ঘাটাইলে এক প্যাকেট বিড়ির দামে খাসি, সিগারেটের দামে মিলছে গরুর চামড়া

বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহৎ রপ্তানি পণ্য কাঁচা চামড়ার বাজার আজ ধ্বংসের পথে। সিন্ডিকেট, প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবাধে চামড়া পাচার, ব্যাংক ঋণের অভাব, চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলমান থাকা সহ নানা অযুহাতের মধ্যে দিয়ে বর্তমানে রপ্তানীমুখী এই চামড়া শিল্পটি নিষিদ্ধ পণ্য বিড়ি-সিগারেটের দামে এসে পৌঁছেছে। বর্তমান শিল্পটির অবস্থা এতটাই নাজুক যে, এক প্যাকেট বিড়ির দামে মিলছে একটি খাসি ও ভেড়ার চামড়া এবং এক প্যাকেট সিগারেটের দামে মিলছে গরু ও মহিষের চামড়া। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়া চামড়ার বাজার ঘুরে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে।

অর্থনীতির অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ এই চামড়া শিল্পটির সাথে একদিকে যেমন দেশের নিম্ন আয়ের কয়েক লক্ষাধিক মানুষের আহার জড়িত, অপরদিকে এতিম, মিসকিন, গরীব অসহায় ও মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্র-শিক্ষক সহ প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের আহারের ব্যবস্থা হয় এই শিল্প থেকে অর্জিত অর্থে, যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দান করেন। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে এবার চামড়া শিল্প নিয়ে চলছে ব্যাপক নাটকিয়তা ও গরীব দুঃখী মানুষের ভাগ্য নিয়ে চলছে চরম নিষ্ঠুুরতা।

বিশ্ব বাজারে ২০১২ সাল পর্যন্ত দেশীয় এই পণ্যটি প্রতাপের সাথে মাঠ দখল করে রেখেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে হঠাৎ করে রপ্তানিমুখী চামড়া ব্যবসায় ধ্বস নামে। দুই- তিন হাজার টাকার একেকটি চামড়ার দাম মুহুর্তের মধ্যে মাত্র এক হাজার টাকার নিচে নেমে আসে। ২০১৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত গুরত্বপূর্ণ এই শিল্পটির দিকে নজর নেই খোদ সরকার থেকে শুরু করে এই খাতে সংশিষ্ট কোন মহলের।

গত বছর অনেক চামড়া যেমন মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল ক্ষুব্ধ জনগণ, ঠিক একই কারনে এ বছর অনেক চামড়া মানুষ বানের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে।

সরেজমিনে এবারের ঈদের দিন বিকাল থেকে শুরু করে আজ রোববার (৯ই আগষ্ট) পর্যন্ত দেশের সর্ববৃহৎ চামড়া বাজার ঘাটাইলের পাকুটিয়ার হাট, বল্লা বাজার হাট, বটতলী কাঁচা চামড়ার হাট সহ ঘাটাইলের সব ক’টি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয় কিছু মৌসুমী ব্যবসায়ি, ঋষি, ফড়িয়া, ছোট ও মাঝারি প্রকৃতির হাতে গোনা কয়েকটি ট্যানারির মালিক হাটে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় কিছু দালাল ও এজেন্টের মাধ্যমে চামড়া দর দাম করাচ্ছেন ও বিড়ালের মতো কাটা বেছে বেছে বড় আকারের চামড়াগুলো নামমাত্র মুল্য দিয়ে ক্রয় করছেন।

ঢাকা, সাভার, হেমায়েতপুর, জামালপুর, শেরপুর, সরিষাবাড়ি, রৌমারী, রাজিবপুর, নেত্রকোনা, মোহনগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মৌসুমী ও খুচরা ব্যবসায়িরা পাকুটিয়া হাটের আগের দিন রাতেই ট্রাক, বটবটি, নছিমন, ভ্যান সহ ছোট বড় যানবাহনে করে শত শত পিচ চামড়া নিয়ে হাটে এসে জড়ো হয়েছেন বিক্রি করার উদ্দেশ্য। সাড়া হাটের জায়গা সহ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপরে বসেছে বিশাল চামড়া বাজার। সারি সারি স্তুপাকারে চামড়া উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ চামড়া বাজার পাকুটিয়া (পাকিস্তানের) হাটে। ছোট, বড় মৌসুমী ব্যবসায়িদের আনাগোনায় হাট মুখরিত হয়ে উঠলেও ক্রেতার দেখা সহজে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বল্লা বাজার থেকে কয়েকটি ট্যানারী মালিক ও সাব ট্যানারী এজেন্সির কয়েকজন ক্রেতা ছাড়া বড় কোন ট্যানারী মালিক হাটে আসেনি। যাও এসেছে তারা বড় বড় চামড়াগুলো উলটপালট করে দেখছেন আর সাবধানে দরদাম করছেন। একটু ছোট ও মাঝারি আকৃতির চামড়া পড়ে রয়েছে যেখানকার চামড়া সেখানেই।

অন্যান্য বছর মাঝ রাত থেকে চমড়া বেঁচা বিক্রি শুরু হলেও এ বছর বেলা গড়িয়ে সন্ধা ঘনিয়ে এলেও তেমন চামড়া বিক্রি করতে দেখা যায়নি মৌসুমী ব্যবসায়িদের।

সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ ও রপ্তানির ঘোষনা দেওয়ার পরও কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি না হওয়ার কারণ সম্পর্কে বেশ ক’জন ট্যানারি মালিক ও আড়ৎদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছর গত বারের চেয়ে মাত্র পাঁচ শতাংশ চামড়া কম উঠেছে। ধারনা ছিল বন্যা ও করোনা মহামারিতে পশু কোরবানি কম হবে যার ফলে চাহিদা বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

তাছাড়া ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তর, ট্যানারি মালিকদের আর্থিক সংকট, আড়ৎদারদের সময় মতো পাওনা পরিশোধ করতে না পারা, চামড়া প্রক্রিয়া জাত ও কাটিং খরচ দ্বিগুন বৃদ্ধি পাওয়া, শ্রমিক সংকট, বিশ্ব বাজারে চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়া সহ গত ২/৩ বছর আগের চামড়া গোডাউনে পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া সহ বিভিন্ন যুক্তি দেখাচ্ছেন তারা।

অথচ সরকার এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় চামড়ার দাম ২০ থেকে ২৯ শতাংশ কমিয়ে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

ঈদের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তাদের সাথে বৈঠক করে ঢাকায় কোরবানি পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন লবণ যুক্ত গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৩৫-৪০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট ২৮-৩২ টাকা। খাসির চামড়া গত বছরের তুলনায় ১৮-২০ টাকা কমিয়ে এ বছর ১৩-১৫ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

তারপরও কেন এমন ছন্দপতন তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ সরকারকে দোষারোপ করছেন আবার অনেকেই সিন্ডিকেটকে দোষারোপ করছেন। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কোন বনিবনা নেই। কেউ চোখের পানিতে গামছা ভিজিয়ে ফেলছেন, আবার কেউ কেউ ফোকলা হাঁসি দিয়ে পানির দামে শরবত কিনছেন।

আসলে হয়েছে কি? কারন খুঁজতে ও অনুসন্ধান করতে গিয়ে ঘাটাইলডটকমকে কাছে ক্রেতা, বিক্রেতা সহ সাধারণ মানুষ তাদের নানা ধরনের মতামত দিয়েছেন।

ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ থেকে মৌসুমী ব্যবসায়ি নন্দ দুলাল এসেছেন ৭৯০ পিছ গরুর চামড়া নিয়ে।

তিনি ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, সেই ভোর থেকে এখন (বিকাল) পর্যন্ত চামড়া উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখিয়েছি প্রায় ৪৫-৫০ বার। কিন্তু এখনো এক পিস চামড়া বিক্রি করতে পারি নাই।

যে দাম বলছে তাতে চামড়ায় লবন দেয়া, শ্রমিক খরচ, গাড়ি ভাড়া ও হাটের খাজনা মিলিয়ে দেখলে অর্ধেক টাকাও উঠবে না। এই চামড়া যদি পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে লবন, গাড়ি ভাড়া ও শ্রমিক খরচ দিতে হয় তাহলে বাড়ি ভিটা বিক্রি করে ধার দেনা পরিশোধ করতে হবে বলে ক্ষোভের সাথে জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ থেকে ৬৫৭ পিস চামড়া নিয়ে এসেছেন মৌসুমী ব্যবসায়ি হাবিব মিল্লাত।

তিনি ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, অনেক বড় বড় হাই কোয়ালিটির চামড়া নিয়ে এসেছিলাম। যে দাম বলছে (বড় ও মোটা চামড়ার দাম বলছে ৩৭৫ থেকে ৪৩০ টাকা) তাতে আমার প্রতি চামড়ার পরতা আরও অনেক বেশি। এ বছর আমাকে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হবে।

গতকাল থেকে না খাওয়া দুলাল চন্দ ঋষি চামড়া কিনেছিলেন পাকুটিয়া বটতলী বাজার থেকে।

তিনি ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, এ বছর চামড়া কিনে ভূল করেছি। অনেক টাকা লোকসান দিয়ে চামড়া বিক্রি করতে হবে। ভিটে মাটি যা ছিল সব যাবে। মরণ ছাড়া সামনে কোন পথ খোলা নেই।

মোঃ স্বপন মিয়া ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি থেকে এসেছেন ৯০০ পিস ভালমানের গরুর চামড়া নিয়ে।

তিনি ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, একদিকে বন্যায় ভিটে মাটি সব হারিয়ে গেছে, অপরদিকে চামড়া নিয়ে এসে পড়েছি মহাবিপদে। ঋণ করে চামড়া কিনে নিয়ে এসেছিলাম। যে দাম (২০০/৫৫০) বলছে তাতে আমাদের যে টাকা খরচ হয়েছে তার অর্ধেক টাকাও উঠবে না। কি করবো বুঝতে পারছিনা।

মোঃ শহিদুল ইসলাম ১৭২ পিস গরুর চামড়া নিয়ে এসেছেন মুক্তাগাছা থেকে।

তিনি ঘাটাইল ডট কমকে জানান, ভাল ও মোটা চামড়া ৪৫০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হলেও অপেক্ষাকৃত দ্বিতীয় শ্রেনীর চামড়ার দাম বলছেন ৫০-৬৫ টাকা।

মিন্টু ঋষি ১৬০ পিস খাসির চামড়া নিয়ে হাটে এসেছেন পাকুটিয়া থেকে।

তিনি ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, আমার ১৬০ পিস খাসির চামড়ার মোক্তা দাম বলছেন ৪০০ টাকা। কোথায় যাই, কি করি বুঝতে পারছি না।

এ ব্যাপারে হাটে চামড়া ক্রয় করতে আসা কয়েকজন ট্যানারি মালিকের সাথে কথা বলতে চাইলে তারা ঘাটাইল ডট কমের নিকট তথ্য দিতে অপারগতা ও অনিহা দেখান। তারা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে মোঃ নাঈম বিশ্বাস (পোস্তা লালবাগ ট্যানারি) ও বাপ্পি মজুমদার (বি,এন,এস ট্যানারি), মোঃ লিয়াকত আলী (এ্যাপেক্স ট্যানারি) ঘাটাইল ডট কমকে জানান, আমরা পরিস্থিতির শিকার। বিশ্ব অর্থনীতি মন্দা থাকার কারনে ও ব্রাজিল, চীন, ইন্ডিয়া সহ বেশ ক’টি দেশের চামড়া বাজার আমাদের দেশের তুলনায় কম দাম থাকায় তারা আমাদের দেশ থেকে চামড়া নিচ্ছে না।

গোডাউনে ২/৩ বছর আগের চামড়া মজুদ আছে। সেগুলো বিক্রি করতে পারিনি। আবার নতুন করে বেশি দামে চামড়া কিনে পথে নামতে হবে। কোটি কোটি টাকা লোকসানে আছি। আমাদের কিছু বলার নেই। সরকার আমাদের সহযোগিতা না করলে মাঠে মরতে হবে বলে তারা ঘাটাইল ডট কমকে জানান।

পাকূটিয়া চামড়া হাট মালিক সমিতির মোঃ আবির হোসেন সজিব ও মোঃ এমদাদুল হক খান ভুলু ঘাটাইল ডট কমকে জানান, গত রোজার ঈদে যে পরিমান চামড়া আমদানি হয়েছিল এবার কোরবানির ঈদেও সে পরিমাণ চামড়া উঠেনি। করোনা মহামারি ও বন্যার কারণে দেশের সর্ববৃহৎ চামড়া বাজারটি আজ বিলুপ্তির পথে। যে পরিমান টাকা দিয়ে হাট ডেকে আনতে হয়েছে তার অর্ধেক টাকাও এ বছর আমদানি হবে না। সব মিলিয়ে আমরাও খুব বেকায়দায় আছি বলে তারা জানান।

(আতিকুর রহমান, ঘাটাইল ডট কম/-