খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত শেখ হাসিনার

জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপির প্রতি, বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত শেখ হাসিনার। কৃতজ্ঞ থাকা উচিত তার সরকারের, তার দলের, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের। কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এদেশের কূটনৈতিক দঙ্গল-প্রশাসন-আমলাতন্ত্রের এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণের।

কৃতজ্ঞ থাকা উচিত অনেক কারণেই। তবে এখন আমি কেবল একটি কারণের কথা বলবো। বিএনপির অনেক সমস্যা। তবে অনেক দিন ধরেই এ দলের নিজস্ব একটা বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো এ-দলে হোমওয়ার্ক ও রিসার্চ কমে গিয়েছে। সব সময় তারা রক্ষণশীল, আত্মরক্ষামূলক, ডিফেন্সিভ অবস্থানে থাকে। নিজেদের সাফল্য ও কৃতিত্বের কথাটাও ভালো করে বলতে পারেনা।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারেনা, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে পারেনা, জাতীয় অঙ্গনেও পারছে না। কাজেই সে প্রতিপক্ষের একতরফা আক্রমণাত্মক ক্যাম্পেইনে ধরাশায়ী হচ্ছে।

বশংবদ এবং গণভিত্তিহীন দুর্বল সরকার হলে যা হয়। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে ওরা কিছুটা বার্গেইনিং ক্ষমতা অর্জন করলেও এজন্য কখনো কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, সামান্য সৌজন্য প্রদর্শনও করেনি।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমঝোতা থাকলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমন্ডলে সরকারের বার্গেইনিং ক্ষমতা বাড়ে। ওরা সেটা বিসর্জন দিয়ে নিজেদেরকেই দুর্বল করেছে। এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের আরো কিছু সুবিধা পাবার অন্যান্য শর্তগুলো তারা ছেড়ে দিয়েছে। এই চুক্তির পাশাপাশি আমাদের ফেনী নদীর পানি নেয়ার জন্য ইন্ডিয়াকে একতরফা সুবিধা দিয়েও তিস্তার পানি বন্টনের কোনো সুরাহা তারা করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার, মাল পরিবহন ও নিরাপত্তা ছত্রছায়া দেয়ার ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও সার্ভিস চার্জের হার তারা একেবারেই কমিয়ে রেখেছে।

ইন্ডিয়ার পণ্যকে সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার শর্ত তারা চুক্তিতে জুড়ে দিয়েছে। সর্বোপরি ইন্ডিয়াকে এই সার্ভিস দিতে গিয়ে আমাদের বন্দর ও সড়ক সহ বিভিন্ন কাঠামো ও স্থাপনার যে ক্ষতি হবে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোনো রকম করারোপের ব্যবস্থা এই চুক্তিতে নেই।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ইন্ডিয়াকে কৃতজ্ঞ রাখাই যাদের উদ্দেশ্য তাদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো আর কী-ই বা আশা করা যায়?

আরেকটা সচতুর ধাপ্পাবাজ গোষ্ঠী আছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় এরা খুব সক্রিয়। এদের প্রচারণা হচ্ছে :

“ভাইরে বিএনপির কথা ছাড়ান দাও। আওয়ামী লীগ আর এ-দলে কোনো ফারাক নাই। এক গাছেরই দুই ডাল। এরা শুধু পাওয়ার চায় যে কোনো মূল্যে। ক্ষমতায় গিয়ে পাব্লিকের জন্য ভালো কিছু করেনা, দেশের বা জাতীয় স্বার্থও রক্ষা করেনা, শুধু চুরিদারি করে নিজেদের আখের গোছায়।

বিএনপিও কম সুবিধাবাদী, স্বার্থান্বেষী, ফরচুন মেকার নয়। এরাও দেশের স্বার্থ বিকিয়ে হলেও ক্ষমতায় আসতে চায়। কাজেই মাইনাস টু।

খালি আওয়ামী লীগ নয়, দুটাই বাদ, বিএনপিকেও ধসিয়ে দিতে হবে একই সাথে।”

এদেরকে জিজ্ঞেস করুন :

“আচ্ছা ভাইয়া, বিএনপিকে ধসালে কে আসবে? বিকল্প কী?” এর কোনো জবাব এরা দেবেনা।

একটা ধোঁয়াটে জবাব দিয়ে রহস্যময় মিচকা হাসি হেসে বলবে : “আসবে আসবে। জায়গা কি খালি থাকে? পরিস্থিতি কি কারো জন্য বসে থাকে? নেতৃত্বের আসন কি কখনো শূণ্য থাকে? সময়ের প্রয়োজনে কেউ না কেউ এসে যাবেই।”

কেউ যে কখনো আসমান থেকে নাজিল হয় না বা মাটি ফুঁড়ে উঠে আসেনা, প্রতিটি শূণ্যস্থান পূরণে যে একটা প্রক্রিয়া লাগে, আর সে প্রক্রিয়া শুরু না হলে দুঃশাসন ও ব্যর্থ রেজিমই যে টিকে থাকে সেটা এদের অনেকেই জানে।

এরা জেনে-শুনেই বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় ব্যর্থ রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে। দুঃশাসনের ছদ্মবেশী বি-টিম বা সেকেন্ড ফ্রন্ট এরা। স্টান্টবাজি এদের একটা কৌশল। আর আছে মহামূর্খ ও হঠকারি এবং সব কিছুর ওপর আস্থা হারানো হতাশ কিছু লোক। কেউ কেউ আবার সবদিকে তাল মেরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইম্পর্ট্যান্ট থাকতে চায়। এদের নিয়ে কথা না বলাই ভালো।

আমি বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ইন্ডিয়া ইস্যু’ নিয়ে অল্প কিছু কথা বলবো। তার আগে আমি বিএনপি-বিরোধী অতিবিপ্লবীদের উদ্দেশে একটা কথা বলবো। সেটা হলো, অন্যান্য সব ইস্যুর মতন এ ইস্যুতেও বিএনপি নিশ্চয়ই বিএনপির রাজনীতিই করবে।

নিশ্চয়ই আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি বা সিপিবির রাজনীতি বিএনপি করবে না। এমনকি সর্বহারা পার্টি, জাসদ, মুসলিম লীগ এবং অন্যান্য খুচরা দলের রাজনীতিও নয়।

এ-দেশের বিপুল জনসমর্থনধন্য মূলধারার প্রধান দল বিএনপি কেন ইন্ডিয়া ইস্যুতে অন্যান্য খুচরা দলের নীতি-কৌশল ফলো করেনা – এজন্য যারা কান্দে তাদেরকে এক বোতল সমবেদনা উপহার দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

এই অতিবিপ্লবীদের উদ্দেশে আরো নিবেদন, আচ্ছা ব্রাদার, বাংলাদেশে কোন্ দলকে ক্ষমতায় রাখলে ইন্ডিয়ার লাভ হয় সেটা কি তারা তোমার চেয়ে কম বুঝে? তারা তো জেনে বুঝেই বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার গ্লোবাল ক্যাম্পেইনে অগ্রণী হয়েছিল। এ-দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়  আওয়ামীলীগকে বহাল রাখতে সব কূটনৈতিক রীতি ভেঙ্গে ইন্ডিয়া যে প্রকাশ্যে তাদের পররাষ্ট্র সচিবকে মাঠে নামিয়েছিল সেটা তো সকলেই দেখেছে।

দিল্লীতে তো বটেই, ঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়েও ইন্ডিয়ান কূটনীতিকদের বিএনপির বিরুদ্ধে অশোভন মন্তব্য কে না শুনেছে? দুই দলের মধ্যে কোনো তফাত না থাকলে বিএনপির বিরুদ্ধে এত প্রাণান্তকর প্রয়াস কেন তাদের? বিএনপিও যদি দেশের ও জাতীয় স্বার্থ বেচে ক্ষমতায় আসতে চায় তাহলে বিএনপিকে গ্রহন করলেই তো ইন্ডিয়ার বেশি সুবিধা হবার কথা। কারণ এ পার্টির জনসমর্থন বেশি।

কেন তারা জনসমর্থনহীন একটা দলের সঙ্গে এভাবে গাঁটছড়া বেধে থাকছে? এর কারণ ইন্ডিয়া ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তোমার চোখে কোনো পার্থক্য না থাকলেও ইন্ডিয়া কিন্তু ঠিকই জানে ও বুঝে পার্থক্য কতোটা আছে।

কাজেই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত দু-একটি ঘটনা বা উক্তির কাটপিস জোড়া দিয়ে সেটাকে পুঁজি করে বিএনপি-আওয়ামী লীগকে এক কাতারে ফেলে প্রপাগান্ডার কিছু নেই।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেবো। তার আগে একটা কথা বলে রাখি। ১৯৭৫ সালের ৭ নবেম্বরে সৈনিক-জনতার মিলিত জাগৃতির মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব অর্জন করে। জিয়ার অকাল শাহাদতবরণ ও এরশাদের ক্ষমতাদখল সেই সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে।

আর এই রাষ্ট্রটি তথাকথিত এক-এগারোতে তার সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি হারিয়েছে। এখন উদাহরণটিতে আসছি।

বাংলাদেশী জামায়াতে ইসলামী একসময় দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিবেশী ইন্ডিয়ার সঙ্গে একটি ওয়ার্কিং রিলেশন গড়ে তোলার। সে সময় কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ইন্ডিয়া সফর করে। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ মতবিনিময় ও কয়েকদফা বৈঠকও হয়। ঢাকায় ইন্ডিয়ান কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব পান আব্দুল কাদের মোল্লা। কোনো এক সময়ের কৌশলগত এ-সব উদ্যোগের কারণে জামায়াত কিন্তু মোটেও প্রো-ইন্ডিয়ান পার্টি হয়ে যায়নি। এমনকি বিজেপি ইন্ডিয়ার ক্ষমতায় আসা সত্বেও বাংলাদেশের ভারতপ্রিয় সরকার জামায়াতের শীর্ষনেতাদের ফাঁসি দেয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরেও আসেনি।

এখন আসল কথায় আসি।

বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে থেকেই ইন্ডিয়া সেভেন সিস্টার নামে পরিচিত তার উত্তর-পূবের সাত অঙ্গরাজ্যের সংগে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের দাবি জানিয়ে আসছিল।

তখন আওয়ামী সরকার তাতে রাজিও ছিল। কিন্তু বিএনপির প্রবল বিরোধিতার কারণে তারা সেটি করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে।

তাছাড়া দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তখন এতোটা হীনবল হয়ে পড়েনি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ এই সেভেন সিস্টারের ব্যাপারে ইন্ডিয়া আরও শংকিত ও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।

তারা এই যোগাযোগ পেতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য ‘কানেক্টিভিটি’ ও ‘ট্রানজিট’ টার্ম ব্যবহার করতে থাকে।

এসব প্রচারণায় ইউরোপ-আমেরিকাও বিভ্রান্ত হয়ে বিএনপিকে বলতে থাকে, কেন তোমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে চাও? কেন কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের বিরুদ্ধে তোমরা? বিএনপি তখন সে চাপ দৃঢ়ভাবে খুব দক্ষতার সঙ্গেই মোকাবিলা করেছে।

বিএনপি বলেছে, আমরা কানেক্টিভিটির বিরোধী নই। কানেক্টিভিটির পথ ইন্ডিয়া থেকে এসে ইন্ডিয়ায় গিয়ে ফুরাবে না। আর ট্রানজিট হয় দু’য়ের অধিক দেশের মধ্যে পণ্য ও জনপরিবহনের ক্ষেত্রে। কিন্তু ইন্ডিয়া আসলে কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের নামে যা চাইছে সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তার সেভেন সিস্টার অংগরাজ্যগুলোর সঙ্গে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের রুট।

এটা আসলে করিডোর। নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সার্বভৌম সমতা সহ বিভিন্ন প্রশ্নে বাংলাদেশ এই করিডোর সুবিধা ইন্ডিয়াকে দিতে পারবে না।সে সময়েই ইন্ডিয়ার এসব প্রস্তাবের বিপরীতে বিএনপি কতিপয় শর্তসাপেক্ষে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দেয়। সেই ট্রান্সশিপমেন্ট প্রস্তাব ছিল উভয় দেশের জন্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক।

এর বিনিময়ে বিএনপি ইন্ডিয়ার কাছে নেপালের জন্য ট্রানজিট সুবিধা এবং পানিবন্টন সংকট ও ছিটমহল সমস্যার নিরসনের শর্ত দিয়েছিল।

ইন্ডিয়া বিএনপির এ প্রস্তাব ও শর্ত মেনে নেয়নি। তখনকার বিরোধীদল আওয়ামী লীগ কখনো জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিএনপির এ অবস্থানের পক্ষে দাঁড়ায়নি।এরপর ওয়ান-ইলেভেন পেরিয়ে আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় এলে ইন্ডিয়া কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর লাভের ব্যাপারে তাদের পুরনো প্রচেষ্টা আবারো জোরদার করে। আওয়ামী লীগ সরকারও তাতে সায় দেয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ইন্ডিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফরকালে দু’দেশের পঞ্চাশ দফার যৌথ ইশতেহারে ‘ট্রানজিট’ নাম দিয়ে ইন্ডিয়াকে সেই সব সুবিধা দেয়ার সম্মতি ঘোষণা করা হয়।

বিরোধী দলে থেকে বিএনপি সংসদের ভেতরে ও বাইরে সকল ফ্রন্টে সম্ভাব্য সকল পন্থায় এর তীব্র বিরোধিতা করে ও প্রতিবাদ জানায়।

ইন্ডিয়ার তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা ও দিল্লীতে দু’টি বৈঠকেই বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অন্ততঃ এই ইস্যুতে বিরোধিতা না করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান।

বেগম জিয়া শোভন কূটনৈতিক ভাষায় জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল নয় বলে তার পক্ষে এটা নিঃশব্দে মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

তিনি আবারো এর বিকল্প হিসেবে শর্তসাপেক্ষ ট্রান্সশিপমেন্ট প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন।ইন্ডিয়া বিএনপির এ প্রস্তাব মানেনি।

তারা যে-কোনো মূল্যে ট্রানজিট চাপিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রায় গায়ের জোরে একটি অস্থায়ী প্রটোকল সই করিয়ে নিয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় যানবাহনে করে সেভেন সিস্টারে মালামাল পরিবহনও তারা শুরু করে দেয়।

এর বিরুদ্ধে বিএনপি এবং একমাত্র বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়াই তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

তখন বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে ‘কথায় কথা ভারত-বিরোধিতা’ ও ‘শস্তা এন্টি-ইন্ডিয়ান পলিটিক্স’-এর  জন্য দোষারোপ ও ব্যঙ্গ করা হতো।

তাতে না দমে এই প্রতিবাদ জারি রাখার কারণেই শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ সরকার এবং আমাদের কূটনৈতিক-প্রশাসনিক টিম ইন্ডিয়ার সংগে কিছুটা বার্গেইনিং করার শক্তি-সাহস-সামর্থ অর্জন করে।

ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ার ইলেকশনে কংগ্রেস গিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘ আলোচনায় ইন্ডিয়া অবশেষে সেভেন সিস্টারের সংগে দ্রুত ও সহজে যোগাযোগের জন্য ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর পাবার অবস্থান স্থগিত রেখে ট্রান্সশিপমেন্ট মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং ২০১৮ সালে এ ব্যাপারে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি হয়।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ইন্ডিয়ার যানবাহন সরাসরি সেভেন সিস্টারে যাওয়া নয়। এখন ইন্ডিয়ার মাল আসবে কন্টেইনারে করে। বাংলাদেশী কোম্পানির জাহাজ তা বয়ে আনবে বন্দরে।

সেই কন্টেইনার বাংলাদেশের পরিবহনে করে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় যাবে সীমান্তের স্থলবন্দরে।

সেখানে কাস্টম চেকিংয়ের পর ইন্ডিয়ার অফিসারেরা সে মাল বুঝে নেবে। সম্প্রতি সে চুক্তির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নও শুরু হয়ে গিয়েছে।

তবে বশংবদ এবং গণভিত্তিহীন দুর্বল সরকার হলে যা হয়। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে ওরা কিছুটা বার্গেইনিং ক্ষমতা অর্জন করলেও এজন্য কখনো কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, সামান্য সৌজন্য প্রদর্শনও করেনি।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমঝোতা থাকলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমন্ডলে সরকারের বার্গেইনিং ক্ষমতা বাড়ে। ওরা সেটা বিসর্জন দিয়ে নিজেদেরকেই দুর্বল করেছে।

এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের আরো কিছু সুবিধা পাবার অন্যান্য শর্তগুলো তারা ছেড়ে দিয়েছে। এই চুক্তির পাশাপাশি আমাদের ফেনী নদীর পানি নেয়ার জন্য ইন্ডিয়াকে একতরফা সুবিধা দিয়েও তিস্তার পানি বন্টনের কোনো সুরাহা তারা করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার, মাল পরিবহন ও নিরাপত্তা ছত্রছায়া দেয়ার ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও সার্ভিস চার্জের হার তারা একেবারেই কমিয়ে রেখেছে। ইন্ডিয়ার পণ্যকে সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার শর্ত তারা চুক্তিতে জুড়ে দিয়েছে।

সর্বোপরি ইন্ডিয়াকে এই সার্ভিস দিতে গিয়ে আমাদের বন্দর ও সড়ক সহ বিভিন্ন কাঠামো ও স্থাপনার যে ক্ষতি হবে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোনো রকম করারোপের ব্যবস্থা এই চুক্তিতে নেই।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ইন্ডিয়াকে কৃতজ্ঞ রাখাই যাদের উদ্দেশ্য তাদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো আর কী-ই বা আশা করা যায়?

(মারুফ কামাল খান, ঘাটাইল ডট কম)/-