গোপালপুরে মুক্তিযুদ্ধের কোম্পানী কমান্ডারের কবর এখন ময়লার ভাগার!

টাঙ্গাইলের গোপালপুর স্বাধীনতা কমপ্লেক্সের আঙিনায় এই কবরটিকে কোনভাবেই অবহেলা বা অযত্ন করে রাখার মতো নয়। কেননা ছবির এ কবরটি কোন সাধারণ মানুষের কবর নয়। এ কবর মুক্তিযুদ্ধকালীন গোপালপুরের সর্বাধিনায়কের কবর। এ কবর একজন কোম্পানী কমান্ডারের কবর। এ কবর মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাকহানাদার বাহিনীর হাত থেকে হত্যা, ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতন থেকে গোপালপুরবাসীকে যিনি মুক্ত করেছিলো তাঁর কবর। এ কবর গোপালপুর থানায় যিনি প্রথম প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেন তাঁর কবর। এ কবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন ত্যাগী নেতা, অকুতভয় সৈনিক ও সৎ পুরুষের কবর। এ কবর জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধা ‘নূর হোসেন আঙ্গুর তালুকদার’ এর কবর।

কিন্তু আমরা এমন কপাল পোড়া জাতি, যাঁর জীবন বাজি রাখা অবদানে আমরা এই গোপালপুর উপজেলা উপহার পেয়েছি, আজ তাঁর কবরস্থানেই আমরা তথা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ শহরের যাবতীয় পচাঁ-দূর্গন্ধ ময়লা আবর্জনা ফেলে এবং শৌচাগার বানিয়ে তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের যে কতো দীনতা, তা আমরা প্রকাশ্যেই প্রতিদিন প্রকাশ করছি।

তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দেয়া রাষ্ট্রের তথা গোপালপুরবাসীর দায়বদ্ধতা। গোপালপুরবাসীকে যিনি মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছেন, আমরা আর তাঁর কবরকে অসম্মান করে, আবার নতুন করে লজ্জিত এবং অকৃতজ্ঞ হতে চাই না!

দ্রুততার সাথে স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রসাশন, পৌর কর্তৃপক্ষ এবং সূধিজনের মানবিক শুভদৃষ্টি চাই আমরা। আমরা অন্যান্য উন্নয়নের আগে এই বীরসেনানীর কবরের সুরক্ষাসহ পবিত্রতা রক্ষা চাই।

পাশাপাশি জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান হিসেবে তোমাকে প্রাপ্য সম্মানটুকুও দিতে পারলাম না বলে, আমরা অকৃতজ্ঞ গোপালপুরবাসী তোমার কাছে ক্ষমা চাই। প্রতিটি সত্যিকারের দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে তুমি বেঁচে থাকো আজীবন। বিনম্র শ্রদ্ধা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর হোসেন আঙ্গুর তালুকদার:

মহান মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার নূর হোসেন আঙ্গুর তালুকদার ১৯৪৫ সালের ১ আগস্ট গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের নলিন গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করেন।

তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে উন্নত প্রশিক্ষনের জন্য মাইনকার চর হয়ে ঢালু ক্যাম্প ও তুরা পাহারে ট্রেনিং প্রাপ্ত হন। ট্রেনিং শেষে ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর নিকরাইল রানী দিনমনি হাইস্কুলে সত্তুর জন কমান্ডারের মিটিংয়ে, কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী গোপালপুর থানা আক্রমণ করার জন্য কয়েকজন কোম্পানী কমান্ডারকে নির্দেশ দিলে, আঙ্গুর তালুকদার কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ভোলারপাড়া, হেমনগর, সূতী, জগন্নাথ, পিংনা ও ফুলদারপাড়া যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন।

নূর হোসেন আঙ্গুর তালুকদার ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর শনিবার গোপালপুর থানা পাক হানাদার মুক্ত হলে, শত্রু সেনাদের কাছ থেকে পাওয়া সকল অস্ত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র গ্রহন করেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম গোপালপুর থানায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু হয়। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন ত্যাগী নেতা ও সৎ, নির্ভিক ও ত্যাগী পুরুষ।

আঙ্গুর তালুকদার ২০১১ সালে অবিবাহিত অবস্থায় গোপালপুর সদরে নিজ বাসায় ইন্তেকাল করেন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাযা শেষে গোপালপুর স্বাধীনতা কমপ্লেক্সের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

(কে এম মিঠু, ঘাটাইল ডট কম)/-