ঘাটাইলে ইউপি চেয়ারম্যান হায়দর আলীর যত অপকর্ম

মোঃ হায়দর আলী। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা ২নং ঘাটাইল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। এই জনপ্রতিনিধি জনগণের পাশে থাকার কথা বলে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু কর্মে তিনি ভিন্ন রূপে হাজির হয়েছেন। জনপ্রতিনিধির বদলে তিনি এখন ইউনিয়নবাসীর কাছে আতঙ্ক ত্রাসে পরিণত হয়েছেন।

মোঃ হায়দর আলী চেয়ারম্যান নামের পাশে অপকর্মের তালিকার শেষ নেই। সময়ের সাথে সাথে সেই তালিকা কেবল দীর্ঘই হচ্ছে। শুধু অপকর্মের তালিকা দীর্ঘই নয়, হয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম।

সরকারী চাল আত্মসাৎ, বয়স্ক ভাতার টাকা আত্মসাৎ, মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করা, সাংবাদিকের উপর হামলা, অবৈধভাবে সরকারী গাছ কর্তন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, রাস্তা করে দেওয়ার নামে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে টাকা আদায়, ১০ টাকা কেজি দরের চাল আত্মসাৎ, অবৈধভাবে মাটির ব্যবসা, সরকারি খাস পুকুরের বালি বিক্রি করা, পাহাড়-টিলা কাটা, সরকারি অনুদান দেয়ার কথা বলে অর্থ নেয়া, অসহায় নারীদের কাছ থেকে রাস্তায় শ্রমিক নিয়োগ দিবে বলে ঘুষ নেয়া, মসজিদ মাদ্রাসার জন্য অনুদান, গ্রাম্য শালিশের নামে প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের সাথে জড়িত এই চেয়ারম্যান।

তার এই অপকর্মের প্রতিবাদ করলে, প্রতিবাদকারীর উপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।

জানা যায়, মোঃ হায়দর আলী চেয়ারম্যান এক সময় জাসদ রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। জাসদের রাজনীতিতে তেমন কোন সুযোগ সুবিধা না করতে পেরে চলে যান গার্মেন্টসে চাকরি করতে। পরবর্তীতে তিনি কিছুদিন এনজিওতেও চাকরি করেন। সেখানেও সুবিধা না করতে পেরে ২০১১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২নং ঘাটাইল ইউনিয়নে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করেন। নির্বাচনে তিনি ১৭২ ভোট পান এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

পরবর্তীতে ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মোঃ শহীদুল ইসলাম লেবুর হাত ধরে আওয়ামী রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং তাকে ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের মনোনয়নের ক্ষেত্রে তিনি সর্বাত্মক সহযোগীতা করেন।

২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে থাকেন।

জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম্য শালিসে বিচারের নামে প্রতারণার নানান অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো বিষয় নিয়ে কোনো ব্যাক্তি ইউনিয়ন পরিষদে বিচার দিলে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে শালিসে ভিন্ন খাতে রায় দিয়ে থাকে।

জানা যায়, টিলাবাজার (বাইচাইল) গ্রামের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আ: বাছেদ খান গত কয়েক বছর ধরে অনেক কড়ে কষ্টে একটি ঘর নির্মান করছে। ২নং ঘাটাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হায়দর আলী ওই মুক্তিযোদ্ধাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে কাজ বন্ধ করতে বলে এবং চেয়ারম্যান বলেন, ১ লক্ষ টাকা না দিলে ঘর নির্মাণ করা যাবে না। এমন অবস্থায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আ: বাছেদ খান টাকা দিতে অসম্মতি প্রকাশ করলে, এ সময় চেয়ারম্যান রাগান্বিত হয়ে চড় থাপ্পর মারতে উদ্দত হয়। পরে তাকে মারাত্মকভাবে নাজেহাল করে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আঃ বাছেদ খান বলেন, আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা চেয়ারম্যান আমাকে ঘর নির্মাণে বাঁধা দিয়েছেন। আমার কাছ থেকে তিনি ১ লক্ষ টাকা দাবি করেছেন, টাকা না দিলে আমাকে ঘর নির্মাণ করতে দিবেন না বলে তিনি জানান। আমি প্রতিবাদ করলে তিনি আমাকে লাঞ্ছিত করেছেন। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছি।

জানা গেছে, ঘাটাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হায়দর আলীর নেতৃত্বে কাজিপাড়া গ্রামের জনৈক কোরবান আলীর বাড়ির সাথে সরকারি একটি খাসপুকুর থেকে বালি উত্তোলন করা হয়েছে। ওই গ্রামের রায়হান মেম্বারের সঙ্গে যোগ সাজস করে সন্ত্রাসি কায়দায় সরকারি ভূমি থেকে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালি তোলা হয়। এতে কমপক্ষে ৬ লাখ টাকার বালি বিক্রি করা হয় বলে স্থানিয়রা জানিয়েছেন। এতে করে ওই পুকুরে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়ে একদিকে ফসলি জমি ভেঙ্গে পড়ছে অপরদিকে এলাকাটি জনবসতিপুর্ণ হওয়ায় আশপাশের ঘর-বাড়ি গুলো রয়েছে হুমকীর মুখে। ফলে বাড়ি-ঘর ধ্বসে যাওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে স্থানিয়রা।

স্থানিয় অধিবাসিদের অভিযোগ একটি রাস্তা নির্মানের কথা বলে চেয়ারম্যান হায়দর আলী সুকৌশলে পুকুরে ড্রেজার বসায়। ৫০ গজের মতো রাস্তায় বালিও ফেলানো হয়। এর পর আর রাস্তায় বালি না ফেলে টানা ৭/৮ দিন বালি তুলে পতিত জমিতে রাখা হয়। এ বিষয়ে এলাকাবাসি প্রতিবাদ করলে তাদেরকে নানা হুমকী দেয়া হয় বলে তারা জানিয়েছে।

বিষয়টি স্থানিয় প্রশাসনকে জানালে তারা ঘটনাস্থলে এসে বালি তুলতে নিষেধ করলেও কোন ফায়দা হয়নি। বরং এর পর থেকে বিপুল উৎসাহে বালি তুলা হয় বলে এলাকাবাসি জানান।

কাজিপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ আজগর আলী খা জানান, আমার জমির উপর দিয়ে অবৈধভাবে রাস্তা করে দিতে আমার পাশের বাড়ির মহর আলীর কাছ থেকে স্থানিয় ওয়ার্ড মেম্বার রায়হান ও চেয়ারম্যান হায়দর আলী মোটা অঙ্কের টাকা নেয়। একদিন আমি বাড়িতে না থাকায় তারা (ইউপি মেম্বার রায়হান ও চেয়ারম্যান হায়দর আলী) আমার জমির ওপর দিয়া জোড়করে রাস্তা নেওয়ার চেষ্টা করে। এতে আমার স্ত্রী রহিমা বাধা দিলে তাকে মারপিট করে তাকে লাঞ্চিত করা হয়। তার বুকে ছুরা ঠেকিয়ে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ ও হুমকী দেয়। এভাবে একদিন আমাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে তারা। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে রক্ষা পাই।

বাইচাইল পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত আবু হানিফের মেয়ে সখিনার কাছ থেকে এলজিইডি আরইআরএমপি-২ প্রকল্পের শ্রমিক নিয়োগ দেয়ার নামে ৭ হাজার টাকা নেয় হায়দর আলী। অনেক কড়েকষ্টে টাকা দিলেও ২ বছরেও তাকে চাকরি দেয়া হয়নি। এমনকি টাকাও ফেরত দেয়নি তাকে। হুমকীর ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানাতেও সাহস পাচ্ছেনা অসহায় ওই নারী।

সখিনা জানায় হায়দর আলী ও মিলন মেম্বার এক সাথে এসে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যায়।

শুধু সখিনা নয় তার ভাই রশিদের কাছ থেকেও ঘর দেয়ার নামে টাকা নেয় হায়দর আলী।

জানতে চাইলে রশিদ বলেন, সরকারি ঘর আনতে খরচের কথা বলে এক বছর আগে চেয়ারম্যানকে দুইবারে ২৭ হাজার টাকা দেই। প্রথম ২৫ হাজার টাকা দেয়া হলে দেই দিচ্ছি বলে ঘুরাতে থাকে। কিছুদিন পরে আবার আরও ২ হাজার টাকা চায়। আমি তাও দেই। ওই টাকা দেয়ার পর আমারে কিছু খাম এনে দেয়। তার পর আর কিছুই দিচ্ছেনা। এ ভাবে প্রভাব খাটিয়ে বন বিভাগের বটতলি বিটের একাধিক প্লট নেয় হায়দর আলী। তার বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডে অতিষ্ট হয়ে ওঠেছে এলাকাবাসি।

জানা যায়, গত ১৩/০২/২০ তারিখ বিকাল ২.৪৫ ঘটিকার সময় যুগান্তর সাংবাদিক নির্বাহী অফিসারের সহিত কথা বলতে ছিলেন। ওই সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার টেবিলের সামনে বিবাদী মো: হায়দর আলী বসা ছিল। এক পর্যায়ে বাদী পেশাগত দায়িত্বের কারণে তার কাছে প্রশ্ন করেন, সরকারী রাস্তায় রোপনকৃত কোন গাছ চেয়ারম্যান বিক্রয় অথবা কাটতে পারে কিনা।

উত্তরে নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, চেয়ারম্যান কোন সরকারী রাস্তার গাছ বিক্রয় বা কাটতে পারেননা।

তিনি আরও বলেন, কিছুক্ষন আগে তিনি সংবাদ পেয়েছেন ‘নিয়ামতপুর- খিলপাড়া রাস্তার গাছ । পরে সেখানে নায়েব পাঠাইয়া গ্ছকাটা বন্ধ করিয়াছেন। ওই সময় টেবিলের সামনে বসে থাকা হায়দর আলী পুর্ব শত্রুতার জের ধরে হত্যার উদ্যেশ্যে তার ওপর হামলা করে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, তিন বছর আগে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি স্বামী ইয়াদ আলীকে হারান জহুরা (৬০)। তার স্বামীর নামে দশ টাকা দরের চালের কার্ড ছিল। তিনি বলেন, ’পোলার বাপ মরার পর সুমন মেম্বর আইয়া কার্ড নিয়া যায়। হের পর যহন চাইল দেয়, তহন গিয়া বইয়া থাকি, কত কই আমারে চাইল দেইন, তারা দেয়না। চেয়ারম্যান কয় মরা মাইশের কার্ডে চাইল ওডেনা।’

অথচ সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ওই ইউনিয়নের তালিকা ধরে খোঁজ নিয়ে জানা যায় ইয়াদ আলীর নামে নিয়মিত চাল উঠছে। ইয়াদ আলীর মতো মৃতব্যাক্তিসহ অনেক লোকের নাম তালিকায় থাকলেও তারা জানেননা তাদের নামে বরাদ্দকৃত সরকারের ওই চাল কে তোলেন!

বছরের পর বছর চাল বিতরণে এমন অনিয়ম করে আসছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ২ নং ঘাটাইল ইউনিয়নের এ কাজে সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানকে তালিকা হালনাগাদ করার জন্য বিভিন্ন সময় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুইবার এবং ইউএনও তিনবার লিখিত নোটিশ প্রদান করলেও তিনি তা করছেন না।

জানা যায়, এসব ১০ টাকা কেজি দরের চাল মেম্বারের মাধ্যমে তিনি আত্মসাৎ করে থাকেন।

অভিযোগ রয়েছে হায়দার চেয়ারম্যান মৃত ব্যাক্তির নামে বয়স্ক ভাতা আত্মসাৎ করে থাকেন।

ঘাটাইলে রাস্তার সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে ঘাটাইল সদর ইউপি চেয়ারম্যান হায়দর আলীর বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, নিয়ামতপুর-খিলপাড়া সরকারী রাস্তা। এ রাস্তার দুপাশে শতাধিক ইউকেলিবটাস রোপনকৃত গাছ ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। কাঠ ব্যবসায়ি আকবর আলী জানান, আমি রাস্তার গাছগুলো ইউপি চেয়ারম্যান হায়দর আলীর কাছ থেকে কিনেছি। আমি তার কাছেই টাকা দিয়েছি। সে আমাকে কাটতে বলছে আমি কাটতাছি। সাবেক এক ইউপি মেম্বার বলেন, চেয়ারম্যান হয়ে রাস্তার গাছ কাটার কোন এখতিয়ার নেই। তারপরও কিভাবে কাটছে তা আমাদের জানা নাই।

চেয়ারম্যান হায়দর আলীর কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

হায়দর আলী চেয়ারম্যানের এসব কর্মকান্ডের জন্য সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি করছেন এলাকাবাসী।

(খান ফজলুর রহমান, ঘাটাইল ডট কম)/-