‘চতুর্থ দফা জেরায় বাদি ও নিহত ফারুক আহমেদর স্ত্রী আদালতকে যা বললেন’

টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় বুধবার (১৮ এপ্রিল) বাদি নাহার আহমেদের আংশিক জেরা সম্পন্ন হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি ঘাটাইলের এমপি আমানুর রহমান খান রানার উপস্থিতিতে গতকাল চতুর্থ দফায় বাদির জেরা অনুষ্ঠিত হয়। জেরায় নিহত ফারুক আহমেদর স্ত্রী নাহার আহমেদ বলেন, ‘আমাকে যতই উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করা হোক না কেন আমার দেহে এক বিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত আমি বলব, খান পরিবারের চার সন্তানই আমার স্বামীকে খুন করেছে। আমাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু মৃত্যু একদিন হবেই। তাই কাউকে ভয় করি না। সত্য বলতেও আমি ভয় পাই না। শেষ নিঃশ্বাস নেয়া পর্যন্ত খুনিদের বিচার চেয়ে যাবো।’

আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল বাকী মিয়া মামলার বাদিকে প্রায় এক ঘণ্টা জেরা করেন। জেরায় বাদি বলেন, ২০১২ সালে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের উপ-নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে রানা বিদ্রোহী প্রার্থী হন। নির্বাচনের চারদিন আগে রানার কয়েকজন কর্মী অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তখন রানা আটককৃত কর্মীদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে আমার স্বামীকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু আমার স্বামী আটককৃতদের ছাড়ানোর চেষ্টা না করায় তার প্রতি রানা ও তার ভাইদের আক্রোশ তৈরি হয়।

টাঙ্গাইল কোর্ট পরিদর্শক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ থেকে মাইক্রোবাস যোগে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার প্রধান আসামি টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সরকার দলীয় এমপি আমানুর রহমান খান রানাকে বুধবার দুপুর ১২টায় টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আনা হয়। সোয়া ১২টায় বিচারক আবুল মনসুর মিয়া এই মামলার কার্যক্রম শুরু করেন। মামলার বাদি নাহার আহমদকে আমানুরের আইনজীবীরা প্রায় এক ঘণ্টা জেরা করেন। বাদির জেরা অসমাপ্ত রেখেই বিচারক আদালত মুলতবি করেন। একই সাথে বাদির অবশিষ্ট জেরা ও অন্যান্য সাক্ষির সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৯ মে পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

বুধবার আদালতে মামলার আরো দুই স্বাক্ষী নিহত ফারুক আহমেদের ছেলে আহমদ মজিদ সুমন ও মেয়ে ফারজানা আহমদ মিথুনের হাজিরা দাখিল করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

মামলার প্রধান আসামি আমানুর ছাড়াও টাঙ্গাইল কারাগারে থাকা আরো তিন আসামি মোহাম্মদ আলী, আনিছুর রহমান রাজা ও মো. সমিরকে আদালতে হাজির করা হয়। এছাড়া জামিনে থাকা আসামি নাসির উদ্দিন নুরু, মাসুদুর রহমান মাসুদ ও ফরিদ আহম্মেদ আদালতে হাজিরা দেন। আদালতের কার্যক্রম শেষে দুপুরেই এমপি রানাকে কড়া পুলিশ প্রহরায় কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

অ্যাডভোকেট বাকী মিয়া জেরার সময় উল্লেখ করেন, খান পরিবারের সন্তানরাইতো ফারুক আহমেদের লাশ কাঁধে নিয়েছেন, জানাজা নামাজ পড়েছেন আবার তারাই লাশ কবরে নামিয়েছেন। তাহলে তারা কীভাবে ফারুক আহমেদকে হত্যা করতে পারে?

জবাবে নাহার আহমেদ বলেন, আইনজীবীদেরও জানা থাকার কথা, যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে তারাই আবার তার লাশ কাঁধে নিয়েছে, জানাজা নামাজ পড়েছে এবং তার কবরেও নেমেছে।

জেরার এক পর্যায়ে আমানুরের আইনজীবী আব্দুল বাকী মিয়া ফারুক আহমেদের সাথে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বিরোধ, ফারুক চরাঞ্চলে দুটি স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার লোকজনের সাথে বিরোধের বিষয় তুলে ধরেন। তিনি নাহার আহমেদের কাছে জানতে চান এসব কারণে ফারুক আহমেদ খুন হয়েছেন কিনা।

জবাবে নাহার আহমেদ বলেন, সব মিথ্যা কথা। নানা কাহিনী বলে যতই বিভ্রান্তের চেষ্টা করা হোক না কেন শেষ পর্যন্ত বলে যাবো কুখ্যাত খান পরিবারের চার সন্তানই ফারুককে হত্যা করেছে।

টাঙ্গাইল জেলহাজতে থাকা তিন আসামি মোহাম্মদ আলী, সমির ও আনিসুল ইসলাম রাজাকে আদালতে হাজির করা হয়। এছাড়া জামিনে থাকা তিন আসামি ফরিদ আহাম্মেদ, নাসির উদ্দিন নুরু ও মাসুদুর রহমান মাসুদ আদালতে হাজিরা দেন। চার্জশিটভুক্ত বাকি সাতজন আসামি এখনো পলাতক আছেন। তারা হলেন- এমপি রানার তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়িক নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা এবং এমপি রানার ঘনিষ্ঠ সহযোগী কবির হোসেন, এমপি রানার দারোয়ান বাবু, তৎকালীন যুবলীগ নেতা আলমগীর হোসেন চাঁন ও ছানোয়ার হোসেন।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রাতে জেলা আওয়ামীলীগের অন্যতম নেতা ফারুক আহমেদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তার কলেজপাড়া এলাকার বাসার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার তিনদিন পর তার স্ত্রী নাহার আহমেদ বাদি হয়ে টাঙ্গাইল থানায় মামলা দায়ের করেন। প্রথমে মামলাটি টাঙ্গাইল সদর থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরবর্তীতে তদন্তেরভার জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে দেয়া হয়। গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। তাদের জবানবন্দীতে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের এমপি রানা ও তার তিনভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

(পরিবর্তন, ঘাটাইল.কম)/-