গ্রামীন বা মফঃস্বল সাংবাদিকতাকে এখন বলা হয় আঞ্চলিক সাংবাদিকতা

দেশের গ্রামীন সাংবাদিকতাকে এখন বলা হয় আঞ্চলিক সাংবাদিকতা। এক সময় বলা হতো মফস্বল সাংবাদিকতা। এখনো কোনো কোনো মিডিয়া হাউজ জেলা-উপজেলায় কর্মরত সংবাদকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ বা দেখভালে ‘মফস্বল সম্পাদক’ পোস্টিং দিয়ে থাকেন।

মূলতঃ ‘মফস্বল’ শব্দ ‘শহর’ শব্দের বিপরিত। মানে অজঁপাড়া গাঁ, পশ্চাৎপদ জনপদ, অনগ্রসর গ্রামীন বসতি ইত্যাদি মিন করে। এক সময়ে ঢাকার বাইরে কর্মরতদের নির্বিচারে মফস্বল সংবাদকর্মী বলা হতো। জেলা-উপজেলা বা বিভাগীয় শহর থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকাকে মফস্বল পত্রিকা হিসাবেই চিহ্ণিত করা হতো।

মফস্বলের ছাঁপ থাকায় এসব পত্রিকা বিজ্ঞাপনসহ প্রচলিত সরকারি-বেসরকারি সুযোগসুবিধে থেকেও বঞ্চিত হতো। মফস্বল পত্রিকা মানেই শ্রেণীচরিত্রে তৃতীয় । তেমনি জাতীয় মিডিয়া, জাতীয় বা আঞ্চলিক দৈনিকে কর্মরত গ্রামগঞ্জের সংবাদকর্মীরা হতেন বর্ণবৈষম্যের আদলে এক্কেবারে হরিজন সাংবাদিক। পূর্বাপরে এ চিত্র এখনো বিদ্যমান। হোক সে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক বা অনলাইন মিডিয়া।

সময় গড়াচ্ছে। দিন পাল্টাচ্ছে। গ্লোবালাইজেশন এবং ডিজিটাল ভার্সণে এনালগ ছিঁটকে পড়ছে। সংবাদ আদানপ্রদানে সেকেল প্রযুক্তি একবারেই অচল। এখন হাতে লিখে ডাকে সংবাদ পাঠানোর যুগ চলে গেছে । বিদায় নিয়েছে প্রেস টেলিগ্রাম ও টেলিপ্রিন্টার। ফ্যাক্স ও ফোনোগ্রাম এখন ইতিহাস। কার্ডফোন গেছে যাদুঘরে।

এখন ইমেল, টুইটার, ফেসবুক, হোয়াইটস এ্যাপসের যুগ। চোখের পলকে সংবাদ প্রেরণে ইমেল-জিমেল এখন ইলেক্ট্রিক ট্রেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গণ সাংবাদিকতার ক্ষুদ্রতর অংশ হয়ে যাওয়ায়, চোখের পলকে নানা সংবাদ চক্কর খাচ্ছে চোখে চোখে। প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সজোরে ঝাঁকি দিচ্ছে অনলাইন।

পরিবর্তিত সুক্ষ প্রযুক্তি গ্রাম ও শহরের দূরত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। ক্রমান্বয়ে নগরায়ণ স্ফীত হচ্ছে। গ্রাম শহর হচ্ছে। শহর হাঁটি হাঁটি করে গ্রামে যাচ্ছে। হচ্ছে মিশ্র নগরায়ন। বড় কথা, দেশের সামগ্রিক বাড়বাড়ন্ত যোগাযোগ ও উন্নয়নের সোঁপান বিস্তৃতিতে মফস্বল বলে কিছু থাকছেনা। কিন্তু ঢাকার মিডিয়া হাউজ এ বিবর্তণের ধারা বুঝতে অক্ষম। যদিও তাদেরই সেটি আগে বোঝার কথা। এ জন্য অধিকাংশ মিডিয়া হাউজ সঞ্চালনায় মফস্বল টার্মস হরদম ব্যবহৃত হয়।

যেহেতু মফস্বল মানেই গেঁয়ো, অঁজপাড়াগাঁ, সেজন্য এখানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা হয় হরিজন, নয়তো জাতে কায়পুত্র। যাদের গায়ে সোঁটকা গন্ধ, হিতকরী বিদ্যার বালাই নেই অথবা জাঁতপাতের সিঁড়ি অতিক্রমের অভিলাষে শহুরে কুলীণদের টেবিলে সংবাদ প্রচার বা ছাপানোর অভিপ্রায়ে অবনত শিরে দন্ডায়মান থাকেন।

এ হরিজনরা মিডিয়া হাউজে গেলে বসার চেয়ার পাননা। মফস্বল বিভাগ মাথা তুলে কথা বলতেও চায়না। তাদের মতে, মফস্বল মানেই তো রাবণের গোষ্ঠি; কতোজনকে বসতে দেয়া যায়। সংখ্যাধিক্য আর শ্রেণীকরণের বৈষম্যেই যে হরিজনের একমাত্র কাল তা কিন্তু নয়। বড় কথা, অধিকাংশ হাউজেই কম উর্বররা মফস্বল বিভাগে নিয়োজিত থাকেন। মিড়িয়া মালিকরা কম পয়সার, কম যোগ্যতার ছেচ্ছড়দের এখানে দায়িত্ব দেন।

ঢাকার সিনিয়র সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে জানা যায়, প্রায় মিডিয়ায় মালিকের বাসায় কর্মরত নফরের সমান বেতনে মফস্বল সম্পাদক পোষা হয়। এমনকি কোনো কোনো হাউজে দশবিঁশ হাজার টাকা বেতনে নিউজ এডিটর থেকে সিটি এডিটর নিয়োগ দেয়া হয়। সে বেতন ও আবার কখনো কখনো বকেয়া থাকে। রাতে অফিস থেকে ফিরে সকালে শোনেন চাকরি নেই। তবে মফস্বল টেবিলের এ নফররা দেশব্যাপি নাফরমানির অপার সুযোগ পান। জেলা-উপজেলার হরিজন সংবাদকর্মীকে তারা নায়েব-গোমস্তা বানিয়ে গ্রামগঞ্জে সওয়ালের দীক্ষা দেন।

আর হরিজনরা মফস্বল টেবিলের কসাই নফরদের নজরানার দায় মেটাতে ফেতরা বা খয়রাতি ছাড়াও ঘটিটা, লোটাটা, বাটিটা ঝুঁলিতে ভরেন। এভাবে হরিজনরা বনে যান ম্লেছ বা অচ্ছুৎ। ভদ্রলোকেরা বলে চাঁদাবাজ, ধান্ধাবাজ, সাংঘাতিক।

গ্রামীন সাংবাদিকতা আজ ইমেজ সংকটের অন্যতম কারণ, মূল ধারার মিডিয়া কর্মীদের আদর্শচ্যূতি, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও স্বার্থান্ধতা।

ছাত্রলীগ আজ যেমন ইমেজ সংকটে পড়েছে, মূল দলের অনেক নেতার আদর্শচ্যূতি ও অসৎ জীবনযাপনের কু-মডেল ফলো করতে গিয়ে; তেমনি গ্রামগঞ্জের হরিজন সংবাদকর্মীরা আজ দলে দলে ম্লেছে রুপান্তরিত হচ্ছেন মিডিয়া মালিক,অফিস স্টাফ, সাংবাদিক নেতাদের মতো হতে গিয়ে।

কারণ মিডিয়া হাউজ গ্রামগঞ্জের অচ্ছুৎ হরিজনদের খেতে দেয়না, পড়তে দেয়না। সম্মান দেয়না। কিন্তু গ্রামগঞ্জের হাজারো খবর সমুদ্র সেঁচে মুক্তোর মতো তারাই সংগ্রহ করেন। আরব্য রজনীর গল্পের সেই উসামা দর্জির গাধার মতো পিঠে বাড়তি বোঝা চাঁপিয়ে জোর কঁদমে এদের হাঁটার তাগিদ দেয়া হয়।

গল্পের রুগ্ন ভারবাহী গাধা যেমন প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে একদিন স্বভাবে উদ্বত খচ্চরে পরিণত হয়েছিল; তেমনি মফস্বলের হরিজন সংবাদ কর্মীরা দিনকে দিন হরিজন থেকে ম্লেছ হয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকের পরিবর্তে জুটছে সাংঘাতিক শব্দ।

সারাদেশে বিশেষ করে মফস্বলে দিনকেদিন এদের সংখ্যা বাড়ছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গঁজিয়ে উঠছে মিডিয়া হাউজ। তাতে পেশাদারিত্ব এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীলতার প্রতিশ্রুতি থাকছেনা। এখান থেকে অগুণতি নফর ও ম্লেচ উৎপাদণ হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারাদেশে।

(জয়নাল আবেদীন, সিনিয়র সাংবাদিক/ ঘাটাইলডটকম)/-