কালিহাতীতে প্রধান শিক্ষক আ’লীগ নেতার দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাৎ

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের কস্তুুরীপাড়া আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার লিটনের বিরুদ্ধে শিক্ষক কর্মচারী এমপিওভুক্তির জন্য প্রায় কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহন, সভাপতির স্বাক্ষর জাল করার গুরুতর অভিযোগে সিনিয়র শিক্ষক হায়দার আলী শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা পরিচালক সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগ পত্র ও সরেজমিনে অনুসন্ধানে থেকে জানা যায়, ১৯৯৯ সনে সাত জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়ে উপজেলার বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র কস্তুুরীপাড়ায় কস্তুুরীপাড়া আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। গেলো ২৯ এপ্রিল নতুন এমপিও কোড দিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউসি) কে নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ। চুড়ান্ত অনুমোদিত তালিকায় মোট ১৬৩৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘ ২০ বছর পর কস্তুুরীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়টি এমপিও ভুক্ত তালিকায় স্থান পায়। সরকারি ঘোষনা অনুযায়ী গত জুন ২০১৯ তারিখ হতে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

অপর দিকে এ সুযোগে অর্থ লিপ্সায় মেতে উঠেন প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার লিটন। তিনি শিক্ষক-কর্মচারীর নাম এমপিওভুক্তকরণ ও লক্ষ লক্ষ টাকা এরিয়ার বিল পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের উৎকোচ দাবী করে বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের চাপ দিতে থাকেন।

দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কর্মরত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মোঃ শামস উদ্দিন প্রধান শিক্ষকের অর্থ লিপ্সার কাছে হেরে গিয়ে এমপিও ভুক্তি বঞ্চিত হয়েছেন।

শিক্ষক উৎকোচ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহন করে প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি আবুল কাসেম সিকদারের স্বাক্ষর জাল করে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের নিয়োগ দেখিয়ে ৫জনের কাজ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহন করে তাদের নাম এমপিওভুক্তির জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে দাখিল করেন।

এদিকে যারা কোনদিনই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারী ছিলেন না এবং তাদের নিয়োগ পত্রে সাক্ষর করেন নাই বলে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ভুয়া ও জাল বলে অবিহিত করেছেন তৎকালিন সভাপতি ডাক্তার আবুল কাসেম সিকদার।

নিয়োগ পত্র জাল করে যাদের নাম এমপিওভুক্তির জন্য পাঠানো হয়েছে তারা হচ্ছেন মোঃ ফরিদ আহমেদ, মোঃ শহিদুল ইসলাম, মোঃ জুলহাস উদ্দিন, আতিকুর রহমান, ইকবাল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান।

এছাড়াও বিদ্যালয়ের কর্মরত অন্য ৪ জন শিক্ষকের কাজ থেকে ৮ লক্ষ টাকা করে মোট ৩২ লক্ষ টাকা ও দপ্তরী হিসাবে মোস্তাফিজুর রহমানের কাছ খেকে ৫ লক্ষ টাকা ও আয়া জ্যোৎসনা রানীর কাছ থেকে ৩ লক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহন করেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।

পক্ষান্তরে এমপিওভুক্তি বানিজ্য সর্ম্পকে বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও এই বিদ্যালয়ের একাধিকবার নির্বাচিত সভাপতি এম হোসেন আলী উৎকোচ গ্রহনকারী প্রধান শিক্ষকের শাস্তি দাবী করে জানান, প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার অনৈতিকভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে বিপুল পরিমান অর্থ বানিজ্য করেছেন বলে শুনেছি।

আমরা এলাকাবাসী মিলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি যারা দীর্ঘ সময় বিনা বেতনে চাকুরী করেছেন তাদের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে এমপিও ভুক্তির জন্য যাদের নাম দিয়েছেন তাদেরকে আমি বা আমরা কেউই চিনিনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই বিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক জানিয়েছেন, এমপিওভুক্তির বানিজ্যের সাথে টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন।

প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা শিক্ষা অফিসার লায়লা খানম স্বাক্ষরিত গত ২৩জুন জে.শি.অ/টাং-৯৮৫ নং স্মারকে গবেষনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ বায়েজিদ হোসেনকে আহবায়ক করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জরুরী ভিত্তিতে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ মোতাবেক কমিটির আহবায়ক মোহাম্মদ বায়েজীদ হোসেন স্বাক্ষরিত গত ২৫জুন জেশিঅ/টাং-৯৯১ নং স্মারকে পহেলা জুলাই বেলা ১১টায় সরেজমিনে তদন্ত কার্য পরিচালনার লক্ষে সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্ধারিত দিন ও সময়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণাদীসহ উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আকস্মিকভাবে রহস্যজনক কারণে নির্ধারিত তারিখের এক দিন আগে গত ৩০জুন জে.শি.অ/টাং-১০১৩ নং স্মারকে তদন্ত কমিটির আহবায়ক তারিখ পরিবর্তন করে আগামী ৮জুলাই তারিখ পুনঃনির্ধারণ করায় জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

গুঞ্জন রয়েছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার মাধ্যমে জনৈক অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে দিয়ে তদবির করে তদন্ত কার্য বিলম্বিত করার জন্য জেলা শিক্ষা অফিসকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি বাণিজ্যের বিষয়ে অভিযোগ তোলায় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি ডাঃ এম.এ কাশেম শিকদারকে ভয়ভীতি-হুমকি ও যে কোন প্রকার ক্ষতি সাধন করতে পারেন মর্মে প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদারের বিরুদ্ধে কালিহাতী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। ডায়েরী নং-৯৭০ তারিখ ২৪/৬/২০২০ ইং।

মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটিঃ অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যালয়

গেলো ১৮ মার্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এম.আর.ও নং ৯৯ আইন/২০০৯ এর প্রবিধান ৭ এবং ৮ অনুযায়ী মেয়াদ উত্তীর্নের অন্তত ৩০ দিন পূর্বে ১৭ ফেব্রুয়ারী নির্বাচন সম্পন্ন করে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা বলা থাকলেও প্রধান শিক্ষক মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছেন যা সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত ও অবৈধ।

অভিভাবক সদস্য হিসাবে আবু তালেব, মীর ইমরুল হাসান, মোঃ জাকির হোসেন, মোঃ সেকান্দারের নাম উল্লেখ থাকলেও তারা বিদ্যালয়ের কোন বৈধ অভিভাবক নন। তাদের কারো কোন সন্তান এ বিদ্যালয়ের অধ্যয়ন করে না বলে জানা গেছে ।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কর্মরত আরিফুর রহমান সিকদার নিয়োগ বানিজ্যের টাকা দিয়ে গত তিন মাসের মধ্যে কস্তুুরীপাড়া কবরস্থান সংলগ্ন পৈত্রিক ভূমিতে ৫ লক্ষাধিক টাকার মাটি ভরাটের কাজ করেছেন ও বড় ভাই বাবুল সিকদারের নিকট থেকে বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে ৩৫ শতাংশ জমিও ক্রয় করেছেন এবং স্ত্রী ভরসরাই উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত রিনা আক্তারের নামে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড কালিহাতী শাখায় বিপুল পরিমান টাকা জমা করেছেন।

কস্তুুরীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কানিজ ফাতেমার স্বামী শহিদুল আরিফুর রহমান সিকদারের সহযোগী হিসাবে শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ ও এমপিওভুক্তকরণের নামে প্রায় কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে উৎকোচ সংগ্রহ করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেও হঠাৎ করে বিপুল অংকের টাকায় পৈতৃক জমি ভরাট, জমি ক্রয়ের টাকা ও জ্ঞাত আয় বর্হিভূত বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের উৎস সম্পর্কে স্থানীয় জনমনে প্রশ্ন দেখা নানা দিয়েছে।

স্থানীয়রা তার দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্ত সহ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের দাবী জানিয়েছেন।

প্রধান শিক্ষক আরিফুর রহমান সিকদারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এমপিওর জন্য টাকা লাগে এটা সকলেই জানে, আমি অতিরিক্ত কোন টাকা নেইনি। আর আমি কারো স্বাক্ষরও জাল করি নাই।

ম্যানিজিং কমিটির বর্তমান সভাপতি ও বীরবাসিন্দা ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব আলীর সাথে তার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যদি কোন অন্যায় বা অনৈতিক কাজে সাথে যুক্ত থাকেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অনিয়ম ও দুনীর্তিবাজদের সাথে শেখ হাসিনা সরকার কোন আপোষ করে না। সে দলের যতবড় শক্তিশালীই হোক না কেন তাকে শাস্তি পেতেই হবে।

(এম এম হেলাল, ঘাটাইল ডট কম)/-