ঘাটাইলে একজন অচেতন মানুষ এবং ইউএনও’র মানবিকতা

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দুপুরের দিকে একজন মানুষ অচেতন হয়ে পরে ছিল। পরবর্তীতে সংবাদটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মী, পৌর মেয়র এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দৃষ্টিগোচর হলে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাথে যোগাযোগ করে এ্যাম্বুলেন্স সহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মুমূর্ষু ওই রোগীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এই ঘটনাটি ঘাটাইলের জনসাধারণের মাঝে সর্বোপরি সচেতন মহলে ইউএনওর মানবিক কর্মকাণ্ডর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ তৈরি করেছে।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা এগারটার পরে যেকোন সময় থেকে ঘাটাইল পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম এলাকায় রাস্তার ধারে হোটেল তাজমহলের পাশে একজন মানুষ অচেতন হয়ে পরে রয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। ঘাটাইলে নতুন করে আজ দুজনের মধ্যে যখন করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং প্রশাসন এলাকায় জনসমাগম রোধে নিরলস কাজ করছেন, ঠিক সেই সময় ওই লোকটির অচেতন হয়ে পরে থাকার সংবাদটি মুহূর্তেই করোনাভাইরাস আতঙ্ক তৈরি করে। প্রশাসন যখন লোকজনের বাঁধভাঙ্গা যাতায়াত রোধে হিমসিম খাচ্ছে, ঠিক তখন তার অচেতন হয়ে পরে থাকার সংবাদে আকস্মাত খালি হয়ে হয়ে যায় বাসস্ট্যান্ড এবং বাজার রোড এলাকা।

অনলাইন এক্টিভিষ্ট জাহান কলি ওই লোকটির অচেতন হয়ে পরে থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে লিখেন, “ঘাটাইল বাসস্ট্যান্ডে এভাবে মৃতপ্রায় অচেতন পড়ে আছে একজন। করোনা আতঙ্কে কেউ তার পাশে যাচ্ছে না, স্বেচ্ছাসেবকরা উৎসুক লোকজন নিয়ন্ত্রণ করছেন। দ্রুত ব্যবস্থা নিন।” পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন ‘ঘাটাইলের কথা’ এর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তার পরে থাকার বিষয়টি ফেসবুক লাইভে দেখান। সাথে সাথে সংবাদটি পৌঁছে যায় ঘাটাইল পৌরসভার মেয়র শহিদুজ্জামান খান শহীদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকারের নিকট। এ ঘটনায় প্রশাসনে শুরু হয় তোলপাড়। ফলশ্রুতিতে কিছুক্ষণ পর বেলা সোয়া দুইটার সময় ইউএনও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ইউএনওর অনুরোধে এরপর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিস এবং ঘাটাইল থানা পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এ্যাম্বুলেন্স সহকারে। পরে স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে উন্নত চিকিতসার জন্য এ্যাম্বুলেন্স যোগে প্রেরণ করা হয় ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

এ ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেছেন ঘাটাইলের আপামর জনসাধারণ। করোনা আতঙ্কে কেউ যখন ওই অসুস্থ লোকটির সহায়তায় এগিয়ে আসছিলেন না, তখন দেবদূতের মতো আবির্ভূত হয়ে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করলেন একজন মানুষ অঞ্জন কুমার সরকার। অল্প কিছুদিন ধরে ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পাওয়া অঞ্জন কুমার এভাবেই নিজের কার্যক্রম দিয়ে মানুষের মন জয় করে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন ঘাটাইলের সাধারণ জনগণ।

এ বিষয়ে ইউএনও অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, ঘাটাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার পাশে একজন মানুষের অচেতন হয়ে পরে থাকার সংবাদ পাই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মী, পৌর মেয়র এবং স্বেচ্ছাসেবক ভাইদের মাধ্যমে। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাথে যোগাযোগ করে এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে বলে আমি কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক সহ ঘটনাস্থলে অপেক্ষা করতে থাকি এম্বুলেন্সের জন্য। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন।

তিনি বলেন, অতঃপর মুমূর্ষু ব্যাক্তিকে এ্যাম্বুলেন্সে তোলার জন্য দু-তিন জন ব্যক্তির সহায়তা কামনা করায় এগিয়ে আসে হাসপাতালের একজন স্টাফ, একজন স্বেচ্ছাসেবক এবং অন্যজন ছাত্রলীগ কর্মী। আর আশেপাশে শেষদৃশ্য দেখার অপেক্ষায় থাকা শত শত উৎসুক জনতা ছবি তুলতে ও ভিডিও করার কাজেই ব্যাস্ত ছিল।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সে সময় কেউ এক ফোটা পানি নিয়েও এগিয়ে আসেনি! ইহাই বাস্তবতা।

ঘাটাইলের ইউএনও বলেন, একজন মুমূর্ষু ব্যাক্তির পাশে আপনি আসবেন না, কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তাঁর পাশে সহমর্মিতার হাত না বাড়িয়ে তাঁকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করবেন, করোনা (COVID-19) ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করলে তাঁকে দাফন করতেও যাবেন না। কিন্তু আপনি এবং আপনার পরিবারের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে জারীকৃত বিধিনিষেধ অমান্য করতেও আপনার বিবেকবোধ কাজ করেনা।

ক্ষোভের সাথে তিনি আরও বলেন, মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করার চেয়ে মনুষ্যত্ব অর্জন করা অনেক কঠিন কাজ।

অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, পরিশেষে স্টাফ, স্বেচ্ছাসেবক এবং ছাত্রলীগ কর্মীর সহায়তায় মুমূর্ষু ব্যাক্তিকে এম্বুলেন্সে তোলা হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হয়।

এ সময় তিনি পৌর মেয়র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মী ভাইদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মহোদয়কে জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে অসহায় মুমূর্ষু ব্যাক্তির স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ধন্যবাদ জানান। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রলীগ কর্মীর প্রতি, অসহায় মানুষের পাশে নিঃসংকোচে হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-