কিন্ডারগার্টেন সংশ্লিষ্টদের মানবেতর জীবন ও সরকারের করণীয়

আজকের বাংলাদেশের প্রক্ষাপটে”কিন্ডারগার্টেন” শব্দের সাথে সবাই বিশেষভাবেই পরিচিত। সবাই এটাও জানেন যে,কিন্ডারগার্টেন অনন্য ও আদর্শ ধারার এক প্রকার শিশু শিক্ষালয়।

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাংলাদেশে এ ধরণের বিদ্যালয়ের শুভ যাত্রা শুরু। একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ ধরণের শিক্ষালয়ের বেশ বিস্তার ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন ও সমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন প্রায় ১১লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী এবং অধ্যয়নরত আছে অন্তত ১ কোটি শিক্ষার্থী। ইতোমধ্যেই কিন্ডারগার্টেন গুলি ১ কোটি শিক্ষার্থীর বিপুল সংখ্যক অভিভাবকের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন,সমাজে শিক্ষার আবহ সৃষ্টি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে যথাযথ আলোচনা করে শিশুদের বিদ্যালয়গামী করা ও তীব্র বেকারত্বে কর্মক্ষেত্র তৈরি করাসহ উপরোক্ত সকল বিষয়েই কিন্ডারগার্টেন গুলি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

রাষ্ট্র ও সমাজের সমৃদ্ধির লক্ষ্যেই উল্লিখিত বিষয় সমূহ নিয়ে কিন্ডারগার্টেন গুলি যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে। কিন্ডারগার্টেন গুলির পরিশ্রমী ও সংগ্রামী শিক্ষকমন্ডলী যাঁরা সর্বদা সংগ্রাম করেন প্রতিটি শিশুর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে কিন্তু করোনা সংকটে সরকারের নির্দেশে ১৬ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আজ তাঁরা সংগ্রাম করছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সাথে।

শিক্ষকরা না পারছেন কারো কাছে হাত পাততে না পারছেন ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়াতে! মান বাঁচাবেন না প্রাণ বাঁচাবেন এই দুর্ভাবনা তাঁদের ভীষণ বিচলিত করছে! প্রতিষ্ঠিতাগণ নিদারুণ বিপদে পতিত হয়েছেন।

শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও স্কুলভবন এর ভাড়া এ গুলির কোনটিই তাঁরা পরিশোধ করতে পারা তো দূরের কথা নিজেদের থাকার ঘরের ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেকে বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন অনেক প্রতিষ্ঠাতা স্কুলে এসে থাকছেন! অনেকে স্কুল বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছেন,কেউ কেউ বিদ্যালয় রেখে অন্যত্র চলে গেছেন এবং অভাবের তাড়নায় স্কুল প্রতিষ্ঠাতার আত্মহত্যার মত বেদনা বিধুর ঘটনাও ঘটেছে!

কিন্ডারগার্টেনের উদ্যোক্তা ও শিক্ষক-কর্মচারীরা কতটা দুঃসময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন উপরোক্ত ঘটনাদি তার স্বাক্ষর বহন করছে।

এমন সংকটময় অবস্থায় দেশের দুই তৃতীয়াংশ বা ৪৫ হাজারের অধিক কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত আশঙ্কা দেখা দিয়েছে! ৪৫ হাজার নয় একটি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়াও একটি রাষ্ট্রের জন্য একটি নিকৃষ্ট নজির বলেই বিবেচিত হওয়া উচিত। সেই বিবেচনায় উক্ত কিন্ডারগার্টেন গুলি রক্ষায় সরকারের একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

অন্যথায় রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষা হবে রুগ্ন এবং উন্নত শিক্ষসেবা থেকে বঞ্চিত হবে ১ কোটি শিক্ষার্থী সেই সাথে কর্মহীন হবে কিন্ডারগার্টেনের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় ১১ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী! যা কোন বিচারেই কোন রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।

তবুও রাষ্ট্রের কোন কোন ব্যক্তি বলেছেন-কিন্ডারগার্টেন রক্ষার দায় কেবল উদ্যোক্তাদেরই,সরকারের নয়। এমন মন্তব্য কেবল অনভিপ্রেতই নয়,দুঃখজনকও।

যে কিন্ডারগার্টেন গুলি রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষার আমল পরিবর্তন করে প্রাথমিক শিক্ষায় বিপ্লব সৃষ্টি করেছে,যে কিন্ডারগার্টেন গুলি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন অর্থনৈতিক সুবিধা না নিয়েও রাষ্ট্রের শিশুদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছে ও কর্মক্ষত্র তৈরি করছে এই দুর্দিনে সেই কিন্ডারগার্টেন গুলি রক্ষায় সরকারের নিশ্চয়ই নৈতিক দায় রয়েছে।

তাই কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা ও উদ্যোক্তাদের অনুদান প্রদান করে দেশের কিন্ডারগার্টেন গুলি রক্ষা করা অতীব প্রয়োজন।

সেই সাথে এ সব শিশু শিক্ষালয় গুলিকে সহজ শর্তে নিবন্ধন প্রদানসহ প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা পরিচালনা কমিটিতে ও সমাপনী পরীক্ষা গ্রহণে কিন্ডারগার্টেনের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

এছাড়া ইউ আর সি (উপজেলা রিসোর্স সেন্টার) কর্তৃক বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও সাব ক্লাস্টার প্রশিক্ষণে কিন্ডারগার্টেনের প্রতিষ্ঠাতাদের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

তাহলে রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ মান সুনিশ্চিত করতে দেশের কিন্ডারগার্টেন গুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। এতেই রাষ্ট্র ও সরকারের কল্যাণ নিহিত।

করোনার আশু চলে যাওয়ার লক্ষণ না থাকায় করোনার উপস্থিতিতেই সতর্কতার সাথে আমাদের জীবন যাপন করতে হবে। সে লক্ষ্যেই গার্মেন্টস কারখানা, বিভিন্ন মার্কেট ও বিচারালয় খুলে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও খুলে দেওয়াই শ্রেয়। অন্যথায় কর্মহীন লক্ষ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন হবে বিপন্ন ও কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও হবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্থ।

(আবীর আহমেদ, অধ্যক্ষ ইয়েল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, এলাসিন,টাঙ্গাইল)/-