ঘোড়া রোগ, অশ্বডিম্ব এবং রাজনীতি

শনিবার (২৬ অক্টোবর) টাঙ্গাইলের গোপালপুরের কোনাবাড়ী হাঁটে একখান ঘোড়া কিনিতে গিয়াছিলাম। একখান টাট্রু কিনিতে মন আনচান করিতেছিল। প্রায় একশ বছর আগে গোপাল বাবুরা এই ঘোড়া হাটের গোড়াপত্তন পত্তন করিয়াছিলেন। নানা রং ও সাইজের রেস হর্স এবং পুল হর্স এখানে বিক্রি হইয়া থাকে।

আর্থাইটিস থাকায় হাঁটাহাটিতে সমস্যা। বেশিক্ষণ হাঁটিলে পা ফুঁলিয়া যায়। চিঁন চিনে ব্যাথা সর্বাঙ্গে ছঁড়াইয়া পড়ে। এমতাবস্থায় ভাবিয়াছিলাম, একখান প্রাইভেট কার কিনিব। তাহা হইলে আর পদভারের ক্লেশ বহন করিতে হইবেনা। কিন্তু বাঁধা হইল বহুমূত্র। অনেক আগেই অনাহূত বহুমূত্র শরীরের অন্ত্রে অন্ত্রে অতিথির আসন লইয়াছে। তাই পদব্রজ বন্ধ করিলে সুগার বাড়িয়া বহুমুত্র বহুমর্দনে রুপ লইবে। তাই আর্থাইটিসের অজুহাতে গাড়িতে উঠিয়া, অবিরাম আরামে চলিয়া, হারাম বহুমুত্রের ধঁকল টানিতে চাহিলাম না। বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন, মোটর সাইকেলে। কিন্তু যৌবনে মোটর সাইকেলে হাত পা বার কয়েক ভাঙ্গিয়াছি। তাই শয়তানের বাহন কিনাকিনা বাদ রাখিলাম।

সর্বশেষে সিদ্ধান্ত, একটি তাজী ঘোড়া কিনিব। উহার পিঠে নরম ফোঁমের জীন পাঁতিব। রাজদন্ডের মতো একখান চাঁবুক করতলগত করিয়া, চৌঁকষ সঁহিসের মতো অশ্বপৃষ্ঠে বসিয়া, টঁগবগ করিয়া অসীম পানে ছুঁটিয়া চলিব। অতএব শনিবার হাঁটে গিয়া ছবির এই ঘোড়াটি পছন্দ করিলাম।

ঘোড়ার মালিক পিঁচুরিয়া গ্রামের কাইয়ুম উদ্দীন। লোকে ডাকিয়া থাকেন ঘোড়া কাইয়ুম। ঘোড়ার দাম হাঁকাইলেন ৮০ হাজার মুদ্রা। দশ কমাইয়া সত্তরে স্থিত হইলেন। দশ হাজার নগদ দিয়া বায়না করিলাম।

পরে পরীক্ষামূলক ঘোড়ার পিঠে সঁওয়ার হইয়া হাট চত্বরে রেস খেলিলাম। মনে তখন খুঁশির বণ্যা। গিন্নীর চাঁদ মুখখানি মনে পড়িয়া গেল। আহা! কতোদিন একসাথে বেড়াইতে যাওয়া হয়না। এই বার ঘোড়ার সঁহিস সাঁজিয়া, রুপকথার রাজকণ্যার মতো সামনে সযতনে বসাইয়া, অশ্বারোহী বেশে অঁচিন দেশে পাড়ি জমাইতে পারিব। মনে আনন্দের ঢেউ খেলিয়া খেল। সহসা অশ্বপৃষ্ঠ হইতে নামিয়া, গিন্নীকে ঘোড়া কিনিবার সুখবরটি দিতে সেলফোনে রিং করিলাম।

-হ্যালো ডার্লিং-
-হাঁ বলো-
-তোমাকে একটা সুখবর দিতে চাই-
-হাঁ বলো-
-অামি ঘোড়া কিনেছি- টাট্রু ঘোড়া-
-মানে-
-মানে তাজী ঘোড়া-
-তা হঠাৎ ঘোড়ারোগ কেন?-
-ঘোড়ারোগ নহে ঘোড়া কিনিয়াছি।-
-টাকা পেলে কোথায়?-
-না মানে, বায়না দিয়েছি দশ হাজার। ব্যাঙ্ক থেকে তুলে বাকি টাকা পরিশোধ করবো।-
-ব্যাঙ্ক থেকে মানে জমি বেচার টাকা?-
-হ্যাঁ-
-তা জমিটা যেন কার ছিল?
-কেন আমার প্রো দাদা বোরহান খাঁনের। সেখান থেকে অামার দাদা উমর খাঁন। তারপর আমার বাবা হাতেম খাঁন। এর পর জয়নাল খাঁন। সেসবের বিঘা দশেক তেলেসমাতি বেঁচিয়া ব্যাঙ্ক আর সঞ্চয় পত্রে রেখেছি। সেসবের অংশ বিশেষ দিয়ে ঘোড়া কিনতে চাই।

– গিন্নী মুঁচকি হাঁসিল। তাহার পর বলিল, “হাঁ গো তুমি সহজেই ঘোড়া কিনতে পারবে। কারণ বাপদাদার টাকায় অতি সহজেই ঘোড়া কেনা যায়। কিন্তু নিজের কামাইয়ের টাকায় শ্রমঘামের কষ্ট থাকে। সেই টাকায় অতো সহজে ঘোড়া কেনা যায়না। তবে তোমাকে ঘোড়ারোগে ধরেছে। এটির কোনো চিকিৎসা নাই” – এই বলিয়া গিন্নী খঁচ করিয়া সেলফোনের লাইন কাটিয়া দিল।

আমি দক করিয়া বসিয়া পড়িলাম। বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম; তাইতো গিন্নী তো সত্য কথাই বলিয়াছেন। পঁয়ত্রিশ বছর কলেজে মাস্টারী করিয়া, ঘোড়া কিনিবার মাত্র সত্তর হাজার মুদ্রা, সঞ্চয় করিতে পারি নাই। এখন শেষ বয়সে অন্তিম সাঁধের টাট্রু কিনিতে বাবার জমি বিক্রয়ের মুদ্রা খােঁয়াইতে হইতেছে।

বছর দুয়েক আগে মধুপুর কলেজ হইতে শূণ্য হাতে অবসরে গিয়াছি। অবসর ও কল্যাণ খাতে সরকার বাহাদুর আমাকে বত্রিশ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা। কিন্তু উহা কবে, কখন পাইবো উহার ঠিকঠিকানা কেহই বলিতে পারিতেছেনা। কলেজে চাকরি লইবার আগে আমাকে স্কুল- কলেজ ও বিশ্বদ্যালয় মিলাইয়া টানা একুশ বছর ছাত্রত্বের কাঠকয়লা পোড়াইতে হইয়াছে। তাহার পর টানা পঁয়ত্রিশ বছর ছাত্র পড়াইয়া আয়ু ব্যয় করিয়াছি।

আমার আশপাশে কতো ননমেট্রিকরা ব্যবসাবানিজ্য, রাজনীতি বা সাংবাদিকতা করিয়া বড় বড় রাজপ্রাসাদ বানাইয়াছেন, বানাইতেছেন, ব্যাংকে জায়গা না পাইয়া বাড়ির সিন্ধুকে অঢেল টাকা রাখিতেছেন, ক্যাসিনো খেলিয়া বাতাসে কোটি কোটি টাকা উড়াইতেছেন, সেইসব ইঁচড়ে পাঁকা ইঁতর রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা সাংবাদিক নেতারা যখন কারণেঅকারণে চোখ রাঙাণ, জাতিকে সততার ছঁবক দেন, তখন ঘোড়া ভি হাঁসে। ওই নেতারা যে রাষ্ট্র, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা মিডিয়া হাউজ চালান, সেই রাষ্ট্রের শিক্ষা বা সার্বিক ব্যবস্থায় প্রায় চল্লিশ বছর আগে ঢাবিতে পড়ালেখা সারিয়া, সাড়ে তিন দশক মাস্টারী করিয়া, কপর্দকশূণ্য অবস্থায় অবসরে আসিয়া, বাবার জমিজমা বেঁচিয়া, হালাল রোজী বা খানাখাইয়া, পোষ্য নেতাধারি গঁদাধের হুঙ্কার শুনিয়া, মনে মনে হাঁসি। তবে মনের কোনে এখনো আশার ফুঁলকি ছড়াই। কবে একখান টাট্রু ঘোড়া কিনিতে পারিব। যে ঘোড়াটি ইতর মানুষদের নীতিকথা শুনিয়া হ্রেস্রা রবে হাঁসিবে।

মহাভারতের অশ্বমেধ যজ্ঞের আগে কৃষ্ণকায় ঘোড়া যেমন অট্রহাসি হাঁসিয়া দেবতাদের হতচকিৎ করিয়াছিল, তেমনি টাট্রুর হাঁসি শ্রবন করাইয়া অর্বাচিনদের বিব্রত করিতে, একখান ঘোড়া কিনিবার আশা পরিত্যাগ করি নাই। ভাবিতেছি টাট্রু ক্রয়ের আশা যেন অশ্বডিম্ব না হয়।

(জয়নাল আবেদীন, সিনিয়র সাংবাদিক/ ঘাটাইলডটকম)/-