খান পরিবারের ছায়া মুক্ত টাঙ্গাইলের রাজনীতি

প্রভাবশালী খান পরিবারের কালোছায়া মুক্ত হয়েছে টাঙ্গাইলের রাজনীতিতে। মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদকে খুনের অভিযোগের পর গ্রেফতার হয়েছিলেন চার খানের মধ্যে বড় ভাই ঘাটাইল আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা। বাকি তিন ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকণ, শহিদুর রহমান খান মুক্তি ও সানিয়াত খান বাপ্পা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলায় দীর্ঘ দিন ধরে পলাতক রয়েছে। মুলত নিহত ফারুকের স্ত্রী টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নাহার আহমেদের নেতৃত্বে খান পরিবারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হওয়া পরই পতন নেমে আসে খান পরিবারের বিশাল সন্ত্রাসী ‘সাম্রাজ্যে’র।

জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলা ছাড়াও চাঁদাবাজি, নির্যাতন, দলের অন্য নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে পদ দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। জেলার রাজনীতিবিদরা মনে করেন, মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার ঘটনার মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায় টাঙ্গাইলে খান পরিবারের টানা ৭ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্য।

টাঙ্গাইলের রাজনীতিতে বরাবরই প্রভাব ছিল আলোচিত ও সমালোচিত খান পরিবারের। বিগত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বছর খানেকের মধ্যেই জেলার রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবকিছু আমানুর রহমান খান রানা ও তার তিন ভাইদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, তারা কৌশলে ও প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একের পর এক দখল করে নেন জেলার বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক সংগঠনের শীর্ষ পদগুলো।

টাঙ্গাইলের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক নেতা অভিযোগ করেছেন, আমানুর রহমান খান রানা সংসদ সদস্য হওয়ার পর তার তিন ভাই হুট করে জেলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক শীর্ষ পদগুলোতে আসতে থাকেন। এসব পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা কেউ নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথে যাননি। বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও কৌশলমূলক সমঝোতার আশ্রয় নিয়ে তারা পদগুলোতে আসীন হন। ফলে সবাই নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

তবে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র পদে অবশ্য নির্বাচন করেই জয়লাভ করেন সহিদুর রহমান খান মুক্তি। সেসময় প্রভাবের পাশাপাশি জনপ্রিয়তাও ছিল তার। তবে ভাই রানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরে তিনিও সীমাহীন বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তিনি টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগ এবং টাঙ্গাইল জেলা শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তার বিরুদ্ধেও প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠে।

তবে সাবেক এমপি রানার অফিসের কাছে মুক্তিযোদ্ধা ফারুককে হত্যার ঘটনার পর তারা ভীষণ চাপে পড়ে যান। হত্যা মামলায় রানাসহ তার অপর তিন ভাইয়ের নাম ওঠায় তারাও আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপনে থাকায় মুক্তি টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদ হারান এবং ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। সেই নির্বাচনে বিএনপি মনোনিত প্রার্থীকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরন। সম্মেলনের মাধ্যমে টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমএ রৌফ এবং টাঙ্গাইল জেলা শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হন জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক তানভির হাসান ছোট মনি।

জানা গেছে, সাবেক এমপি রানা ২২ মাস পলাতক থেকে মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলায় আদালতে আত্মসমর্পন করেন। পরে দীর্ঘদিন কারাভোগ করে বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। অন্যদিকে, তার ভাই সাবেক পৌরসভার মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, অপর দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকণ ও সানিয়াত খান বাপ্পার বিরুদ্ধেও রয়েছে হত্যাসহ বেশকয়েকটি মামলা। এসব মামলায় বিগত ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে আমানুর রহমান খান রানার তিন ভাই আত্মগোপনে চলে যান। ফলে গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না তাদের। এ কারণে আস্তে আস্তে বিভিন্ন সংগঠন থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ তাদের হাতছাড়াও হতে থাকে। টাঙ্গাইল জেলায়ও কমতে থাকে তাদের প্রভাব।

সাবেক এমপি রানার অপর ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন ছিলেন টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি, ভিক্টোরিয়া রোড ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি, জেলা ব্যবসায়ী ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির মহাসচিব। আত্মগোপনে যাওয়ার পর তার সকল পদই চলে যায়।

সাবেক এমপি রানার ছোট ভাই সানিয়াত খান বাপ্পা ছিলেন টাঙ্গাইল রাইফেলস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সম্পাদক হিসেবে জেলা ক্রিকেট উপপরিষদের সাধারণ সম্পাদক, করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজ ছাত্র সংসদ এবং টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি আত্মগোপনে যাওয়ার পর এই পদগুলো চলে যায়।

গত ২০১৫ সালের (১৮ অক্টোবর) জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জেলা কমিটি বিলুপ্ত হলে আমানুর রহমান খান রানার ধর্মবিষয়ক সম্পাদকের পদটি চলে যায়। নতুন করে গঠিত কমিটিতে রানা বা তার কোনও ভাইকে কোনও পদে রাখা হয়নি। এমনকি তার নির্বাচনি এলাকা ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগেও স্থান হয়নি রানার। এমনকি মাটিকাটা শ্রমিক ইউনিয়ন, গরু ও ঘোড়ার গাড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন, জেলা গ্রিল প্রস্তুতকারী শ্রমিক সমিতিসহ নাম সর্বস্ব বিভিন্ন সংগঠনের উপদেষ্টাসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের নাম ছিল। এখন কোথাও তাদের আর কোনও নাম নেই।

বিগত ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়া এলাকায় নিজ বাসার সামনে থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ফারুক আহমেদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। ২১ জানুয়ারী নিহত ফারুকের স্ত্রী নাহার আহমেদ বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন। টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ফারুক হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাংসদ আমানুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আনিসুল ইসলাম রাজাকে ২০১৪ সালের ১১ আগস্ট ও মোহাম্মদ আলীকে ২৪ আগস্ট গ্রেফতার করে। ২৭ আগস্ট আনিসুল ইসলাম ও ৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী টাঙ্গাইলের বিচারিক হাকিম আদালতে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বের হয়ে আসে, এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এমপি রানা এবং তার তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা জড়িত। এর পরপরই কাকন ও বাপ্পা আত্মগোপনে চলে যান। আর একই বছরের নভেম্বরে আত্মগোপন করেন সাংসদ আমানুর ও সহিদুর।

বিগত ২০১২ সালে ঘাটাইল আসনের উপনির্বাচনে রানা জয়ী হওয়ার পর থেকেই পুরো জেলায় আধিপত্য বিস্তার করে। শুরু হয় তার ত্রাসের রাজত্ব। টাঙ্গাইল জেলার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতো এমপি রানা ও তার তিন ভাই। তবে মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যার পর তাদের পতন শুরু হয়। ঘাটাইলে বেশ কয়েকবার এমপি রানার সমর্থকরা মাঠে নামার চেষ্টা করেছিলো।

টাঙ্গাইলের রাজনৈতিক অঙ্গন গত পাঁচ বছর ছিল শান্তিপূর্ণ। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা ও তাঁর তিন ভাইয়ের অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্যও ছিল স্বস্তির। রানার জামিনে মুক্তি এবং আবার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কথা বলে এই ‘রানা আতঙ্কের’ কথা জানা গেছে।

সাবেক এমপি রানা ৩৪ মাস কারাগারে থাকার পর গত বছরের ৯ জুলাই জামিনে মুক্তি পান। এরপর থেকে নিজের এলাকা টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ও ঢাকায় থাকছেন। মাঝে মধ্যে টাঙ্গাইল শহরেও থাকছেন। ঘাটাইলের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন।

সাবেক এমপি রানা ও তাঁর ভাইদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অন্যতম নেতৃত্ব দেয়া ব্যক্তিদের অন্যতম জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক তানভীর হাসান ছোট মনির। তিনি এখন টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের সংসদ সদস্য। ছোট মনির বলেন, যারা রানার অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল, তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। কখন কী হয় সারা শহরে এমন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। রানা প্রতিটি উপজেলায় আবার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সুযোগ পেলেই রানা ও তাঁর ভাইয়েরা আবার হত্যার রাজনীতি শুরু করবেন।

ঘাটাইল উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম বলেন, এক সময় যারা রানাদের সঙ্গে ছিলেন, অধিকাংশই সরে গেছেন। এখন এলাকায় রাতের বেলায় নেতাকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হচ্ছেন এবং তাঁদের সঙ্গে রাজনীতি করতে বলছেন।

আরও পড়তে পারেন গতকাল সংবাদ মাধ্যম ঘাটাইলডটকম প্রকাশিত ‘টাঙ্গাইলে সিদ্দিকী পরিবারের সেই দাপট এখন আর নেই’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি।

(জাহিদ হাসান, ঘাটাইলডটকম)/-