‘কে আসল অন্ত্যজ? শহুরে সাংবাদিকতার গাং সাঁতার নাকি নর্দমায় ডুবসাতার’

গায়ে-গতরে মফস্বলের অন্ত্যজ শ্রেণীর গন্ধ থাকায় উচ্চ বর্ণের শহুরে সংবাদকর্মীদের তত্বতালাশ খুব একটা রাখা হয় না। তবু সিনিয়র জনা কয়েকের সাথে আলাপচারিতার সুবাদে নগর সাংবাদিকতা গলেপঁচে লাশ হবার খবর ফাঁকফোকরে কানে আসে। কদিন আগে টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত মিথুন মোস্তাফিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে হালের নগর সাংবাদিকতার বেঁহাল বেচ্ছবি ভেসে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, বিগত ৬ মাসে ৪৭৬ জন সংবাদকর্মী মিডিয়া হাউজ থেকে ছাঁটাই হয়েছেন।

সংবাদকর্মীরা এখন স্রোতের বিপরীতে গাং সাতরাচ্ছেন। কুরিয়ারওয়ালারাও এখন চ্যানেল মালিক। এসব চ্যানেলে কর্মরতরা নাকি কয়েক মাস ধরে বেতনভাতা পাননা। কিন্তু মিডিয়া মালিক হবার সুবাদে কুরিয়ারওয়ালারা এখন বড় মাপের সাংবাদিক। মালিক হলেই যেহেতু সাংবাদিক হওয়া যায়, তাই সাংবাদিকতার কোঠায় তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ডান্ডি কার্ড পেয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় বা প্রধানমন্ত্রীর প্রোগ্রামে এসব চোষন মালিকরা নাকি আগভাগেই চেয়ার পেতে বসে থাকেন। এদের জ্বালায় বীটের সংবাদকর্মীরা সেখানে নাকি কল্কে পাননা।

আমি মফস্বলের সংবাদকর্মী। আকারে চুনোপুটি। সম্ভাষণে নিন্মবর্গীয়, অন্ত্যজ। তবে জাতসওয়ার। ক্ষুদ্রগন্ডির রেসে কখনো হারিনি। বিলের শোঁল মাছের মতো হাঁটুজলে চোঁয়াল কামড়ে টিকে থাকি ভাদ্দুরে বন্যাজল না আশা অবধি। তাই গ্রামীন বা আঞ্চলিক সাংবাদিকতার গলিত লাশ দেখে দেখে ক্লান্ত। এবার শহুরে সাংবাদিকতার পঁচা গলা লাশের গন্ধ শুঁকে অবাক হলাম।

আমি টেলিভিশন চ্যানেলে কখনো কাজ করিনি। কাজের ধরন, কৌশল, পরিমাপ জানা নেই। তবে চ্যানেলের স্থানীয় প্রতিনিধি যারা আছেন, হচ্ছেন বা হতে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশকে বিলক্ষন জানি। শেয়ার মার্কেট লুটওয়ালা, বস্তিওয়ালা, মোসাহেবওয়ালা, খিস্তিওয়ালা, যারা চোরাকারবারি, রাস্ট্রীয় সম্পদ বগলদাবাতে হিম্মতওয়ালা, অথবা অবৈধ ধারার কামাইওয়ালা তারাই এখন মিডিয়াওয়ালা। সুতরাং এক কুরিয়ারওয়ালা মিডিয়া মালিক হলে দোষ কি তাতে?

দেশে সুস্থ রাজনীতি নেই, নেতার অভাব নেই। তবে ত্যাগী কর্মীর অভাব। দেশে মিডিয়ার অভাব নেই। নেই “সাম্বাদিকের” অভাব! তবে সাহসী সংবাদকর্মীর প্রকট সঙ্কট। দেশের প্রচলিত রাজনীতি যেমন ত্যাগী কর্মীর পরিবর্তে স্বার্থান্ধ নেতা তৈরি করছেন, তেমনি কুরিয়ারওয়ালার মতো মিডিয়া মালিকরা সাংবাদিক নন, অনর্গল “সাম্বাদিক” বা “সাংঘাতিক” পয়দা করছেন।

রাজধানীর প্রায় সব মিডিয়া অফিসে মালিকরা সাংবাদিকের নামে কিছু দালাল, মুসাহেব আর নিন্দুকের পরিপোষণ করেন। এরা প্রকৃত সংবাদকর্মিদের কোনঠাসা করে রাখেন। চাকরিচূতির নেপথ্যে ভূমিকাও রাখেন।

বিষাদ সিন্ধুর এজিদ বধ পর্বের সেই অলৌকিক কূপ থেকে যেমন দুরাচার এজিদের মৃত সৈনিকরা জীবিত রুপে কলরবে বেরিয়ে আসতেন, তেমনি কুরিয়ারওয়ালাদের হাউজ থেকে শোরগোল পাঁকিয়ে বেরিয়ে আসছেন শত “সাম্বাদিক”।

গ্রামগঞ্জে হরদম এদের দেখা মেলে। শিক্ষা, শিষ্টাচার, জ্ঞানগরিমা, চেনাজানার বলয় শূণ্যের কোঠায়। বেতনভাতা তো দিল্লীকা দূর, ডান্ডি নিতেই দায় লাখ টাকা। এ ভারী দায় শোধরিয়ে কবজা করা ডান্ডি ব্যবসা জমানোতে যাদুর কাঠি বানান। সিলভার, লৌহ আর প্লাস্টিকের সেই ডান্ডি নিয়ে শুকরের মতো চষে বেড়ান মাঠময়দান, চর, জলঙ্গী। কঁচুঘেচু সবই সবই গিলেন গোগ্রাসে।

রাজনৈতিক দলের নেতারা এদের দেখলেই বক্ষ্যমান স্ট্যাটাসের ছবির মতো দাঁত কেলিয়ে এগিয়ে আসেন। নিজের বদসুরুত লুকাতে বণ্য শূকরের সূঁচালো দাঁত চঁকমকিয়ে বলতে থাকেন, “আরে আইসো আইসো তোমাদের চ্যানেল মালিক তো আমার বন্ধু। কতো তদবীর কইরা লাইসেন্স আইনা দিছি।” অথবা বলেন, “আরে তোমার চ্যানেল মালিক তো খুব বিনয়ী। ড্রয়িং রুমে তো আমার পা-ই ছাড়তো না। তাই কইরা দিছি।”

মিথুন মোস্তফা লিখেছেন, শহুরে সাংবাদিকতা এখন গাং পাড়ি দিচ্ছেন। আমি বলি গাং নয়, পিচ্ছিল আর দুর্গন্ধময় নর্দমা পাড়ি দিচ্ছেন। সেই নর্দমায় বড়শি নিয়ে ডুবসাতার খেলাচ্ছেন কুরিয়ারওয়ালারা। কারণ হারাম খেতে যারা অভ্যস্ত, তারা নর্দমার নোংরা জল ডুবে ডুবে গলাধঃকরণে অস্বস্তিবোধ করেন না।

তবে মেধা আর প্রজ্ঞায় যারা বুদ্ধিমান, যারা এ পেশায় নিজকে উৎসর্গ করে দেশ বা জাতিকে কিছু দিতে চান, তাদের কেন কীটপতঙ্গের সাথে নর্দমার জলে অস্বস্তিকর, অস্ব্যাস্থকর ডুবসাঁতারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হবে? কেন মাসের পর মাস তাদের বেতনভাতা বন্ধ থাকবে। কেন তারা সময়অসময় ছাটাইয়ের শিকার হবেন?

প্রিন্ট মিডিয়ার অধঃপতন ঘটেছে অনেক আগেই। অনলাইনে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় করোনা ভাইরাসের মতো নাপাক করছে মিডিয়াঙ্গন। আর এখন কুরিয়ারওয়ালারা মিডিয়া মালিক হওয়ায় টিভি চ্যানেল হতে যাচ্ছে ভরাট চ্যানেল। সেই হাঁজামজা চ্যানেলে সংবাদ সম্ভার তো দূরের কথা কোনো পণ্যই আনানেয়া করা যাবে না।

আমার চারপাঁচজন বন্ধু আছেন যারা ঢাকার মিডিয়া হাউজে এডিটর, নিউজ এডিটর, চীফ রিপোর্টার বা সম মর্যাদায় জব করেন। তাদেরকে ফি বছর মিডিয়া হাউজ চেঞ্জ অথবা কখনোসখনো বেকার থাকতে দেখি। মফস্বলে থাকি বলে তাদের অমন ভোগান্তির হিসাব মিলাতে হিমশিম খাই।

গত ২২ নভেম্বর গিয়েছিলাম জাতীয় প্রেসক্লাবে। ভারতের বোম্বে থেকে এসেছিলেন আমার বন্ধু এক সঙ্গীত শিল্পী। শ্রদ্ধেয় বড় ভাই দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক মফস্বল সম্পাদক মীর মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের প্রচেষ্টায় সেখানে একটি সান্ধ্য জলসার আয়োজন করা হয়। শিল্পীকে সাথে নিয়ে প্রেসক্লাবে হাজির হলে সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন স্বাগত জানান। টানা দেড়ঘন্টার সঙ্গীতানুষ্ঠান শেষে পিঠা, চা পর্ব।

ক্লাবের এক সংবাদকর্মীর সাথে পরিচিত হবার বাসনায় সোফার খালি আসনে গিয়ে বসলাম। কথা হলো সঙ্গীত নিয়ে। মনোযোগ দিয়ে বলা বা শোনা চললো অনেকক্ষণ। শেষে তিনি বাই দ্যা বাই আমার পেশা জানতে চাইলেন। যেহেতু স্থান ছিল জাতীয় প্রেসক্লাব, আর ব্যক্তি হিসাবে দুজনই সংবাদকর্মী, তাই পরিচয়ে কলেজ শিক্ষক উল্লেখ না করে গর্বভরে বললাম, ‘আমি দৈনিক ইত্তেফাকের গোপালপুর সংবাদদাতা।’ কথাটা শোনা মাত্রই যেন তিনি দপ করে নিভে গেলেন। আমার প্রতি তার আগ্রহের মাত্রা জিরোতে নামলো। শুধু ঠোঁট ইষৎ বাঁকিয়ে মৃদূস্বরে বললেন, ‘ও আচ্ছা আপনি উপজেলা পর্যায়ের সংবাদদাতা? বললাম, ‘হাঁ।’ তিনি পলকে আমার দিকে তাচ্ছিল্য ভঙ্গীতে তাকালেন। এরপর আলাপের সমাপ্তি না ঘটিয়ে এবং কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হনহনিয়ে চলে গেলেন।

তার চাহনীতে আমি কুলীণ ব্রাম্মনের আঁচ দেখতে পেলাম। মনে হলে, যেন এক অন্ত্যজ বা হরিজনের সাথে আলাপ জমিয়ে কুলীণের জাত গেছে। তার কিম্ভূতকিমাকার আচরনে আমার কৌতূহল বেড়ে গেলো। গায়ে পড়ে আবার কাছে ভিড়লাম।

তখন ফরিদা ইয়াসমিনসহ সকলেই শিল্পীর সাথে ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত। কৌশলে ভাবজমিয়ে তিনি কিসে কাজ করেন জানার চেষ্টা করলাম। জানা গেলো, তিনি একটি বাংলা দৈনিকের স্টাফ ছিলেন। বর্তমানে ছাঁটাই। এরপর কিছুটা বেঁকে তার ডানপাশে দাড়িয়ে হাঁসিমুখে একটি সেলফি নিলাম। মোবাইলে তোলা ছবির কোয়ালিটি কয়েকবার স্ক্রলে দেখলাম। দুজনের ছবি মিলিয়ে দেখে মনে প্রশ্ন জাগলো আমাদের দুজনের মধ্যে আসল অন্ত্যজ ও হরিজন কে? তিনি না আমি? উত্তরটা না হয় আপনারাই দিন।

(সিনিয়র সাংবাদিক, জয়নাল আবেদীন/ ঘাটাইলডটকম)/-