ঘাটাইলে স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশা

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে রয়েছে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল, ১১ টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র এবং ৫৫ টি কমিউনিটি ক্লিনিক সহ প্রায় ৩০/৩৫ টি ক্লিনিক ও হাসপাতাল। এত সব স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থাকার পরও প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। চলছে চিকিৎসার নামে নিষ্ঠুর প্রতারণা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাকুটিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র (সাব- সেন্টার) কার্যত চারটি পোস্টের বিধান থাকলেও মূলত সেখানে মেডিকেল অফিসারের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেখানে মো. শামীম মিয়া নামে একজন কমপাউন্ডার (সেকমো) দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি সাব-সেন্টারে বসে রোগী না দেখে বাইরে হাওয়া খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ফার্মাসিস্ট অফিসে আসে না গত চারদিন ধরে।

অফিসের পিয়ন ফজলুল হককে দিয়ে অনেক কষ্টে তাকে খুঁজে বের করে নিয়ে এসে রোগীর সংখ্যা এতো কম কেন প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, এখানে বেশ কয়টি ক্লিনিক ও ডাক্তারের  চেম্বার থাকায় রোগীরা এখানে আসতে চায় না।

চিকিৎসা নিতে আসা পশ্চিম পাকুটিয়া গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব হালিমা বেগম জানান, ডাক্তার কিছু জানে না, বুঝে না। এখানে ওষুধ থাকলেও আয়রন আর প্যারাসিটামল ছাড়া কিছুই দেয় না। শুধু কাগজ লিখে  দেয়। আমরা গরিব মানুষ। টাকা দিয়ে ওষুধ কীভাবে কিনে খাবো। আমাদের সামর্থ্য নেই।

আনেহলা ইউনিয়ন সাবসেন্টার। এখানে আবু সাঈদ নামে একজন সেকমো কর্মরত আছেন। তিনি অফিসে আসেন কালেভদ্রে। সকাল ৮ টা থেকে অফিসের দরজা খোলা থাকলেও অফিস স্টাফ ফার্মাসিষ্টের দেখা মিলে বেলা প্রায় সাড়ে দশটায়।

মেডিকেল অফিসার ও সেকমো অফিসে আসবেন কখন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- মেডিকেল অফিসার এখানে শুরু থেকেই আসে না। সেকমো স্যার হয়তো ছুটিতে আছেন। ফোনে কথা বলার জন্য নাম্বার চাইতেই তিনি বলেন আজ মূলত আমার ডিউটি। স্যার ডিউটি ভাগ করে নিয়েছেন। আমি ৩/৪ দিন অফিস করি আর বাকি সময়টা স্যার করেন।

ব্রাহ্মণশাসন সাবসেন্টারে সেকমো হিসেবে কর্মরত আছেন মো. হারুন-অর-রশিদ। এক সপ্তাহে চারবার গিয়েও তার দেখা মেলেনি।

মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি ব্যস্ত রয়েছেন। পরে কথা হবে বলে জানিয়ে ফোন বন্ধ করে ফেলেন।

তার হাজিরা খাতা অনুসন্ধান করে দেখা যায়, কোনোদিন তার হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর বাদ নেই। পুরো সপ্তাহের হাজিরা খাতায় তিনি একদিনেই সারা মাসের স্বাক্ষর করে রাখেন। অফিস সামলাচ্ছেন একজন মহিলা ফার্মাসিস্ট।

হাজিরা খাতায় অগ্রিম স্বাক্ষর সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এখানকার ফার্মাসিস্ট কয়েকজন বয়স্ক মহিলাকে খাতায় কোনো ওষুধ এন্ট্রি না করে, প্রেসক্রিপশন ছাড়াই চার পিস করে ওমিপ্রাজল ও ছয় পিছ করে প্যারাসিটামল হাতে ধরিয়ে দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বাকি কোনো অফিস স্টাফের দেখা পাওয়া যায়নি। এখানেও চলে ভাগ-বাটোয়ারার ডিউটি।

একই দৃশ্য দেখা গেছে উপজেলার ১১ টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে।

অপরদিকে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো নিয়েও রয়েছে সাধারণ মানুষের বিস্তর অভিযোগ।

উপজেলায় ৫৫ টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকার পরেও মানুষ সেবা ও ওষুধ না পেয়ে অনেক স্থানেই হট্টগোল করার চিত্রও লক্ষ্য করা গেছে। মাসের পর মাস অনেক কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ থাকার কারণে বাচ্চাদের টিকাগুলোও সময়মতো দিতে পারছে না। এগুলো দেখার মতো কেউ নেই।

এ বিষয়ে ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাইফুর রহমান খান ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, সাবসেন্টারগুলোতে করোনাকালীন সময়ে ডিউটি ভাগ করে দেয়া হয়েছে। সবাই একত্রে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাহলে তো তালা ঝুলিয়ে রাখতে হবে।

করোনার আগেও তো ঠিকমতো ডাক্তার পাওয়া যায়নি- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কিছু অনিয়ম সব জায়গাতেই থাকে। আমরা নিয়মিত সব দিক পর্যবেক্ষণে রেখেছি। আর মেডিকেল অফিসারদের উপজেলা সদরে ডিউটি দেয়া হয়েছে। আর কমিউনিটি ক্লিনিকে কিছু ফাঁকিবাজ লোক রয়েছে। অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে আশা করি।

(আতিকুর রহমান, ঘাটাইল ডট কম)/-