ক্রীড়া সংগঠকের আড়ালে প্রতারণা করতেন টাঙ্গাইলের পীরজাদা মুনীর

এলপিজি গ্যাস ও মদের বারের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া এবং মানুষকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে টাকা আত্মসাৎসহ নানা ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে সাইক্লিং ফেডারেশনের সভাপতি শফিউল্লাহ আল মুনীরের বিরুদ্ধে। চেক প্রতারণার একটি মামলায় রিমান্ডে থাকা শফিউল্লাহ আল মুনীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

শফিউল্লাহ আল মুনীরের বাড়ি টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের ঢালান শিবপুর গ্রামে।

ঢাকার বনানী থানায় করা চেক প্রতারণার অভিযোগে করা একটি মামলায় মুনীরকে গত ২৭ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে এ মামলায় সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল রোববার তাঁর রিমান্ডের চতুর্থ দিন ছিল।

ইনডেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল্লাহ আল মুনীরের বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার মামলাটি করেছেন জয়ন্ত কুমার দেব নামের এক ব্যক্তি। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবি। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ আরও তিনটি মামলার খোঁজ পেয়েছে ডিবি।

মুনীরকে ২০০৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্নো সিডি তৈরির অভিযোগে ঢাকার সেগুনবাগিচার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মাদক, চার কথিত মডেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

বনানী থানায় সর্বশেষ দায়ের হওয়া মামলার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, মুনীর উত্তরবঙ্গের ১৪টি জেলায় এলপিজি গ্যাসের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে জয়ন্ত দেবের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা নেন। কিন্তু তিনি লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে টালবাহানা করতে থাকেন।

একপর্যায়ে মুনীর জয়ন্ত দেবকে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকার একটি চেক দেন। ব্যাংকে জমা দিলে চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়।

জয়ন্ত কুমার দেব বলেন, তিনি আমদানি ও রপ্তানির ব্যবসায় যুক্ত। আর শফিউল্লাহ মুনীর এলপিজি গ্যাসের ব্যবসা করেন। তিন বছর আগে মুনীরের কাছ থেকেই তিনি ডিলারশিপ নিয়েছিলেন।

শফিউল্লাহ মুনীর তাঁকে লাইসেন্স করিয়ে দিতে পারবেন বলে তাঁর কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু লাইসেন্স করিয়ে না দিয়ে তাঁর দেওয়া সব টাকা আত্মসাৎ করেন।

এ মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা হলেন ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান। তিনি বলেন, শফিউল্লাহ মুনীরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, শফিউল্লাহ আল মুনীরকে জিজ্ঞাসাবাদে নানা ধরনের প্রতারণার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বারের লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার কথা বলেও একাধিক ব্যক্তি থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাঙ্ক্ষিত স্থলে বদলি করার কথা বলে টাকা নিয়ে প্রতারণা করেছেন বলে অভিযোগ আছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি বিদেশি একটি কোম্পানির অফিস ও হোটেল নির্মাণের ঠিকাদারি নিয়েছিলেন মুনীর। কিন্তু কাজটি নিজে না করে অন্যকে দিয়ে করাতে যান। তখন তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করে ওই কোম্পানি।

ঢাকার অদূরে পূর্বাচলে ফায়ার সার্ভিসের জায়গায় আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার নির্মাণের কাজ নিয়েছিলেন। ওই কাজ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার মামলা করা হয়। মুনীরের কয়েকজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মীদের দিয়ে তিনি অন্যদের ভয়ভীতি দেখাতেন বলে অভিযোগ আছে।

গত ২৮ জুন প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মুনীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তাঁর সাবেক স্ত্রীর ভাই এম এম এহসান নিজামী। এর তিন দিন আগে ২৫ জুন এহসান নিজামী তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করার অভিযোগে মুনীরের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় আরেকটি জিডি করেছিলেন।

যুক্ত আরও ফেডারেশনের সঙ্গে

যাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার এত অভিযোগ, সেই শফিউল্লাহ আল মুনীর সাইক্লিং ফেডারেশনের পাশাপাশি আরও কয়েকটি ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। এসব ফেডারেশনের কর্মকর্তারাও মুনীরের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তুষ্ট। বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশন ও আর্চারি ফেডারেশনের বর্তমান কমিটির সহসভাপতি এই মুনীর।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে এশিয়ান হকি ফেডারেশনের (এএইচএফ) এক কর্মকর্তার সঙ্গে তদবির করে এই ফেডারেশনের সাব-কমিটিতে ঢোকেন মুনীর। বর্তমানে তিনি এশিয়ান হকি ফেডারেশনের ইভেন্ট, স্ট্র্যাটেজি ও ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান।

২০১৭ সালে গঠনতন্ত্র অমান্য করে মোহামেডানের হকি কমিটির চেয়ারম্যান হন মুনীর। ২০১২ সালের আগপর্যন্ত টানা ১৬ বছর ক্লাবটির হকি কমিটির সম্পাদক ছিলেন সাজেদ এ এ আদেল। মোহামেডান ক্লাব লিমিটেড হওয়ার পরপরই আদেল হকি কমিটির চেয়ারম্যান হন। কিন্তু গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে তাঁকে সরিয়ে হকি কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় শফিউল্লাহ আল মুনীরকে।

তখন ক্লাবের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ মুনীর মোহামেডানের স্থায়ী সদস্যও ছিলেন না।

সাজেদ এ এ আদেল বলেন, ‘আমাকে সরিয়ে দিয়ে অবৈধভাবে মুনীরকে ওই সময় চেয়ারম্যান বানানো হয়েছিল। তাঁকে হকি কমিটির সম্পাদক বানালেও আমি মানতে পারতাম। কিন্তু তখন পুরো প্রক্রিয়াটাই করা হয়েছিল অবৈধভাবে।’

রাতারাতি জাপার কেন্দ্রীয় নেতা

শফিউল্লাহ আল মুনীরের পৈতৃক বাড়ি টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের ঢালান শিবপুর গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে বড় হন ঢাকার এজিবি কলোনিতে।

তিনি ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) যোগ দেন। এক মাসের মধ্যেই দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও টাঙ্গাইল জেলা জাপার আহ্বায়ক পদ লাভ করেন।

গত নির্বাচনে তিনি টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে জাপার প্রার্থী হিসেবে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। অবশ্য এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছানোয়ার হোসেন।

মুনীর এখনো টাঙ্গাইল জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক পদে বহাল আছেন বলে জানান এই কমিটির সদস্যসচিব আবদুস সালাম চাকলাদার।  কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীতেও বহাল আছেন।

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘বড় ভাইয়ের (এরশাদ) সময় সে প্রেসিডিয়াম মেম্বার হয়েছে, সেটাই আমরা কন্টিনিউ করেছি। তিন-চার দিন আগে টাঙ্গাইলের কমিটি নিয়ে তার খবর নিতে গিয়ে শুনলাম, সে জেলে আছে। এর বেশি কিছু জানি না।’

(বিশেষ প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-