম।

চাল,ডাল, তেল নুন, রান্না করা খাবার বা মুড়ি যা পাওয়া গেলো সবই জোগাড় হলো। ক্যাম্পে নিয়ে তা জমা দেয়ার ব্যবস্থা হলো।

হুকুম তামিল করে দশগজ না আসতেই ক্যাম্পের সশস্ত্র সেন্ট্রি হুইসেল বাজালো। পুনরায় তলব। রাতে ভেঙ্গুলা- চাতুটিয়া রাস্তার কড়িয়াটা মোড়ে পাহারা চৌকিতে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার সাথে দুজন স্বেচ্ছাসেবক চাই।

আনোয়ার হোসেন বিএসসি এবং আমাকেই হুকুম দাতা শিকদার সাবের পছন্দ। রাত নয়টায় ঝাওয়াইল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মজনু মিয়াকে আমাদের সাথে পাহারার জন্য পাঠানো হলো।

কড়িয়াটা মোড়ে যাওয়ার পথে হাতের বামে চাতুটিয়া পশ্চিমপাড়া। এ গ্রামেই মোকছেদ মিয়ার বাড়ি। ঘুটঘুটে অন্ধকার।

মুক্তিযোদ্ধারা রাতের অন্ধকারে টর্চ লাইট ব্যবহার করতেন না। থ্রি নট থ্রি রাইফেল কাঁধে মজনু সাহেব আগে ছুঁটছেন, আমরা দুজন পিছে পিছে। কিছুদূর এগিয়েই তিনি বায়ে মোড় নেন।

আগেই বলা ছিল, শুধু ফলো। নো টক। নো কোশ্চেন। পাঁচ মিনিট হেটে উঠলাম ছনে ছাওয়া এক বাড়ির আঙ্গিনায়। এটি যে মোকছেদ আলীর বাড়ি সেটা জানাই ছিল।

মজনু মিয়া চৌচালা ছন ঘরের দরজায় জোরে টোকা দিলেন। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে এক মহিলা সাড়া দিলেন।

কেরোসিনে জ্বালানো দোয়াত বা’হাতে নিয়ে ডানহাতে তিনি দরজা খুললেন।

ঘোমটা দেয়া সত্বেও স্পষ্ট বুঝলাম তিনি মোকছেদ আলীর মা।

এতো রাতে রাইফেল হাতে মজনুকে দেখে তিনি যে ভয় পেয়ে গেছেন কাঁপা গলায় তা বোঝার বাকি রইলোনা।

মজনু সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন,

-মোকছেদ কোথায়?
-বাবা সেতো বাড়ি নাই।
-কোথায় গেছে?
-বেড়া ডাকুরি শ্বশুরবাড়ী।

-ফিরলে বলবেন ওর চশমা জোড়া যেন কাল চাতুটিয়া ক্যাম্পে ভালোয় ভালোয় জমা দেয়।

সারা রাত জেগে যোদ্ধা মজনুর সাথে কড়িয়াটা মোড়ে পাহারা দিলাম। ভূঁইয়াবাড়ির এ মোড়ের দুই পাশে ছিল গভীর জঙ্গল। ছোট রাস্তায় ছিল একহাটু কাঁদা। সাপ আর জীনভূতের ভয়ে সন্ধ্যার পর মানুষ কখনো এ পথু হয়না।

অথচ নিকস কালো রাতে ওই আড়া বা জঙ্গলের একখন্ড শুকনো পীতরাজ কাঠে উপবেশন করে পুরো রাত নির্বাক, নির্ঘুম, নিরুদ্বেগে কাটালাম। ভূতপেত্নী, সাপবিচ্ছু ছিল দূর অস্ত।

সকালে ডিউটি শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে সাহস সঞ্চয় করে মজনু সাবকে বললাম,
-ভাই যদি কিছু মনে না নেন তো একটা কথা বলি।
– বলুন
– মোকছেদ সাবের চশমায় সত্যিই কি যাদুকরী শক্তি আছে?
– চশমায় যাদু আছে কি নেই সেটি বড় বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো এক কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার এ চশমা দিয়েছেন। আর সেই চশমা দিয়ে মোকছেদ বাহাদুরি দেখাচ্ছেন। আর প্রশ্ন করার প্রয়োজন অনুভব করিনি।

এরপর এলো সেপ্টম্বর মাস। চতুর্দিকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সরব উপস্থিতি। সরিষাবাড়ী উপজেলার জগন্নাথগঞ্জ রেলওয়ে ঘাট থেকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এক বিশাল বহর ফুলদহ গ্রামে অবস্থান রত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ভয়াবহ আক্রমন চালায়।

অপ্রত্যাশিত আক্রমনে মুক্তিযোদ্ধারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে।

ডজনখানেক মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারায়।

হানাদার বাহিনী আরো আগুয়ান হয়ে গোপালপুর উপজেলার ভেঙ্গুলা বাজারে হামলা চালায়।

পাট ব্যবসায় খ্যাত ভেঙ্গুলা বাজার আগুনে ভস্মীভূত করা হয়। কয়েকজন নিন্মবর্গের হিন্দুকে গুলি করে হত্যা করে।

পাকিরা দাবি করতো তারা নাকি সাচ্চা মুসলমান। তাই ভেঙ্গুলা বাজার পুড়ে ছারখার করলেও বাজারের গণিকালয় ছিল অক্ষত।

হানাদারদের একদল যখন অগ্নি সংযোগ আর নরহত্যার মচ্ছপে ছিল, তখন অন্যদল গণিকালয়ে ঢুকে রমণে লিপ্ত ছিল।

পাকস্থানের মুসলিম নামের এ নরপশুরা সেদিন এভাবেই সুদৃঢ় ইমানের পরিচয় দিয়েছিল।

সেদিন ভেঙ্গুলা বাজারে হুমায়ুন বেঙ্গলের ৮/১০জন মুক্তিযোদ্ধাও অবস্থান করছিলেন। তারা পাকবাহিনীর আক্রমনের প্রচন্ডতা দেখে ঝিনাই নদী পেরিয়ে পূর্ব পাড়ে পজিশন নেন। কিন্তু প্রচন্ড গোলাগুলিতে পিছপা হন।

এরা বিক্ষিপ্তভাবে ধনবাড়ী উপজেলার পানকাতা ইসলামীয়া হাইস্কুল ক্যাম্পে গমণ করেন।

এ দলের মুক্তিযোদ্ধা শাসছুল হক, যিনি সহকর্মীদের পোষাকপরিচ্ছদ ও হালকা জিনিসপত্র নিয়ে ভেঙ্গুলা থেকে পানকাতা ক্যাম্পে ফিরছিলেন, তার সাথে চাতুটিয়ার তেলিপাড়া মোড়ে দেখা হয় মোকছেদ আলীর।

নিরস্ত্র দেখে মোকছেদ আলী ওই মুক্তিযোদ্ধাকে খুব গালিগালাজ করেন। তোর বাবাদের দেখে যুদ্ধ না ফিরে ভাগছিস। বাবাদের ঠ্যালায় ভয়ে পালাচ্ছিস। ইত্যাদি ইত্যাদি।

ওই মুক্তিযোদ্ধা পানকাতা ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বাঙ্গালকে বিষয়টি অভিযোগ আকারে জানান।

উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা চশমার আদ্যোপান্ত এবং রাজাকার কমান্ডার কোহিনূরের ভূমিকা ও প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এমতাবস্থায় তাকে মৃত্যূদন্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ঘটনার পর দুদিন মোকছেদ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। তৃতীয় দিন তাকে পাকড়াও করা হয়। তারপর হাতপা ও চোখ বেঁধে নৌকায় তোলা হয়। নেয়া হয় গরিল্লা বিলে। সেখানেই গুলিতে হত্যার রায় কার্যকর হয়।

পরে মুক্তিযোদ্ধারা সেই যাদুকরী কালো চশমা হস্তগত করেন। কিন্তু সেই চশমায় মক্কা, মদীনা, পাকিস্তান, লাহোর কিছুই দেখা যায়নি।

(জয়নাল আবেদীন, সভাপতি গোপালপুর প্রেসক্লাব, ঘাটাইল ডট কম)/-