গেরিলা থেকে সুরেলা আজম খান

একজন পপ গুরু, মুক্তিযোদ্ধা, ব্যান্ডসম্রাট, ক্রিকেটার, সংগঠক, গায়ক, অভিনেতা, মডেল আজম খান। তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সাথে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন রোববার সকাল ১০টা ২০মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার জন্য প্রয়াণ দিবসের বিনম্র ভালবাসা, শ্রদ্ধাযুক্ত স্মরণ।

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান, মা জোবেদা খাতুন।

১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসঙ্গীত প্রচার করেন।

১৯৭১ সালে আজম খানের বাবা আফতাব উদ্দিন সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থাকায় বাবার অনুপ্রেরণায় যুদ্ধে যাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হলে, তিনি তার দুই বন্ধু সহ পায়ে হেঁটে আগরতলা চলে যান। এসময় তার লক্ষ্য ছিল সেক্টর ২’এ খালেদ মোশাররফের অধীনে যুদ্ধে যোগদান করা।

আজম খান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ২১ বছর বয়সে। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরনা যোগাতো। তিনি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ভারতের মেলাঘরের শিবিরে। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সন্মুখ সমরে অংশ নেয়া শুরু করেন। কুমিল্লার সারদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধ করেন, এরপর ফিরে যান আগরতলায়। তারপর তাকে পাঠানো হয় ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতে।

আজম খান ছিলেন দুইনম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্ণেল খালেদ মোশাররফ। ঢাকায় তিনি সেকশন কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন। মূলত তিনি যাত্রাবাড়ি- গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত ‘অপারেশান তিতাস’।

তাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপ লাইন ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশেষ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হোটেল পূর্বাণী ইত্যাদির গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। তাদের লক্ষ্য ছিল, হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে, দেশে যুদ্ধ চলছে।

এই অপারেশনে তিনি বাম কানে আঘাত পান, পরবর্তীতে এই আঘাত আজম খানের শ্রবণ ক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়। যুদ্ধে বাঁ কানে আঘাত পান, তারপর থেকে আজীবন ভালো শুনতে পেতেন না। তবু গান থামেনি।

“প্রশিক্ষণ শেষে সন্ধা ৬টার পর সদলবলে সবাই ক্যাম্পে আত্মশক্তি জাগানোর জন্য বাটি, চামচ, ক্যান, কৌটা, ডিব্বা পিটিয়ে বাজিয়ে সবাই মিলে গাইতেন গণসংগীত।”, বাবাকে নিয়ে আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন ইমা খান।

স্বাধীনতা যুদ্ধ জয়লাভ করে আজম খান তার সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। এর আগে তারা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংগঠিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন।

আজম খানের কর্মজীবনের শুরু হয় ষাটের দশকের শুরুতে। ১৯৭১ সালের পর তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) ভাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সঙ্গীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে তরুণ প্রজন্ম যখন খুব দ্রুতই হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেলো, তখন আজম খানের মনে হলো এই তারুণ্যকে কোনো একটা আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা না গেলে এরা দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসবে।

বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকাল করে করলেন অনুষ্ঠান। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ এবং ‘চার কালেমা সাক্ষীদেবে’ গান দু’টি প্রচার হলে তুমুল প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা পান আজম খান, দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়ে যায় তাদের দল।

১৯৭৪’৭৫ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলাদেশ (রেললাইনের ঐ বস্তিতে) শিরোনামের গান গেয়ে হৈ-চৈ ফেলে দেন।

আজম খানের পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তী কালে তার মাধ্যমে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে। একসাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গান করেন তারা।

এরই মধ্যে আরেক বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসিডরক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে!’। আজম খানের দাবী, এটি বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক।

মুক্তিযুদ্ধকালে যেভাবে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছেন, যুদ্ধের পরও আবার কণ্ঠে তুলে নিলেন গান। নতুন ধরনের গান। গেয়ে ওঠেন সালেকা মালেকা আর আলাল দুলালদের গান, রেল লাইনের বস্তিতে সন্তানহারা মায়ের কান্না তুলে আনেন গিটারের ছয়তারে, হারিয়ে যাওয়া অভিমানীকে খুঁজে ফেরেন গানে গানে আর পেয়েও হারিয়ে ফেলার আর্তনাদে ভরে তোলেন বাংলা গানের আকাশ…

১৯৮৬ সালে ‘কালাবাউল’ শিরোনামের একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে এবং ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।

২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম বিজ্ঞাপন চিত্রের মডেল হন। এরপর ২০০৫’০৮সালে বাংলালিংক এবং ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মডেল হন।

খেলাধুলায়ও ব্যাপক আগ্রহ ছিলো আজম খানের। ক্রিকেটার হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন এ পপতারকা। গোপীবাগ ফ্রেন্ডসক্লাবের হয়ে ১৯৯১’২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন। ৯ বছরে অনেকগুলো ক্রিকেট ম্যাচে নিজের খেলোয়ার প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন আজম খান। দেশে-বিদেশে অনেক চিকিৎসাও তাকে ফেরাতে ব্যর্থ হয়। অসাধারণ প্রতিভা ও দৃপ্ত কণ্ঠের একসংগীত জাদুকরের জীবন থেমে যায় ৬১ বছর বয়সে।

দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সাথে লড়াই করে ৫জুন ২০১১ রোববার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আজম খান।

আজকের এই দিনে পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে আজম খান রেখে গেছেন তার নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সুরেলা সংগ্রাম এবং বাংলা ব্যান্ড নিয়ে আজীবন মগ্ন থাকার উপাখ্যান।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-