ঘাটাইল হানাদার মুক্ত দিবস দায়সারাভাবে উদযাপন ঘটনায় ক্ষোভ

১০ ডিসেম্বর। সহজ কথায় বলতে গেলে এই দিনে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়েছিলো। কিন্তু লক্ষনীয় বিষয়, এই দিনটিকে ঘিরে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা যেভাবে ঘাটাইলের মানুষের তথা নতুন প্রজন্মের জানার অধিকার বা কথা ছিলো সেভাবে জানতে পারে নাই। এর আসলে কারন কি? আট দশজন মানুষের মতো আমারো প্রশ্ন। বর্তমানে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বড়ই কঠিক ব্যাপার, তাই অনুসন্ধানের প্রয়োজন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, বলা হয় স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ক্ষমতায়। সব চাইতে বড় কথা ঘাটাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই পরিমাণ নেতা আগে লক্ষ করা যায় নাই, এখন যে পরিমাণ নেতা ঘাটাইলে তা ইতিহাসে বিরল।

এখন তো কয়েক প্রকার আওয়ামী লীগ। প্রথম আওয়ামী লীগ, তারপর নির্যাতিত আওয়ামী লীগ, ত্যাগী লীগ, বঞ্চিত লীগ, হাইব্রিড লীগ, দলে নতুন সংযোজিত যোগাদান লীগ, বাকি আর নাই-বা বললাম। এতো লীগ আর এতো নেতা থাকতে ঘাটাইলের অধিকাংশ মানুষ ১০ ডিসেম্বর সম্পর্কে জানতে পারলো না।

তারপর আসা যায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান হিসেবে বাপ চাচাদের বিষয়ে কিছু না বললে আমার নিজের কাছে নিজেই অপরাধী হয়ে যাবো। আমার ধারনা ঘাটাইলে যে পরিমাণ মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের অন্য কোন উপজেলায় এতো মুক্তিযোদ্ধা নাই। তবে এটা সত্যি, সত্যিকার অর্থেই ঘাটাইল মুক্তিযোদ্ধাদের চারণ ভূমি। কিন্তু বলতে লজ্জা লাগে আমাদের বাপ চাচাদের মধ্যে কেউ এতোটাই অনৈতিক আর দুর্নীতিবাজ হয়েছেন যে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

ঘাটাইল উপজেলায় সত্যি অর্থেই যেমন সঠিক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, ঠিক তার থেকে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা নেহায়াতই কম না।
এগুলো টাকা খেয়ে আমাদের বাপ চাচারাই ভুয়াদের হালাল করেছেন, একেকজনের দল ভারী করতে। আজ তাদের মধ্যে বিভেদ। কয়েকভাবে বিভক্ত ঘাটাইল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, এই বার ১০ ডিসেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত না হওয়ার অন্যতম কারন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন তরুণ। ঘাটাইলের যারা নীতি নির্ধারক আশা করি তাদের সকলের স্নেহের এবং তার পদবীর যোগ্যাতাও সবার সম্মানের, তার আবদার কেউ ফেলে দিতো না। তার কিন্তু দায়ভার থাকে বিরোধ মিটিয়ে ঘাটাইলে স্বাধীনতার দিনটা ঘাটাইলবাসীর কাছে উপস্থাপন করা।

এখন তো আবার সবাই আওয়ামী লীগ প্রায় সবাই নেতা। সমস্যা হলো নিবেদিত কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে। দেখা যাচ্ছে, সারা দেশেই যে যত ভালোভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে পারবে, আর সবার চোখে ধূলা দিয়ে রাজনৈতিক চেতনা বিক্রির ব্যাবসা করতে পারবে তারাই এগিয়ে যাবে।

রাজনীতিতে আদর্শ, নীতি, নৈতিকতা, সম্মান, শ্রদ্ধা, বিনয় ধিরে ধিরে বিলুপ্ত হচ্ছে। টাকা কামানোর হাতিয়ার হয়ে গেছে রাজনীতি।
হিংসা, হিংস্রতা, বিভেদ দিন দিন বেড়েই চলছে পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় গ্রুপ আর গ্রুপ। রাজনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি চেইন অফ কমান্ড বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে এতো হানাহানি গ্রুপিং। যার খেসারত দিতে হয় সকলের। জয় বাংলা বলে আমরাই আমাদেরকে আঘাত করছি, রক্তাক্ত করছি। আর এইসব বিভেদে আমাদের উপজেলা ঘাটাইল পিছিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতি করা মানুষগুলোর পরিবার মা, বাবা, বউ, বাচ্চা সবাই কি সে অসহনীয় মানুষিক কষ্ট, ভয়, আতংক নিয়ে প্রতিটা দিন আর রাত পার করে, কমাত্র সেই পরিবার সদস্যরাই জানে যে পরিবারে একজন রাজনীতিতে জড়িত আছে।

দোষ গুণ তো সবারই কম বেশি আছে। আসুন মিলেমিশে থাকি, আর কত বিভেদ হবে আর কত রক্ত ঝরবে?? আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্যাগ যেনো ভুলে না যাই।

পরিশেষে বলতে চাই, টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ঐ দিন (১০ ডিসেম্বর) যুদ্ধে ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তারা হচ্ছেন, বানিয়াপাড়া যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী, ব্রাহ্মনশাসন যুদ্ধে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন, আলী আকবর ও মানিক, কালিদাস পাড়া যুদ্ধে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান ও আব্দুল আজিজ। ঐ দিন খোরশেদ আলম ও ইউনুস আলীর নেতৃত্বে সম্মুখ যুদ্ধে বীর ঘাটাইল- গুণগ্রাম ব্রীজের কাছে তীব্র লড়াই শুরু হলে ১৭ জন পাকসেনা সহ আলবদর রাজাকার অনেক অস্ত্র সহ একশর বেশী সংখ্যকে আটক করে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা।

এদের আত্মত্যাগের ইতিহাসগুলো আমাদের মতো ঘাটাইলের হাজারো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা উচিৎ। কিন্তু খুবি দুঃখ আর পরিতাপের বিষয়, দিবসটা শুধু নামমাত্র ছোট পরিসরে পালন করা হয়েছে, যা বেদনাদায়ক।

আশা করি আসছে ১৬ ডিসেম্বর সকল ভেদাভেদ ভুলে ঘাটাইলবাসী একসাথে উদযাপন করবে বিজয়ের আনন্দ।

উল্লেখ্য: ১০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) ঘাটাইল হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপিত হয়। মঙ্গলবার ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণ, শোভাযাত্রা, দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে। কিন্তু ঘাটাইলের সরকারি অফিস আদালত, দোকানপাট, বিদ্যালয়ে এই দিনে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়নি এবং এমনকি কোন আলোচনা সভার আয়োজনও এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। সে সময় উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান, উপজেলা চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম লেবু, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম, ঘাটাইল পৌরসভার মেয়র শহীদুজ্জামান খান প্রমুখ।

(আরিফ খান, সংবাদকর্মী, ঘাটাইলডটকম)/-