‘কি হয়, হচ্ছে, আর কি হতে পারে কাশ্মীরে’

কাশ্মিরে গনহত্যা চালাবে ভারত- পরিস্থিতি দেখে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। সেখানার শীর্ষ পলিটিশিয়ানদের প্রায় সকলকে-ই গ্রেফতার করা হয়েছে। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করেছে দেশটির বর্তমান উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার। এর আগে সারাদেশ জুড়ে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি উচ্চারন করানো নিয়ে মুসলিমদের উপর চালিয়েছে বর্বর নির্যাতন। বর্তমান কাশ্মীর কান্ড দেখার পর আর মনে হচ্ছেনা এসব নিছক-ই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা। সারাদেশে এসব ঘটিয়ে সরকার সংখ্যাগুরু হিন্দুদের মনে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়িয়ে দিতেই একে ফিল্ড টেষ্ট হিসেবে ব্যাবহার করেছে।

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সর্বদলীয় হুররিয়াত কনফারেন্সের(এপিএইচসি) প্রধান সাইয়েদ আলী গিলানি গৃহবন্দি থাকাবস্থায় গ্রেফতারের আগে এক টুইট বার্তায় অভিযোগ করে বলেন, কাশ্মীরে বড় ধরনের গণহত্যা চালাতে যাচ্ছে ভারত। শনিবার টুইটারে দেয়া এক পোস্টে গিলানি বলেন, এই গ্রহে বসবাস করা সব মুসলমানের কাছে কাশ্মীরেদের রক্ষার বার্তা হিসেবে নিতে হবে এই টুইটকে।

কাশ্মীর ইস্যুতে সেক্যুলার হিন্দুরা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্যই এই ভীতি তৈরী করা হয়েছে। একদিকে মুসলিম’রা প্রান বাঁচাতে দিক বিদিক হারিয়ে ঘুরতে থাকবে তো অন্যদিকে সেক্যুলাররা তটস্থ থাকবে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে। খুব হিসেব করেই গো মাতা আন্দোলনকে চাংগা করার নামে সারাদেশে একযোগে মুসলিমদের উপর আক্রমন করেছে সরকারী দলের নেতাকর্মীরা।

পার্ট এ কমপ্লিট করার পর পার্ট বি হিসেবে বেছে নিয়েছে কাশ্মীরকে। সেখানে সব ধরনের কমিউনিকেশন সিস্টেম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা জারি করেছে কেন্দ্রীয় স্ব-রাষ্ট্র মন্ত্রী ও বিজেপি প্রধান মি অমিত শাহ। সংসদে এ জাতীয় বিলটি পাশের সাথে সাথেই এবং প্রায় নজিরবিহীন স্বল্প সময়ের মধ্যে এতে স্বাক্ষর করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।

কেন্দ্র সরকার সেখানে মিলিটারি শাসন চাপিয়ে দিয়েছে এবং জঙ্গি উচ্ছেদের নামে যে সম্ভাব্য অভিযান চালাবে বলে মনে করা হচ্ছে তা সারা রাজ্যজুড়েই হয়তো পরিচালিত হবে।

উগ্রপন্থী এই সরকারটির ভাব ভংগি এবং অতীত কর্মকান্ড সহ নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এটা ভাবা যায় যে, মিলিটারি ইউনিটগুলো সারা রাজ্যজুড়ে ম্যাসাকার চালাবে। প্রশ্ন আসতে পারে তাদের সম্ভাব্য সামরিক এই অভিযানে আজাদ কাশ্মীর আক্রান্ত হতে পারে কি না ? এর স্পেসিফিক উত্তর নেই। ধারনা করে নিতে পারি সীমান্তের এপাড়ে বা আজাদ কাশ্মিরে ভারতীয় সেনারা হয়তো গোলা ছুড়বে না।

এর কারন হিসেবে বেছে নেয়া যায় এই যে – ভারত চাইছে কাশ্মীরের নিপীড়িত জনগনকে রক্ষায় পাকিস্তান ভারত নিয়ন্ত্রিত (১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের আদলে ) কাশ্মিরে বহি:শত্রু হিসেবে প্রবেশ করুক। এতে নিজেদের কর্মকান্ড যেমন বৈধতা পাবে তেমনি আন্তর্জাতিক সমর্থন মিলবে ভারতের পক্ষে।

পাকিস্তানকে ‘একঘরে’ করার মোদী প্ল্যানের বাস্তবায়ন হিসেবে পাকিস্তান হয়ে যাবে সন্ত্রাসীদের মদদদাতা দেশ এবং ভারত নিজেদের সকল অপরাধ মুছে পাকিস্তানকে নিরস্ত্রীকরনের জোর দাবি তুলবে। এর ফলে অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ যেমন ভারতকে সমর্থন জানাবে তেমনি নিজেদের স্বার্থে স্বয়ং সৌদি আরবও যদি ভারতের সমর্থক হয়ে যায় তাতে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

এছাড়া বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা, ইসরায়েল, ইউরোপীয় মিত্র শক্তিগুলো যে ভারতের পক্ষে যাবে তা হলফ করে বলা যায়।

যুদ্ধ পুরোদস্তুর কাশ্মীর উপত্যক্যা জুড়ে ছড়িয়ে পরলে ভারত, পাকিস্তানের সেনা শক্তিকে কাশ্মিরেই লক করে ব্যাস্ত রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ৬৫ সালের যুদ্ধকে মনে রেখে এগুতে হবে। জেনারেল আইয়ুব খান সে সময় যখন তার সমস্ত শক্তি ব্যায় করেছিলেন কাশ্মির সীমান্তে তখন ভারতীয়রা লাহোর প্রায় দখল করে ফেলেছিল। মাঝপথ থেকে জিয়ার রেজিমেন্ট ফেরত গিয়ে সেটা ঠেকায় কোনও মতে। তারপরই তড়িঘড়ি করে আমেরিকার চাপেই মুলতঃ তাসখন্দ চুক্তি হয়।

৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধে আমেরিকার হুকুম স্বত্তেও পাকিস্তান কেন ভারতের পক্ষে যুদ্ধ করেনি – আমেরিকা ঠান্ডা মাথায় এর মধুর প্রতিশোধ নেয় পাকিস্তানের উপর। চুক্তির পরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী খুন হন বলে কেউ কেউ বলে থাকেন। মি শাস্ত্রী ঠিক কোন ব্লকের শিকার হয়েছিলেন তা কখনো-ই জানা যায়নি। তবে উগ্র ভারতীয়রা এই চুক্তির ঘোর বিরোধী ছিলেন বলে জানা যায় সে সময়ের পত্র পত্রিকার পাতা ঘেঁটে।

এবার ভারত হয়তো আগের সেই পুরনো এবং চেনা পথে হাটবে না। তারা তাদের পুর্ন শক্তি কাশ্মিরেই ব্যাবহার করবে এবং পাকিস্তানকেও কাশ্মিরে পুর্নমাত্রায় টেনে আনতে চাইবে। যার ফলে পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চল পুলিশ ছাড়া যদি শক্তিশালী ডিফেন্স ব্যাবস্থা ধরে না রাখতে পারে তবে ইউ এস এ এবং ইসরাইলি শক্তি আফগানিস্তান থেকে উড়ে এসে সার্জিকেল স্ট্রাইক চালাতে পারে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত যেখানে যেখানে তাদের পারমানবিক স্থাপনা আছে।

এটাকে অসম্ভব বলে যারা উড়িয়ে দেবেন তাদেরকে বলি, পাকিস্তান যখন কোন রকম যুদ্ধে ছিল না ঠিক তখনই দুইটি মার্কিন চিনুক হেলিকপ্টার পাকিস্তানে ঢুকে তাদের ক্যান্টনমেন্টের চার কিলোমিটারের মধ্যে সফল অভিযান চালিয়ে লাদেনকে মেরে লাশ নিয়ে নিরাপদে চলে যায়। আর পরমানুর ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও সহজ হবে। স্থাপনাগুলো দখল করে নিলেই পাকিস্তানের পক্ষে তা আর পুনর্দখল করা সম্ভব হবে না ম্যাস এক্সপ্লোশনের ভয়ে। পরে ধীরে ধীরে সেসব অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া যাবে অনায়েসেই।

মনে রাখতে হবে গালফ ওয়ারের সময়ে সাদ্দাম বিশ্বাস করে তার বিমানগুলো ভাই সম্বোধন করে ইরানে রেখেছিল। সম্পদ এমনই জিনিস যা একবার গেলে আর ফিরে আসে না।

প্রশ্ন আসতে পারে এখানে ইসরাইল আসবে কিভাবে ? মনে করে দেখুন, ৯৮ সালের কারগিল যুদ্ধে ইসরাইল কখন কিভাবে এসেছিল তা কি আমরা তখন জানতাম ? না, জানতাম না। ইসরাইল ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তখন শুধু যুক্তই হয়নি বরং ১৯৯৮ সালেই তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ড্রোন দিয়ে যুদ্ধও করেছিল ভারতের মাটিতে বসে। সুতরাং অবাক হবার কিছু নেই। যদি শুনি, ইরানে হামলার দামামা ছিল পাকিস্তানে হামলার ফিল্ড টেস্ট কিংবা মানুষের মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা, আমি তাতেও অবাক হব না নিশ্চিত।

(জাকারিয়া চৌধুরী, ঘাটাইলডটকম)/-