‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে’

আমরা অনেকেই ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে’ এই ছড়া বা লোকগানটা ছেলেবেলায় শুনেছি। মা-দাদীরা অবুঝ শিশুদের ঘুম পারাতে ছড়াটি হরহামেশাই ব্যবহার করতেন। এখনকার মানুষদের মুখে হয়তোবা এটি আর তেমনটা শোনা যায় না। কিন্তু বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাংলা বা বঙ্গ ভূখণ্ডর শত শত বছরের ইতিহাসে ওই ছড়াটির একটা ফলপ্রসূ তাৎপর্যপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। এই ছড়াটি কে বা কারা লিখেছেন সে সম্পর্কে কোন তথ্য না পাওয়া গেলেও টাইমমেশিনে চড়ে ইতিহাসের আড়াই শ বছর আগে অর্থাৎ ১৭৪০ সালের বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ এর আমলে গেলে ‘বর্গী’ সম্পর্কে একটা ধারনা পাওয়া যায়।

তখন বাংলায় চলছে আলিবর্দি খাঁর যুগ। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার নানা হলেন এই আলিবর্দি খাঁ। খাঁ সাহেবের রাজত্বে বাংলার মানুষের অভাব হয়তো ছিল, কিন্তু অশান্তি ছিল না তেমন। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই বাংলার আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা! কথা নেই, বার্তা নেই, একদল লুটেরার উৎপাত শুরু হয়ে গেল মুর্শিদাবাদের গ্রামগুলোতে। রাতের আঁধারে একদল লোক ঘোড়া টগবগিয়ে হানা দিতে থাকল। তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে থাকল, লোকজনকে মেরে-ধরে সবকিছু কেড়ে নিতে থাকল। দোকানপাট সব তাদের অত্যাচারে বন্ধ হয়ে গেল, মানুষজন ভয়ে ঘর থেকে বেরুনো বন্ধ করে দিল। শান্ত বাংলা যেন হঠাৎ করেই আতঙ্কের বাংলা হয়ে উঠল।

এই দুবৃ‌র্ত্তরাই ছড়াগানের সেই বর্গি। এই বর্গি শব্দটা এসেছে ফারসি ‘বারগিস’ থেকে, যেটার অর্থ ‘প্রাচীন মারাঠা যোদ্ধা’। জাতে তারা মারাঠি। হাতে তাদের থাকত তীক্ষ্ণফলা বর্শা।

মারাঠাদের আসল নিবাস ভারতের মহারাষ্ট্র শহরে হলেও দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতজুড়েই তারা ছড়িয়ে।

আলিবর্দি খাঁ যখন বাংলার সিংহাসনে, সে সময় দিল্লির তখতে ছিল মোগলরা। সে সময় এই মারাঠাদের যোদ্ধা হিসেবে নামডাক ছিল। পানি পথের তৃতীয় যুদ্ধে মোগলদের সঙ্গে মারাঠাদের ভয়ংকর যুদ্ধ হয়েছিল। এই মারাঠাদের কিছু পথচ্যুত সেনাই একসময় পরিচিত হয়ে যায় বর্গি নামে। ভারতজুড়েই তারা শুরু করে তাণ্ডব।

সেই তাণ্ডবের ঢেউ বাংলায় এল কীভাবে? এখানেও একটু ইতিহাস রয়েছে।

আলিবর্দি খাঁ বাংলার নবাব ছিলেন। তার শ্যালক রুস্তম জং ছিলেন উড়িষ্যার উপশাসক (নায়েবে আজম)। কী এক কারণে রুস্তম জং বলে বসেন, ‘না, আমি খাঁ সাহেবের কতৃ‌র্ত্ব মানি না।’ তখনকার দিনে যেটা হতো, এ রকম বিদ্রোহ করলে যুদ্ধ ছিল একেবারে অনিবার্য। তো যুদ্ধ হলো, সেই যুদ্ধে রুস্তম ভগ্নিপতির কাছে হারও মানলেন। আলিবর্দি খাঁ তাঁকে উপশাসকের পদ থেকে সরিয়ে দিলেন। রুস্তম তখনকার মতো রণেভঙ্গ দিলেন, কিন্তু তক্কে তক্কে ছিলেন কী করা যায়।

খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে।
ধান ফুরল, পান ফুরল, খাজনার উপায় কি?
আর ক’টা দিন সবুর কর, রসুন বুনেছি।।

 

ধনিয়া পিয়াজ গেছে পচে, সর্ষে ক্ষেতে জল
খরা-বন্যায় শেষ করিল, বর্ষ এর ফসল।
ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি, সব শুধু খালি
ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে, শত শত তালি।।

 

ধানের গাছ, বিলের মাছ, যাই কিছু ছিল
নদীর টানে বাঁধটি ভেঙ্গে, সবই ভেসে গেল।
এ বারেতে পাঁচ গাঁয়েতে দিয়েছি আলুর সার
আর কটা দিন সবুর করো, মশাই জমিদার।।

সেই সময় নাগপুরের রাজা ছিলেন রঘুজিৎ ভোঁসলে। রুস্তম ভোঁসলেকে গিয়ে ধরলেন, উড়িষ্যা তার ফেরত চাই-ই চাই। ভোঁসলের সাহায্যে রুস্তম আবার উড়িষ্যা দখল করলেন। কিন্তু রুস্তমের কপালে বেশিদিন সুখ সইল না। আলিবর্দি খাঁ আবারও রুস্তমকে হারিয়ে উড়িষ্যা নিজের কব্জায় নিয়ে নেন।

এদিকে সর্বনাশ যা হওয়ার তা কিন্তু হয়ে গেছে। কিছু বিপথগামী মারাঠা সৈন্য এসে পড়েছে বাংলায়। সালটা ছিল ১৭৪২।

তারা এসেই শুরু করে দারুণ অত্যাচার। নিরীহ মানুষজনকে ধরে ধরে মেরে ফেলতে থাকে। এই বর্গিদের সর্দার ছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত।

আলিবর্দি খাঁ খবর পেলেন, মুর্শিদাবাদে এ রকম বর্গিরা আক্রমণ করেছে। বর্গিদের ঠেকাতে সৈন্যসামন্ত নিয়ে চলে এলেন নবাব।

কিন্তু বর্গিরা ছিল ভীষণ দুর্ধর্ষ। নবাবের বাহিনীকে ঘিরে রেখে তারা সব রসদের পথ বন্ধ করে দেয়। সেবার অনেক কষ্টে বর্গিদের হাত থেকে নিস্তার পান নবাব। কিন্তু আক্রমণ তো আর কমে না। তারা লুটতরাজ চালিয়ে যেতে থাকে গ্রামে গ্রামে।

আলিবর্দি খাঁ এবার সৈন্যসামন্ত বাড়িয়ে তাদের দেশছাড়া করতে আসেন। কিন্তু বর্গিরা কি এত সহজে পিছু হটার পাত্র? মুর্শিদাবাদ থেকে তারা পালিয়ে যায় দক্ষিণে হুগলিতে। সেখানে গিয়ে তারা নতুন করে আস্তানা গাড়ে। গ্রামবাসীর কাছ থেকে জোর করে খাজনা বা কর আদায় করতে থাকে।

এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য তখন লাটে ওঠার জোগাড়, মানুষ না খেতে পেয়ে মরার পথে। আলিবর্দি খাঁ কম চেষ্টা করেননি তাদের পরাস্ত করতে। একবার তো কূটকৌশলের আশ্রয় পর্যন্ত নিয়েছিলেন। আলোচনা করার জন্য ২১ জন বর্গিসহ ভাস্কর পণ্ডিতকে আমন্ত্রণ জানান নিজের তাঁবুতে। আমন্ত্রণ রক্ষা করতে এলে তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় নবাবের লোকেরা। ভাস্কর পণ্ডিত মারাও যান, কিন্তু লাভের লাভ কিছু হলো না।  কিন্তু এত কিছু করেও বর্গিদের টলানো যায়নি। পরে রঘুজি ভোঁসলে নিজেই বাংলা আক্রমণ করেছিলেন। দুর্ধর্ষ বর্গিরা কিছু সময়ের জন্য পিছু হটলেও বাংলা ছাড়ল না, ঘুরে ঘুরে চালাতে লাগল তাদের দস্যুবৃত্তি।

বাংলার ইতিহাসে মীর জাফরের আগেও মীর হাবিব নামে বাংলায় আরও একজন বিশ্বাসঘাতক ছিল! পারস্য সেই অভিজাতটি এক সময় নওয়াব আলীবর্দী খানের ঘনিষ্ট ছিল; অথচ, এই লোকটিই লোকাল এজেন্ট হিসেবে বর্গীদের সাহায্য করত! আসলে মীর হাবিব ছিল রাজাকার; তার বাংলা সম্বন্ধে খুঁটিনাটি জ্ঞান ছিল। বর্গীরা সে জ্ঞান প্রয়োগ করে সহজেই বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত!

এভাবে ১৭৪২ থেকে শুরু করে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বর্গিদের উৎপাতে মানুষ তটস্থ ছিল।

কিন্তু তারা বিদায় নিল কীভাবে? একরকম ‘ত্যাগ’ স্বীকার করেই কিন্তু ওদের দূর করতে হয়েছে। ১৭৫১ সালে এক চুক্তির অংশ হিসেবে আলিবর্দি খাঁ বর্গিদের হাতে উড়িষ্যা ছেড়ে দেন। বাংলা থেকে দূর হয় একটা অভিশাপের। কিন্তু এই নয় বছরে যে ত্রাস তারা চালিয়েছিল, সে জন্য তাদের নামে লেখা লোকগানটা পাকাপাকিভাবে ঠাঁই পেয়ে যায় এ অঞ্চলের ইতিহাসেই।

(অলংকরণ, ঘাটাইলডটকম ডেস্ক)/-