কোন পথে মির্জাপুরের করোনা পরিস্থিতি?

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে লাগামহীনভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লকডাউনসহ নানামুখী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পরেও যেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতি।

মির্জাপুরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যেখানে ১০০ ছাড়িয়েছে ৭৩ দিনে, সেখানে পরবর্তী ১০০ জন আক্রান্ত হতে সময় লেগেছে মাত্র ১২ দিন।

বুধবার (১ জুলাই) নতুন করে চার পুলিশ সদস্যসহ আরও ৮ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২ জন।

সব মিলিয়ে মাত্র ৮৫ দিনে মির্জাপুরে কোভিডে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াল ২০০ জন।

এতে জেলার অন্যান্য উপজেলাকে ছাপিয়ে আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে টাঙ্গাইলে করোনার হটস্পট হয়ে উঠা মির্জাপুর উপজেলা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল এই উপজেলায় তথা টাঙ্গাইল জেলার প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল মির্জাপুরে। শুরুটা যেমন মির্জাপুর থেকে হয়েছিল তেমনি জেলায় আক্রান্তের তালিকার শীর্ষেও রয়েছে এ উপজেলা।

মির্জাপুরে করোনা সংক্রমণের প্রায় তিন মাস পূর্ণ হতে চলেছে।

এতে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংক্রমণের প্রথম মাস এপ্রিলে মির্জাপুরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ জন, দ্বিতীয় মাসে (মে) আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছিল ৩০ জন আর তৃতীয় মাস জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬১ জন।

সব মিলিয়ে জুন মাসের শেষ দিন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ১৯৪ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ৪৩ জন আর মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয়েছে ৫ জন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হচ্ছে জুলাই মাস। এ সময়ে দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বিগত দিনের তুলনায় আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলা হয়েছে নতুন করে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে আবারো জেঁকে বসতে পারে এই মহামারি ভাইরাস।

সেই দিক বিবেচনা করলে মির্জাপুরেও চলতি জুলাই মাস করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি সময়। কারণ সামনে আর লকডাউন বাড়ানো হচ্ছে না, একই সাথে আসন্ন ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে লোক সমাগম বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

শুধুমাত্র জুন মাসেই ৩০ দিনে মির্জাপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬১ জন। যেখানে শুরুর দিকে দ্বিতীয় মাস মে’তে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ জন। কাজেই অতি শীঘ্রই যে মির্জাপুরের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না সেটা বলাই যায়।

এদিকে, প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত মির্জাপুর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪ টি ইউনিয়নের সর্বত্রই এই প্রাণঘাতি ভাইরাসটি বিস্তার লাভ করেছে। শহর থেকে গ্রামে, শিশু থেকে বৃদ্ধ, পুরুষ থেকে নারী সবার মাঝেই করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

মির্জাপুরে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে সর্বোচ্চ রোগী নিয়ে মির্জাপুর পৌরসভা। পৌরসভাধীন এলাকার ৯ টি ওয়ার্ড মিলিয়ে সর্বাধিক আক্রান্তের সংখ্যা ৬১ জন।

উপজেলার ইউনিয়নভিত্তিক আক্রান্তের তালিকায় যথারীতি গোড়াই (৫৩ জন), মহেড়া (১৩ জন), জামুর্কী (১২ জন) উয়ার্শী (১০ জন), বানাইল (১০ জন), ফতেপুর (৮ জন), ভাওড়া (৮ জন), লতিফপুর (৮ জন), আজগানা (৫ জন), ভাতগ্রাম (৫ জন), বহুরিয়া (৪ জন), তরফপুর ( ২জন), আনাইতারা (২ জন) ও বাঁশতৈল (১ জন) শনাক্ত হয়েছে।

যার মধ্যে সুস্থ হওয়ার তালিকায় যথারীতি পৌরসভা (৯ জন), গোড়াই (৮ জন), লতিফপুর (৬ জন), উয়ার্শী (৫ জন), মহেড়া (৪ জন), ভাওড়া (২ জন), আজগানা (২ জন), জামুর্কী (২ জন), তরফপুর ( ১ জন), বানাইল (১ জন), বহুরিয়া (১ জন), আনাইতারা ( ১ জন) এবং ফতেপুর (১ জন) রয়েছে।

এছাড়া মৃত্যুবরণকারী পাঁচজনের মধ্যে রয়েছে পৌরসভার ২ জন, ভাওড়া ১ জন আর বহুরিয়ার ১ জন।

বাকিরা বিভিন্ন হাসপাতালে ও নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন আছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাকসুদা খানম জানান, মির্জাপুরে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই প্রশাসনের সহযোগিতায় যখন যেখানে যা প্রয়োজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে তাই করা হচ্ছে। এছাড়া করোনা নিয়ন্ত্রণে আমরা পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলায় সবচেয়ে বেশি নমুনা সংগ্রহ করেছি। যার ফলে এ উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি।

তবে করোনার চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে নমুনা সংগ্রহ করে প্রতিটি কাজে দক্ষতার সাথে আমার স্বাস্থ কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সন্দেহজনক ব্যক্তি ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রতি গুরুত্বারোপ করে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক বলেন, ইতিপূর্বে করোনা সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে মির্জাপুর পৌরসভার কেন্দ্রবিন্দু ৩ নং ওয়ার্ড (মির্জাপুর বাজার) এলাকা দুই দফায় ১৭ দিনের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ২ জুলাই শেষ হওয়া এই লকডাউন আর বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে জনগণকে চলাফেরা করতে হবে।

তিনি বলেন, যদি কেউ সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সমন্বয়ে করোনা মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে তিনি জনসাধারণকে আরও সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। সেই সাথে দোকান-পাটসহ হাট-বাজারে প্রশাসনের মোবাইল টিম পরিচালনার মধ্য দিয়ে মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

(মির্জাপুর সংবাদদাতা, ঘাটাইল ডট কম)/-