১৮ই আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা জুলাই, ২০২০ ইং

কাগমারী সম্মেলনের রাজনৈতিক পরিণতি

জানু ২৪, ২০২০

১৯৫৭ সালের ৮ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। সেই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় গভীর সংকটে নিক্ষিপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগের দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ তখন পূর্ব পাকিস্তানে ও কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল। কোনো ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় দুটিই ছিল কোয়ালিশন সরকার। পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন ১২ জন। ১২ জন নিয়েই শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাঞ্জারের চৌধুরী মহম্মদ আলীর সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করেছিলেন। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও সরকারে সোহরাওয়ার্দীর অবস্থান ছিল খুবই নড়বড়ে। তার হাত-পা প্রকৃতপক্ষে বাঁধা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের স্বার্থের খুঁটিতে।

এটা বোঝার জন্য বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ১৯৫৪ সালে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি হওয়ার সময় থেকে আওয়ামী লীগ সেই চুক্তির বিরোধিতা করে এসেছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের শরিক হিসেবে আওয়ামী লীগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সোচ্চার।

সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরমুহূর্ত থেকেই তাদের এই অবস্থান পরিবর্তন করে তারা পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বহাল রাখার পক্ষে ঘোষণা দিয়ে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্টো যাত্রা করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ঢাকায় এসে এক জনসভায় সোহরওয়ার্দী ঘোষণা করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলনের আর প্রয়োজন নেই। কারণ পূর্ব পাকিস্তান ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন পেয়ে গেছে! সেই জনসভায় মওলানা ভাসানী এর তীব্র প্রতিবাদ করলেও অন্য নেতারা নীরব ছিলেন! প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই দুই প্রশ্নে তার উল্টো অবস্থান আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল এবং এর বিরুদ্ধে তাদের দলের অভ্যন্তরে দেখা দিয়েছিল প্রবল বিক্ষোভ। দলের দুই প্রধান নেতা সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরেছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ভাসানী আহ্বান করেছিলেন কাগমারী সম্মেলন।

সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে জোর প্রচার চালিয়ে কাউন্সিলরদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

আতাউর রহমান, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে থাকলেও তাদের ভূমিকা গৌণ ছিল। যাই হোক, সম্মেলনে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

সাধারণ কাউন্সিলরদের মধ্যে ভাসানীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি পার্টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল সোহরাওয়ার্দীর।

সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রাদেশিক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

আতাউর রহমান ছিলেন প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী এবং আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

কাগমারী সম্মেলনে যাই হোক, সম্মেলনের পর সোহরাওয়ার্দী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বহাল রাখার এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করায় আওয়ামী লীগের মধ্যে ভাঙনের শর্ত তৈরি হয়েছিল। এর ফলে কাগমারী সম্মেলনের অব্যবহতি পরই মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে ইস্তফা দিয়েছিলেন। তিনি তার দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য পদও ছেড়েছিলেন। তারপর তিনি ঘোষণা করেছিলেন একটি নতুন রাজনৈতিক পার্টি গঠনের।

১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে এ জন্য তিনি ঢাকায় সারা পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের এক সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। ২৫ ও ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন আবদুল গাফফার খান, মিয়া ইফতেখার উদ্দীন, মাহমুদুল হক ওসমানী, বেজেঞ্জো, মাহমুদ আলী কাসুরী, জিএম সাইয়াদ এবং আরও অনেকে।

কাগমারী সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিব, মোশতাক আহমদসহ তার সমর্থকরা চেষ্টা করেছিলেন যুবলীগকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করার। যুবলীগ ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং তৎকালে পূর্ব পাকিস্তানের একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংগঠন, যাদের ভূমিকা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরকে বহিষ্কারের প্রস্তাব কাউন্সিলে পরাজিত হয়েছিল।

মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করায় তারাও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে জুলাই মাসের এই গণতান্ত্রিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল।

কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য লোকেরাও অনেকে ছিলেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তারাও যোগ দিয়েছিলেন সম্মেলনে। এভাবে সকলে একত্রিত হয়ে ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)।

ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে সম্মেলন চলার সময় ডেলিগেটদের ওপর হামলা হয়েছিল। সেই হামলায় মিয়া ইফতেখার উদ্দীনসহ অনেকে আহত হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় দিন পল্টনে যে জনসভা সম্মেলন উপলক্ষে হয়েছিল তাতেও একই ধরনের হামলা হয়েছিল, যার বিবরণ মণি সিংহ তার স্মৃতিকথাতে লিখেছেন।

এসবই পরিচিত ব্যাপার, যদিও বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে এসবের কোনো পরিচয় নেই বললেই চলে।

কাগমারী সম্মেলনে ও তার পরবর্তী পর্যায়ে যা ঘটেছিল তার ফলে এ দেশের রাজনীতি বড় ধরনের মোড় নিয়েছিল এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন প্রভূতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

মওলানা ভাসানী ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত নেতাকর্মীরা ছিলেন আওয়ামী লীগের বামপন্থি অংশ। কাজেই ভাসানী আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করে তার দলবল নিয়ে ন্যাপ গঠন করার পর আওয়ামী লীগের মধ্যে দক্ষিণপন্থিদের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য স্থাপিত হয়।

সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমান, মোশতাক আহমদ, আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ আওয়ামী লীগে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির ধারক-বাহকে পরিণত হন।

এরপর থেকে আওয়ামী লীগের নীতি ও রাজনীতি তার মোড় পরিবর্তন না করে দক্ষিণপন্থি দল হিসেবেই বিকশিত হয়।

সোহরাওয়ার্দী অল্পদিন পরই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদচ্যুত হন এবং তার পর শেখ মুজিবসহ অন্যরা আবার পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন শুরু করলেও তাদের দক্ষিণপন্থি চরিত্র অপরিবর্তিত থাকে।

দেখা যাবে যে, কাগমারী সম্মেলনে যা ঘটেছিল তার ফলে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জয়যাত্রার পথই প্রশস্ত হয়েছিল। ষাটের দশকের মধ্যভাগে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্গঠিত হওয়ার সময় আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদের মতো কিছুটা উদারপন্থিরা তাতে যোগদানে বিরত থাকেন। আওয়ামী লীগে শেখ মুজিবের নেতৃত্ব নিরঙ্কুশ হয়।

মওলানা ভাসানী অভিমানের বশবর্তী হয়ে কাগমারী সম্মেলনের পরপরই আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ না করে যদি তার মধ্যে থেকে গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যেতেন, তাহলে আওয়ামী লীগ এভাবে একটি দক্ষিণপন্থি দল হিসেবে শক্তিশালী না হয়ে তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষিত হতো। আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক চরিত্র বিশেষ ক্ষুণ্ন হতো না।

এদিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, কাগমারী সম্মেলন-পরবর্তী পর্যায়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির শক্তি বৃদ্ধির শর্ত তৈরি হয়েছিল।

এ ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে নতুন পার্টি গঠনে তাদের যথেষ্ট উৎসাহ ও প্ররোচনা ছিল। তারা মনে করেছিলেন, একটি পেটিবুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল এভাবে গঠিত হলে তার মধ্যে তারা অনেক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এবং তাকে প্রায় একটি সমাজতান্ত্রিক দল হিসেবে গড়ে তুলবেন। মওলানা ভাসানীকেও তারা ব্যবহার করবেন এই উদ্দেশ্যে।

এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে অনেক কিছু বলা যায় এবং আমি অন্যত্র এ বিষয়ে লিখেছি।

এখানে তার সুযোগ নেই। তবে এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, ন্যাপের মধ্যে সব থেকে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কমিউনিস্টরা কৃষক সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি সংগঠনকে যেভাবে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের অধীন করেছিলেন, তার পরিণতিতে কমিউনিস্ট হিসেবে তাদের শক্তি বৃদ্ধি, কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি বৃদ্ধি কিছুই হয়নি। উপরন্তু তাদের মধ্যে ক্রমশ বুর্জোয়া প্রাধান্য বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিকভাবে তাদের চরিত্রের বুর্জোয়াকরণ ঘটেছিল।

এর পরিণতিতে তারা বহুধাবিভক্ত হয়েছিলেন ও শেষ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি বলতে যা বোঝায় তার সবকিছুই বিলুপ্ত হয়েছিল।

১৯৭১ সালে চীনাপন্থি পার্টিগুলো তাদের দেউলিয়া লাইন কার্যকর করতে গিয়ে যেভাবে ছিন্নভিন্ন এক কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে বিলুপ্ত হয়েছিল এবং ১৯৭৫ সালে মস্কোপন্থি পার্টি ঘোষণা দিয়ে নিজেকে বিলুপ্ত করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন বাকশালে যেভাবে বিলীন হয়েছিল, তাদের সেই পরিণতির কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে কাগমারী সম্মেলন ও তার পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির মোড় পরিবর্তনের প্রাসঙ্গিকতা উপেক্ষার বিষয় নয়।

(বদরুদ্দীন উমর, সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল)/-

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

পঞ্জিকা

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Adsense