ঘাটাইলে ৩ স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা স্থানীয়দের

‘পরিধানের জামা ছেঁড়া, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহৃ, কারো কারো শরীর থেকে রক্তও ঝরছিল। ভয়ে-আতঙ্কে পাগলের মতো একটু আশ্রয়ের জন্য দিকবিদিক ছুটছিল তারা।’  টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে বেড়াতে গিয়ে ৩ স্কুলছাত্রী গণধর্ষণের পরের ঘটনা ঘাটাইলডটকমের নিকট এভাবেই বর্ণনা করছিলেন স্থানীয়রা। স্থানীয় অটোচালক মজনু মিয়া আজ মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) বলেন, ওই রাতে অটোরিকশায় ওঠানোর সময় সেই স্কুলছাত্রীদের এই অবস্থায় দেখি।

মজনু মিয়া বলেন, প্রতিদিনের মতো কুশারিয়া বাসস্ট্যান্ডে বসে গ্রামের যারা কেরাম খেলছিল, তাদের খেলা দেখছিলাম। রাত ৯টার দিকে একজন লোক এসে অটোচালক আজিজুলকে বললো সেনাবাহিনীর ফায়রিং রেঞ্জের রাস্তার মাথায় কয়েকজন লোক আছে, তাদের বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে আসতে হবে। নিজের অটোতে চার্জ নেই জানিয়ে আজিজুল আমাকে ওই স্থানে যেতে বলে। পরে আমি সেখানে যাই। সেখানে গিয়ে চার মেয়ে এবং তিন ছেলেকে দেখতে পাই। মেয়েগুলো ভয়ে কাঁপছিল। পরে তারা অটোরিকশায় উঠে বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যেতে বললে আমি নিয়ে যাই। পরে সেখান থেকে চলে আসি।

কুশারিয়া বাসস্ট্যান্ডের চায়ের দোকানদার সুমন বলেন, কুশারিয়া গ্রামের নারী মেম্বারের ছেলে হৃদয় ওই মেয়েগুলোকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাইলে ভয়ে ওরা বলে ‘আবার আমাদের পাহাড়ে নিয়ে যাবেন (ওদের বাড়ি ফেরার রাস্তা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে)! আমরা আর পাহাড়ের দিকে যাবো না’। তাহলে কোথায় যাবে? এমন প্রশ্ন করা হলে ওই মেয়েদের মধ্যকার একজন বলে ‘আমার নানীর বাড়ি মাকরাইয়ের ছামানের বাজার, সেখানে যাবো।’ পরে অটোচালক তাদের ছামানের বাজার রেখে চলে আসে।

সুমন বলেন, ওই রাতে মেয়েগুলো কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। বাসস্ট্যান্ডে তারা কিছু সময় অবস্থান করেছিল। সেসময় তাদের সঙ্গে ওইদিন ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দেয়। তারা বলে, ‘৫-৬ জন যুবক এসে আমাদের ছেলে বন্ধু ও আমরা যে অটো নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম সেই অটোচালককে মারধর করে। আমাদের কাছে মোবাইলসহ যা কিছু ছিল সব নিয়ে গেছে। এক পর্যায় ওই লোকগুলো আমাদের সবাইকে বেঁধে ফেলে। আমরা ধস্তাধস্তি করলে তারা আমাদেরও মারধর করে। এর কিছুক্ষণ পর একটু দূরে নিয়ে গিয়ে আমাদের ধর্ষণ করে।’

সুমন বলেন, তাদের পরনের কাপড় ছেঁড়া ছিল। শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহৃ দেখা যাচ্ছিল, কারো কারো শরীর থেকে রক্ত ঝড়ছিল। ধস্তাধস্তি করার সময় হয়তো পাহাড়ি কাঁটার আঘাত লেগে তাদের শরীর ছুলে গেছে। তাদের কাপড়ে চোরাকাটা লেগেছিল।

এদিকে ওই রাতে ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীদের ছেলে বন্ধু শাহিন আশ্রয় চায় সন্ধানপুর ইউনিয়নের স্থানীয় মহিলা ইউপি সদস্য কুলসুমের বাড়িতে। মেম্বার কুলসুম বলেন, রাতে বিপদে পরে একটি ছেলে আমাদের বাড়ি এসে বলে রাতে থাকতে চায়। পরে তার কাছে সবকিছু শুনে ওই ছেলের গ্রামের বাড়িতে তার বাবার কাছে ফোন করলে তিনি রাতে এসে ছেলেকে নিয়ে যান।

ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত মিলেছে

তিন ছাত্রী গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ইউসুফ, বাবুল ও সুজনকে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার আরেকজনের নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ। মঙ্গলবার বিকেলে টাঙ্গাইল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের সোপর্দ করা হয়। পরে সন্ধ্যায় ম্যাজিস্ট্রেট ১৬৪ ধারায় তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এর আগে সোমবার রাতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে ধর্ষণের শিকার তিন স্কুলছাত্রীর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে চিকিৎসক।

প্রকাশ: রবিবার (২৬ জানুয়ারি) ঘাটাইলের এসই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির চার ছাত্রী দুই ছেলে বন্ধুকে নিয়ে ঝড়কা এলাকায় ঘুরতে যায়। এ সময় পাঁচ-সাতজন ব্যক্তি তাদের ঘিরে ফেলে। সেসময় দুই ছেলে বন্ধু হৃদয় ও শাহীনকে মারধর করে তিনজনকে ধর্ষণ করে তারা। ভাগ্নির মতো দেখা যায় বলে একজনকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত থাকে ধর্ষকরা। রোববার (২৬ জানুয়ারি) দুপুর দুইটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আটকে রেখে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায় তারা। পরে মোবাইল ফোনে অভিভাবকদের বিষয়টি জানানো হলে তারা থানা পুলিশকে জানালে পুলিশ চার স্কুলছাত্রীকে উদ্ধার করে। এ ব্যাপারে এক ধর্ষিতার বাবা মোঃ আবুল কাশেম বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জনকে আসামী করে ঘাটাইল থানা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করে। পরে সোমবার (২৭ জুলাই) ঘাটাইলের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে সন্ধানপুর ইউনিয়নের সাতকুয়া এলাকা থেকে ইফসুফ ও বাবু এবং সুজনকে আটক করে পুলিশ।

(মাসুম মিয়া, ঘাটাইলডটকম)/-