ঘাটাইল ও গোপালপুরে বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প, অনাহারে অর্ধাহারে দুই শতাধিক পরিবার

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ও গোপালপুর উপজেলা থেকে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আবহমান গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য মৃৎ-শিল্প। নানামুখি সমস্যা ও পৃষ্ঠ পোষকতার অভাবে চরম সংকটের মুখে এ শিল্প। বংশপরস্পরায় পাওয়া- পুরাতন পেশা টিকিয়ে রাখতে মৃৎ-শিল্পিরা প্রতি নিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারী সহযোগিতা পেলে এ শিল্পকে পুনরায় বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। প্রয়োজনীয় পুঁজি, উপকরন আর বাজারে চাহিদা না থাকার কারনে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই বাধ্য হয়ে চার পুরুষের পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার তাগিদে ভিন্ন, ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। সারা দেশের ন্যায় টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ও গোপালপুরের মৃৎ-শিল্পিরাও ভিন্ন পেশায় আত্মঃ নিয়োগ করছেন।

ঘাটাইল উপজেলার হামিদপুর উত্তর বেতডোবা, লোকের পাড়া ইউনিয়নের- ডেউজানি পশ্চিম পাড়া ও পাঁচটিকরী গ্রামে সর্বমোট- ১০০ থেকে ১১০টি পরিবার আর গোপালপুর উপজেলার ডুবাইলের মধ্যপাড়া, পশ্চিম কালিবাড়ি ও পালপাড়া চন্দ্র বাড়িতে মোট ৯০টি থেকে ৯৫টি পরিবার এখনো মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে।

সরেজমিনে ঘাটাইল ও গোপালপুর উপজেলার মৃৎশিল্পিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের হাঁসির আড়ালে বুকভরা কান্না ও কষ্ট, সুখের আড়ালে নানা দুঃখের কাহিনী সহ জানা অজানা নানা কথা।

ঘাটাইলডটকমের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় ঘাটাইলের হামিদপুর এলাকার বেতডোবা গ্রামের মৃৎ-শিল্পি সুভাস পাল, ফনি পাল, মানিক পাল, অখিল চন্দ্র পাল, বিরেন্দ্র চন্দ্র পালের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের দুঃখ কষ্টের কথা। তাদের অভিযোগ আবহমান কাল থেকেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য হিসাবে মাটির তৈরি মুড়ি ভাজার হাঁড়ি, ঝানঝড়, রুটি বানানোর তাওয়া, খালসা পানির কলস, গরুর খাদ্য দেওয়ার চাড়ি, খোড়া, ঢাকনা, দইয়ের পাতিল, টয়লেটের পাট (রিং), ফুলের টব, ফুলদানি, দেব-দেবীর মুর্তি, বাচ্চাদের খেলনা- ঘোড়ার গাড়ি, টমটম গাড়ি, আর মুসলমানদের সুন্নতি কায়দায় খাওয়ার পাত্র- শাঙ্কি ও ঘর সাজানোর বিভিন্ন তৈজস পত্র, আমরা পাইকারি ও খুচরা সহ গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফেরি করে ধান বা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতাম।

গ্রামে ঢুকে গাছের নিচে শিতল ছায়ায় বসে যখন হাঁক দিতাম রাখবেন গো খুড়া পাতিল, ঢাকনা ঝানঝইড় রাখবেন। সাথে সাথে বাড়ির ভেতর থেকে বৌ, ঝি ও মা, বোনেরা কেউ ধান আবার কেউবা নগদ টাকা দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র কিনে নিতেন। এটাই ছিল আমাদের বংশ পরস্পরার পেশা ও আমাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। কালের বিবর্তনে আধুনিক প্রযুক্তির উৎপাদিত অ্যালুমিনিয়ান আর প্লাস্টিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এবং সরকারী কোন পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার কারণে এ পেশায় আর টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমাদের সন্তানেরা বংশ পরস্পরার এই পেশা আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তারা বিকল্প পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

অপর দিকে গোপালপুর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে গোপালপুরের বর্তমান সাংসদ তানভীর রহমান ছোট মনির এলাকা চন্দ্রবাড়ি, পালপাড়া গ্রাম। এক নামে সবাই পালবাড়ি নামে চিনে। সেখানে গিয়ে ঘাটাইলডটকমের দেখা হয় সাধন চন্দ্র পাল, সুব্রত চন্দ্র পাল, অখিল চন্দ্র পাল, সুমিত্রা পাল, গীতা পাল, ও সমাপ্তি পালের সঙ্গে। তাহারা সবাই মাটির তৈরি বিভিন্ন টয়লেটের পাট, মাটির হাড়ি-পাতিল, সরা, ভাড় কলসি, রসের ঢিলি, তাওয়া, নান্দা, ফুলের টব, দেব-দেবীর মুর্তি সহ আরও অনেক কিছু। এই গ্রামের নারী-পুরুষ সবারই কাদা-মাটির গন্ধ মাখা শরীর। রাত দিন কাজ করে মাটির মানুষ হয়ে গেছেন তাহারা। তাদের অভিযোগ রাত দিন পরিশ্রম করেও আমরা পরিবার পরিচন নিয়ে চলতে পারছিনা। সরকারের পক্ষ হইতে আমাদের কোন খুঁজ খবর নেয় না। কোন দিন এক বেলা কোন দিন দুই বেলা খেয়ে, মোটা ভাত, মোটা কাপড় পড়ে কোন ভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে আছি মাত্র।

তারা বলেন আগে মাটি এমনিতেই পাওয়া যেত। বর্তমানে মাটি কিনতে হয় মোটা অংকের টাকা দিয়ে। ফলে উৎপাদিত সামগ্রীর দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা ঘাটাইলডটকমকে বলেন, মাটির তৈরি অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি পোড়ামাটির সেনিট্রেশন রিংয়ের চাহিদা শহরে না থাকলেও প্রত্যন্ত মফস্বল এলাকায় চাহিদা এখনো রয়েছে। যেটা আকড়ে ধরে আমরা এখনো বেঁচে আছি। শত ভাগ সেনিট্রেশন সুবিধা নিশ্চিত করার পেছনে আমাদের ভূমিকা সব চেয়ে বেশি। গ্রামে টয়লেট নির্মাণে পোড়ামাটির রিং ব্যবহার হয়। এটা অত্যানরÍ মজবুত ও টেকশই।

গোপালপুরের ডুবাইল কালিবাড়ী এলাকায় প্রায় একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনমতে বেঁচে আছে বলে তারা জানান।

ডুবাইল এসে ঘাটাইলডটকমের কথা হয় রঘুনাথ পালের সাথে। পেশায় দর্জি হলেও অবসরে হিন্দুদের সর্ব বৃহৎ সারদিয় দূর্গা উৎসবে তিনি মাটির তৈরি প্রতিমা বানিয়ে থাকেন। তিনি বলেন একটি পূঁজা মন্ডব সাজাতে মোট সাতটি প্রতিমা লাগে। দূর্গা, অসুর, সিংহ, কার্তিক, গনেশ, লক্ষী ও স্বরস্বতি। এদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা ভূমিকা রয়েছে।

দূর্গা হচ্ছে শক্তির দেবতা। অসুর হল দানব প্রকৃতির সে অধর্মের কাজ করে থাকে। সিংহ হচ্ছে দূর্গা দেবীর বাহন। কার্তিক হচ্ছে যুদ্ধের প্রতীক। গনেশ হচ্ছে সিদ্ধি দাতা, কোথাও যাত্রা করলে তার নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করলে যাত্রা শুভ হয়। লক্ষী হচ্ছে ধনের প্রতীক। স্বরস্বতী হচ্ছে বিদ্যার প্রতীক, তার বাহন হচ্ছে হাঁস। এভাবেই সে বিস্তারিত খুলে বললেও তার ভেতরেও রয়েছে চাপা কষ্ট। তিনি বলেন, একটি প্রতীমা তৈরী করতে ১৫ থেকে ২০দিন সময় লাগে। মাটি পাওয়া যায় না। খরচের তুলনায় টাকা পয়সা পাই না। অনেক সময় বাকীতেও কাজ করতে হয়। বর্তমান সময়ে সংসার চালানো খুবই দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

পরিশেষে তারা আক্ষেপ করে ঘাটাইলডটকমকে বলেন, বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আমাদের এই মৃৎ-শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সরকারকেও আমাদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যাংক লোন সহ সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে। আধুনিক বিশ্বে এখন রং-বেরঙ্গের বিভিন্ন ডিজাইনের ঘর সাজানোর সরঞ্জাম ফুলদানি, ফুলের টব, থালা, বাটি, প্লেট সহ সকল কিছুই আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরী করে তাদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। আমরা সরকারী বা বেসরকারী ভাবে কোন সহযোগীতা পাই না বলেই দিন দিন আমাদের দেশ থেকে মৃৎ-শিল্পের প্রচলন উঠে যাচ্ছে।

(আতিকুর রহমান, ঘাটাইলডটকম)/-