গোপালপুরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির নগেন বাগদীর ছয় দশকের রানার জীবন

কবি সুকান্ত রচিত‘ রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে, রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে’ কবিতায় ভেসে উঠে রানার বা ডাকহরকরার জীবন্ত ছবি। কাঁধে মোটা ব্যাগ। হাতে গুঙুর বাঁধা বল্লম। খাকি পোষাকে অবিরাম ছুঁটে চলে রানার। নগেন বাগদী ডাক বিভাগের এমনই একজন রানার। কাজ করেন টানা ছয় দশক। সবাই চেনে মরুয়া নামে। প্রায় ছয়ফিট দীর্ঘ কৃষ্ণকায়, ছিপছিপে চেহারার নগেন বাগদীর ঠিকানা গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল বাগদী পল্লী। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি বাগদী সম্প্রদায়ের একমাত্র চাকরিজীবি তিনি।

নগেন বাগদীর জন্ম ১৯৩৮ সালে। বাবা তুফান বাগদী ছিলেন ঝাওয়াইল রাজ কাঁচারির পালকি বাহক। সাতচল্লিশে দেশ ভাগের সময় বাবামার সাথে পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমানে পাড়ি জমান। সেখানেই পাহেলী বাগদীর সাথে জুটি বাঁধেন। বছর পাঁচেক পর দেশের টানে ফেরা। জমিদারের খাস জমিতে নতুন করে ঢেরা বাঁধেন। জীবিকার তাগিদে ১৯৫৪ সালে ডাক বিভাগের রানার হিসাবে যোগ দেন। টানা ছয় দশক বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করছেন।

মাসে তিন টাকা মাহিনায় শুরু। ষাট বছরে দাড়িয়েছে এগারো শত আশি টাকায়। চাকরির শুরুতে বিনামূল্যে জুতা, খাকি পোষাক, ছাতা, ভাড়াটে নৌকা, হ্যারিকেন বা টচ জুটতো। ডাল, চাল, গম, তেল, সাবান রেশনে মিলতো। দিনে দিনে ডাক বিভাগের স্টাফদের সুযোগ বেড়েছে। শুধু কমেছে রানার বা ডাকহরকরাদের। রেশনসহ ছাতা, জুতা, পোষাক সবই বন্ধ হয়ে গেছে। আগে পদবী ছিল রানার। পরবর্তীতে পোস্টম্যান। এখন ‘এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল মেইল কেরিয়ার’ সংক্ষেপে ইউডিএমসি। আগে টাকা পেতো বেতন খাতে। এখন ভাতায়।

সতেরো বছরের টগবগে যুবক নগেন ডাকবিভাগে চাকরি নিয়ে অনেক স্বপ্ন আঁকেন। একদিন চাকরি স্থায়ী হবে। সরকারি কর্মচারির মর্যাদা পাবেন। অবসরে পেনশন জুটবে। শেষকাল নিশ্চিন্তে কাটবে। কিন্তু ষাট বছরেও সে স্বপ্ন ধরা দেয়নি। বির্বণ হয়ে গেছে। শীত-গ্রীস্ম-বর্ষার মতো নিয়মিত বাগুয়া ও চাতুটিয়া শাখা ডাকঘর থেকে ঝাওয়াইল সাবপোস্ট অফিসে ডাক আনানেয়া করেন।

স্মৃতিচারণে তিনি ঘাটাইলডটকমকে জানান, ‘নিত্যদিনের যাতায়াতের কাঁচা সড়ক পাঁকা হয়েছে। টিনের ভাঙ্গা চৌচালার সাবপোস্ট অফিস পাঁকা ভবনে রুপ নিয়েছে। মোর্স পদ্ধতির টেলিগ্রাম বন্ধ হয়ে ইন্টারনেট চালু হয়েছে। মানি অর্ডার প্রথার বদলে মোবাইলে মানি চেঞ্জার চালু হয়েছে। ডাক কর্মকর্তাদের বেতনভাতা সন্তোষজনক হারে বেড়েছে। ডাকঘর সঞ্চয়বীমার মাধ্যমে স্বল্পআয়ী মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। শুধু তার মতো ছাপোষা ডাক কর্মচারিদের জীবনে কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি।’

তিনি বলেন, আধা পেট ভরে প্রত্যুষে ডাকের ব্যাগ কাধে ব্রাঞ্চে ছুটে চলা। আবার সময়মতো সাবঅফিসে ফেরার কাজটি কলুর বলদের মতো চক্রাকারে সারছেন দিনমান। সে কাজে কোনো স্বীকৃতি নেই। বিশ্বস্ততার পুরস্কার নেই। নেই কোনো ভবিষ্যৎ। তবুও যুগের পর যুগ ব্যাগ কাঁধে অবিরাম ছুটে চলেন ত্রিকালদর্শী রানার নগেন বাগদী।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে দ্বিতীয়বার ক্ষতিগ্রস্ত হন নগেন বাগদী। নয় মাস ভারতে শরনার্থী জীবন কাটিয়ে স্বাধীনতার পর মাতৃভূমিতে ফেরেন। নীড়হারা পাখির মতো আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। ঘাটাইলডটকমের নিকট তিনি অভিযোগ করেন, ‘এদেশ দুবার স্বাধীন হয়েছে। দুবারই তার মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মানুষরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শতাব্দী বছর বাস করেও খাস জমির বাড়িভিটের পত্তনি পাননি।’

দীর্ঘ জীবনে দারিদ্রতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অভ্যস্ত নগেন ঘাটাইলডটকমকে জানান, ‘পাঁচ মেয়ের সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে না থাকায় বড় জামাইকে ঘরজামাই এনেছেন। জামাই রিকসাভ্যান চালায়। স্ত্রী গৌরি ও মেয়ে কৌড়ি ছাড়াও রয়েছে এক দঙ্গল নাতিপুতি। স্বল্প বেতনে রাবনের গোষ্ঠির খরচ চলেনা। তাই ৭৮ বছর বয়সে লাকড়ি চিরানোর কাজ করেন।’ শুক্র ও শনি বন্ধের দিন কুড়াল হাতে আশপাশের গ্রাম চষে বেড়ান। গৃহস্তের বাড়ি গিয়ে হাঁক ছাড়েন ‘লাকরি ফাটাইবেন নি লাকরি। ফাটাই আম, জাম, কাঁঠাল,করই গাছের লাকরি।’ আমন ও বোরো মৌসুমে গৃহিণিরা ধান সিদ্ধে ব্যস্ত হন। তখন লাগে বাড়তি লাকড়ি। আর ডাক পড়ে নগেন বাগদীর। বিনিময়ে দুই থেকে চারশ টাকা মজুরি জোটে।

নগেনের স্ত্রী গৌরি ঘাটাইলডটকমকে  জানান, ‘মিনসের বয়স অইছে। বেশিখন লাকরি কুপাইলি হাঁপিয়ে যায়গে। একদিন খাটলি আরিকদিন আরাম নিতি অয়। হেরপরিও নাতিপুতির দিকে চায়ি দিনভরি খাটা খাইটছে। অফিস থাইকা বলইছে, ‘কোনো পেনছন বা বারতি টাকা পাবিনাকো। পুস্ট মাস্টার সাহিব সাফ বলি দিছে‘ মরুয়া তোমার অবছরের কোনো বয়স নাইকা। শরীর যত্ত দিন কুলায় তত্তদিন কাম করি যাইবা। কিন্তু অহন একটা করি বছর যাছে আর মিনসে কাবু হছে।’

নগেন জানায়, সারা জীবন ৮ কিলো হেটে ডাক আনানেয়া করতাম। এখন সাইকেলে চলি। মানি অর্ডারের প্রচলন উঠে গেছে। জরুরী টেলিগ্রামও নেই। ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের সংখ্যা হাতে গোনা। তবে অফিসিয়াল চিঠি আসে প্রচুর।

স্মৃতিচারণ করে নগেন বলেন, ‘সত্তরের দশকেও জরুরী প্রয়োজনে মানি অর্ডারের হাজারো টাকা মেইল ব্যাগে ভরে রাতের বেলায় শাখা অফিসে পৌঁছাতে হতো। হাতে ধারালো ফলা নিয়ে চিৎকার করে টর্চের আলোয় পথ চলতাম। চোরডাকাতরা উদ্ধত ফলার সামনে দাড়ানোর সাহস পেতোনা।’

তিনি দুঃখ করে জানান, ‘ষাট বছরের চাকরিতে অনেক বড় বাবুর খেশপানা করেছি। বহুবার আশ্বাস দিয়েছেন চাকরি স্থায়ী হবে। কিন্তু হয়নি। এখন বয়স হয়েছে। মাঝে মধ্যে মন খারাপ হয়। সততার সাথে চাকরি করে কি পেলাম।’

ঝাওয়াইল সাব অফিসের পোস্টমাস্টার জানান, নগেন খুবই গরীব। তবে কাজকর্মে মনোযোগি। বিশ্বস্ত। সুর্দীঘ কর্মজীবনে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।

ডাক বিভাগের টাঙ্গাইল উত্তর অঞ্চলের পরিদর্শক গোলাম মাওলা জানান, ‘সারা দেশে ডাক বিভাগের প্রায় চব্বিশ হাজার ভাতাপ্রাপ্ত কর্মচারি, রানার বা ডাকহরকরা রয়েছে। এরা কোনো বেতন নয়- সামান্য ভাতা পায়। কোনো অবসর বা পেনশন ভাতা নেই। নগেন বাগদী এদেরই একজন। ওর মতো প্রবীন রানার দেশে আরো আছে বলে মনে হয়না। ওরা সারা জীবন শুধু সেবাই দিয়ে গেল। বিনিময়ে পেলো সামান্যই। এটি খুবই অমানবিক।’

ঢাকাস্থ জিপিও এর সহকারি পরিচালক আজিজুর রহমান জানান, ডাক বিভাগের উন্নয়নে ই-ক্যাশ ও ডিজিটালাইজেশনসহ ১৭টি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর কোনটিতেই রানার বা পোস্টম্যানের চাকরি স্থায়ীকরণ বা উন্নয়নের কোনো কথা নেই। দীর্ঘ দিন আন্দোলন করেও ওরা সুফল পায়নি। তাই নগেনের মত নামে মাত্র ভাতা পাওয়া কর্মচারিরা সারা জীবন তিমিরেই ছিল, তিমিরেই থেকে গেলো।’

নগেনের মতো সুবিধা বঞ্চিত ডাককর্মচারিদের নিয়ে সুকান্ত অনেক আগেই লিখেছিলেন, ‘রানার ! রানার! ভোরতো হয়েছে- আকাশ হয়েছে লাল/ আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল।’ নগেন বাগদীরা সেই দুঃখের কাল পাড়ি দিয়ে আলোর স্পর্শ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

(জয়নাল আবেদীন/ দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদদাতা, গোপালপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি/ ঘাটাইলডটকম)/-