ঘোড়াঘাটের ইউএনও ও তার বাবাকে বাসায় ঢুকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা

রাতের আঁধারে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসভবনে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। গেটে দারোয়ানকে বেঁধে ফেলে তারা। পরে বাসার পেছনে গিয়ে মই দিয়ে উঠে ভেনটিলেটর দিয়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকে ভারি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও আঘাত করে ইউএনও ওয়াহিদাকে গুরুতর আহত করে হামলাকারীরা। মেয়েকে বাঁচাতে এলে তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখকে (৭০) জখম করে। তারা অচেতন হয়ে পড়লে মৃত ভেবে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ভোরে স্থানীয়রা টের পেয়ে তাদের উদ্ধার করেন।

পুলিশ, স্থানীয় কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুরে কমিউনিটি প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউ নেওয়ার পর অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে তাকে।

নিজের কন্যাকে রক্ষা করতে বৃদ্ধ বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখ (৭০) এগিয়ে গেলে তাকেও আহত করে সন্ত্রাসীরা। তাকে আহত অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়, পরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফরিদুল ইসলাম।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজকুমারসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ইউএনওকে পরীক্ষা করে সাংবাদিকদের জানান, তার মাথার আঘাত গুরুতর। হাড় দেবে গেছে। তার একটি হাত ও শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেছে।

 ডা. রাজকুমার বলেন, ‘দ্রুত অস্ত্রোপচার করা জরুরি। সেজন্য তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি অপারেশন করা যাবে ততই তার জন্য মঙ্গল।’

এদিকে ঘোড়াঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রাফে খন্দকার ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর নেওয়াজ আহমেদ স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানান, রাত আড়াইটা বা ৩টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসায় হামলা হয়। তখন উনারা সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছেন কিনা তা স্থানীয়রা বলতে পারছেন না। ভোরে উনার বাবা হাঁটতে বের না হওয়ায় তার সঙ্গীরা বাসায় গিয়ে খোঁজ নেন। বাড়িতে ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া না পেয়ে পুলিশকে খবর দেন তারা। পরে পুলিশ এসে ইউএনও ও তার বাবাকে আহতাবস্থায় দেখে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।.

পুলিশ জানায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের একটি ছোট সন্তান রয়েছে। তার স্বামী রংপুরের পীরগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত। তিনি মাঝে মাঝে আসেন।

তার বৃদ্ধ বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখ সম্প্রতি মেয়ের কাছে এসেছেন। ঘটনার দিনে তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন।

আহত ইউএনও’র মা রমিসা খাতুন নওগাঁ থেকে জানান, বুধবার সন্ধ্যায় ফোনে তার মেয়ের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তবে কারা, কেন তার মেয়ের বাসায় ঢুকে তাকে হত্যা করার জন্য কুপিয়েছে তা তিনি জানেন না। তিনি দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

জেলা প্রশাসক হামিদুল আলম বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। তদন্ত করার পর পুরো ঘটনা জানা যাবে।’

এদিকে ইউএনও আহত হওয়ার খবর পেয়ে রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার ওয়াদুদ ভুইয়া, জেলা প্রশাসক হামিদুল আলম, র‌্যাব-১৩ রংপুর প্রধান কমান্ডার রেজা আহাম্মেদ ফেরদৌস, মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নুরন্নবী লাইজু, হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফরিদুল ইসলামসহ জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন উপজেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের অবস্থা পরিদর্শনে আসেন।

এদিকে ঘোড়াঘাট থানার ওসি আমিরুল ইসলাম জানান, ‘কারা কীভাবে এ হামলা চালালো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরো উপজেলা পরিষদ চত্বর সিসি ক্যামেরায় আওতায়। সেটাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।’

এদিকে রংপুর র‌্যাব-১৩ প্রধান কমান্ডার রেজা আহাম্মেদ ফেরদৌস জানান, ‘আমরা ঘটনা জানার পরপরই পুরো এলাকা কর্ডন করেছি। আশেপাশের এলাকা থেকেও আমাদের একাধিক টিম যোগ দিয়ে কাজ শুরু করেছে। আশা করি আমরা দায়ীদের ধরতে পারবো।’

এদিকে রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার ওয়াদুদ ভুইয়া বলেন, ‘এটা একটা জঘন্য ঘটনা। এর সঙ্গে যারাই জড়িত থাক তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওয়াহিদা খানমকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email