গাবের পুষ্টিগুণ, উপকারীতা

গাব আমাদের অনেকের পরিচিত দেশীয় একটি ফল। এটি একটি সুস্বাদু, মিষ্টি এবং কোষযুক্ত। আমাদের দেশে প্রচুর গাব গাছ দেখতে পাওয়া যায়। কার্বহাইড্রেট ও মিনারেল সমৃদ্ধ গাব ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পেঁকে হলুদ হয়ে যায়। এর আকৃতি সাধারণত আকৃতি গোলাকার, লম্বাটে বা ওভাল হয়ে থাকে। এর বীজ এবং খোসা বাদে এর ভেতরের অংশ মাখনের মত নরম এবং হালকা মিষ্টি স্বাদের।

দেশি গাব এক প্রকার সপুষ্পক উদ্ভিদের ফল। দেশি গাব গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ডায়োস্পিরিস মালবারিক, যা ইবেনেসিই পরিবারভুক্ত। একে ইংরেজিতে Gaub, Indian persimmon, Malabar ebony, Black-and-white Ebony বা Pale Moon Ebony নামে ডাকা হয়। সংস্কৃত ভাষায় এর নাম ‘তিন্দুকা’, হিন্দি ভাষায় ‘গাব’ এবং তামিল ভাষায় ‘তুম্বিকা’। দেশি গাবের আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।

পাকা গাব ফলের ভেতরটা আঠালো ও চটচটে হয়ে থাকে। দেখতে অনেক সাধারণ হলেও এই ফলটি খেতে অনেক সুস্বাদু এবং এর অনেক উপকারীতা রয়েছে। আসুন আজ জেনে নিই গাব ফলের পুষ্টিগুণ, উপকারীতা এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে।

পুষ্টিগুণ

দেখতে খুব সাধারণ হলেও পুষ্টগুণে গাব কিন্তু মোটেও সাধারণ নয়। বরং অন্যান্য দামী ফলের চেয়ে এতে পুষ্টিগুণ অনেক বেশি।

দেখা গেছে যে, প্রতি ১০০ গ্রাম গাব ফলে পানি ৮৪.৩ গ্রাম, এনার্জি ৫০৪ কিলোক্যালরি, আমিষ ২.৮ গ্রাম, চর্বি ০.২ গ্রাম, শর্করা ১১.৮ গ্রাম, ফাইবার বা আঁশ ১.৮ গ্রাম, চিনি ১১.৪৭ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ১১.৪৭ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ৩৫ আইইউ, ফসফরাস ১৮ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.৬ মিলিগ্রাম, থায়ামিন ০.০২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ১৮ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ১১০ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩০৩ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৮ মিলিগ্রাম।

এছাড়াও এতে আছে আয়রন, সালফার, সেলেনিয়া, ম্যাঙ্গানিজ, কপার এবং ম্যাগনেসিয়ামের মত বেশ কিছু উপকারী উপাদান। গাবের এসব পুষ্টিগুণ আমাদের শরীরকে রক্ষা করে নানা রোগ থেকে।

উপকারিতা

১। শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে গাব ফল ভীষণ উপকারী। এই ফলে আছে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য শক্তি বা এনার্জি ও আমিষ। অল্প পরিমাণে গাব খেলেই আমাদের শারীরিক দুর্বলতা কেটে যায়। এছাড়াও এতে থাকা পটাসিয়াম আমাদের নিন্ম রক্ত চাপ কমাতে অনেক সাহায্য করে থাকে। তাই যারা নিন্ম রক্তচাপ জনিত্ত সমস্যায় চুগে থাকেন তারা এই ফলটি খেতে পারেন।

২। গাবে থাকা প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আমাদের হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে। আর এতে আমাদের হৃদযন্ত্রের কার্যকারীতা অনেক বেড়ে যায় এবং হার্ট ডিজেসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।এছাড়াও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আমাদের শরীরের বেড়ে ক্যান্সার কোষ বেড়ে উঠতে দেয় না। আর এর ফলে ক্যান্সারের মত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমায়।

৩। গাবে আছে পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, আয়রন, সালফার,সেলেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার এবং ম্যাগনেসিয়ামের মত বেশ কিছু উপকারী উপাদান। যা আমাদের চোখের জন্য অত্যান্ত উপকারী। তাই প্রতিদিন অল্প করে এ ফল খেলে আমাদের দৃষ্টিশক্তির অনেক উন্নতি হয় এবং একই সাথে রাতকানা রোগ থেকে চিরতরে রেহাই পাওয়া যায়। এছাড়াও চোখের এলার্জি সহ অন্যান্য চোখের রোগের প্রকোপ কমাতে এটি অনেক কার্যকরী।

৪। সবাই এখন অতিরিক্ত ওজন কমাতে ব্যস্ত । আর এই সমস্যা সমাধানে গাব ফল বেশ কার্যকরী।গাব অতিরিক্ত ওজন কমাতে খুব ভাল কাজ করে। এছাড়াও গাবে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ থাকায় এটি আমাদের পরিপাকতন্ত্রের কার্যকারীতা বৃদ্ধি করে হজম শক্তি বাড়ায়। ফলে গ্যাস বা পেটের সমস্যা কমে যায়।

৫। গাবে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় এটি খেলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আর এর ফলে আমরা বিভিন্ন রকম সিজিনাল অসুখ থেকে মুক্তি পাই। এছাড়াও গাব খেলে পুরাতন আমাশয়, একজিমা কিংবা বিভিন্ন চর্মরোগ থেকে মুক্তি মেলে।

ব্যবহার

গাব সাধারণত খাওয়া হয়না, ভেষজ চিকিৎসায় এর ছাল ও কাঁচা ফলের কিছু ব্যবহার আছে। এই গাব হতে ট্যানিন জাতীয় আঠা প্রস্তুত করা হয় যা জালে, পশুর চামড়ায় এবং নৌকায় মাখানো হয়। ফলে সেগুলো টেকসই হয়, পানিতে সহজে নষ্ট হয়না। দেশি গাবের প্রধান ব্যবহার এটাই। এছাড়া কাপড়ে কালো রঙ করতেও এটি ব্যবহৃত হয়।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ি অঞ্চলের গাবের চাষ হয়ে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন বাড়িতেও গাব গাছ দেখা যায়। বাণিজ্যিকভাবে গাব চাষ খুব একটা দেখা যায় না। কাচা গাব কিনে শুকনা খড়ের মধ্যে গাদ দিয়ে পাকানো হয়। গাব চাষে তেমন কোন খরচ হয় না। শুধুমাত্র গাছে ফল এলে পোকা মাকড়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য জাল দিতে হয়। গাব গাছ একবার লাগালে অনেক বছর পর্যন্ত ফল দেয়। গাছ থেকে পেড়ে গাবগুলো খড় দিয়ে জমিয়ে পাকানো হয়। তবে ক্ষতিকর কোন ওষুধ ব্যবহার করা হয় না।

প্রতিটি গাব খুচরা ৮ থেকে ১০ টাকা বিক্রি হয়। এছাড়া প্রতি কেজি গাব বিক্রি হয় ১শ২০ থেকে ১শ৫০ টাকায়।

(খন্দকার লতিফ, ঘাটাইল ডট কম)/-