ভাগবাটোয়ারায় সমন্বয় করতে না পারায়: ঘাটাইলে ফেরত যাচ্ছে ৪০ দিনের কর্মসূচি প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৪০ দিন কর্মসূচি প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ ফেরত যাচ্ছে। ২৩ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে অর্থ ফেরত পাঠানো সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস।

কী পরিমাণ অর্থ ফেরত যাচ্ছে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) পিআইও এনামুল হকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, ফেরত যাওয়া অর্থের পরিমাণ এক কোটি ২৬ লাখ টাকার মতো হতে পারে।

কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অব্যায়িত অর্থের পরিমাণ এক কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪০০ টাকা।

জানা গেছে, বিগত অর্থবছরগুলোতে পিআইও এনামুল হকের বিরুদ্ধে ৪০ দিন প্রকল্পে শ্রমিক না খাটিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশে ভাগবাটোয়ারা করে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে।

আর এ অভিযোগে ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ‘ভুয়া প্রকল্পে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ফলে চলতি অর্থবছরে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা ভাগবাটোয়ারায় সমন্বয় করতে না পারায় এ অর্থ ফেরত যাচ্ছে।

তবে অব্যায়িত অর্থ ৪ মাসের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়নি পিআইও অফিস।

৭ ডিসেম্বর থেকে কর্মসূচির কাজ শুরু হয়ে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তা শেষ হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪০ দিন কর্মসূচি কাজের প্রথম পর্যায় ঘাটাইলের ১৪ ইউনিয়নে ৬৬টি প্রকল্পের বিপরীতে সরকার বরাদ্দ দেয় ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯১ হাজার ২৩৯ টাকা। কিন্তু পিআইও উপজেলা মসিক সমন্বয় সভায় বরাদ্দের পরিমাণ জানান ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪ হাজার টাকা।

মাসিক সমন্বয় সভায় মোট বরাদ্দ থেকে ১৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৩৯ টাকা আড়াল করেন পিআইও এনামুল হক।

প্রতিবেদকের কাছে তথ্য প্রমাণ থাকায় তিনি তা স্বীকার করে বলেন, এ টাকা খাতাপত্র কেনায় খরচ হয়েছে। এদিকে ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এ প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর অ্যাকাউন্টে ব্যক্তির মারফত নগদ ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ২১৭ টাকা জমা দেয়া হয়।

অপরদিকে পিআইও এনামুল হকের বিরুদ্ধে ওই প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে সরেজমিনে তদন্তের দাবি করে এলাকাবাসী বিভিন্ন দফতরে লিখিত আবেদন করেন।

এলাকাবাসীর আবেদন আর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চলতি বছর ১৫ জানুয়ারি টাঙ্গাইল অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ শহিদ উল্লাহর কার্যালয়ে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তদন্তকার্য সম্পন্ন হয়।

কিন্তু ওই তদন্ত আলোরমুখ দেখছে কি না, তা জানেন না এলাকাবাসী। ফলে এলাকাবাসী এ প্রতিবেদকের কাছে হতাশা প্রকাশ করেন।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪০ দিন কর্মসূচি কাজের মধ্যে লক্ষ্মীন্দর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ৩০৯ জন এবং ঘাটাইল ইউনিয়নে সবচেয়ে কম ১২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন।

জানতে চাইলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আনেহলা ইউপি চেয়ারম্যান তালুকদার মো. শাহজাহান বলেন, শ্রমিক সংকট নয়, ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার কারণেইে উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা ফেরত যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ওই সময় জানতে পারি তৎসময়ে উপজেলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে পিআইও কোনো প্রকার সমন্বয় করেন নাই।

যার কারণে তিনি সাংবাদিক দিয়ে প্রকল্পের বিষয়ে নিউজ করান। ফলে ইউএনও ও পিআইও ভয় পেয়ে চেয়ারম্যানদের শ্রমিক বাবদ সাত দিনের বিল কেটে দেন। আমরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে শ্রমিকের বিল পরিশোধ করি।

তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের কাজ শুরু হওয়ার আগেই আমি বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলি।

তিনি জানান, আগে আমি উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ছিলাম, তখন ৪০ দিনের কর্মসূচি থেকে আমাকে একভাগ টাকা দিত, এখন আমি একদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান অপরদিকে দলের আহ্বায়ক হওয়ার ফলে আমাকে দুই ভাগ দিতে হবে।

তাতে কী পরিমাণ দিতে হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাত যোগ সাত, মানে ১৪ লাখ।

এ ব্যাপারে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম লেবু তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এলাকায় ৪০ দিন কর্মসূচির কাজে লেবারের যে তালিকা আছে সেই লেবারের অর্ধেক দিয়েও কাজ করানো হয় না।

ইতিপূর্বে এই টাকাগুলো তারা লুটপাট করে খেয়েছেন। আমি তার প্রতিবাদ করেছি। এ কাজের সঙ্গে আমার উপজেলা পরিষদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা মিথ্যা বানোয়াট।

জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. এনামুল হক বলেন, শ্রমিক উপস্থিতি কম ছিল। দু’শ টাকা মজুরিতে কেউ কাজ করতে চায় না।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, আমি উপজেলায় যোগদান করার আগেই ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। যতটুকু শুনেছি শ্রমিক সংকটের কারণেই টাকা ফেরত যাচ্ছে।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-