১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে মে, ২০২০ ইং

করোনাকালের দিনাতিপাত

এপ্রিল ২৩, ২০২০

আজ ১৪২৭ বঙ্গাব্দর ১০ই বৈশাখ। গাছে গাছে আমের মুকুল। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মৌ মৌ মহনীয় গন্ধ। মৌমাছিরাও ব্যস্ত মধু আহরণে। এমন দৃশ্য গ্রামের আম বাগান থেকে শুরু করে সড়কের পাশে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা ছাদে তাকালেই দেখা যাচ্ছে। ইটপাথরের কৃত্রিম নগরেও আমের মুকুলের লাবণ্যময় দৃশ্য যেকোনো পথিকের হৃদয় স্পর্শ করছে। আম কাঁঠালের ঘ্রানে বাতাস মহনীয় সুবাস থাকলেও আজকের বাস্তবতা তেমন নয়। মহামারী করোনাভাইরাস আমাদের সকলকিছুকে বেপরোয়া গ্রাস করেছে। এখন ভাববার অবকাশ নেই ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের শাখায় উঠি রঙিন করি মুখ’। আমরা ইচ্ছে করলেই আজকের বাংলাদেশে প্রকাশ্য দশজনে বসে গল্পআড্ডায় মাততে পারছি না।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ মানুষের জীবনে ঘরের বাইরে সময় কাটানোর গল্প যতোটা তার থেকে ঢের বেশী গৃহের বাইরে সময় অতিবাহিত করার প্রেক্ষাপট। পুরুষদের কর্মপরিধি তাদেরকে গৃহের বাইরে নিয়ে যায়, এবং একটা সময় পরবর্তীতে তাদের আবার গৃহে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এটি প্রাত্যহিক কার্যকরণ। যিনি চাকুরি করেন, তাকে ঘড়ি ধরে একটা সময় চাকুরীক্ষেত্রে ব্যয় করতে হয়। যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, তাকেও নিয়মিত সেখানে সময় দিতে হয়। যে মানুষটি দিনমজুর তাকেও ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতে হয়। কিন্তু বর্তমানের চালচিত্র এমন অবস্থায় নেই। ভয়ঙ্কর ভাইরাস করোনা আমাদের সকল ধরনের স্বাভাবিক কার্যকলাপে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে সাধারণ ছুটি চলমান রয়েছে এমন ঘটনার উদাহরণ আমাদের গত দুইচারশ বছরের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। করোনাভাইরাসের প্রভাব আমাদেরকে ঘরের বাইরে যেতে দিচ্ছে না, বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে ঘরে থাকতে হচ্ছে।

পরিচিত জনদের সাথে যেসব কথাবার্তা হয়, তাতে দেখা যায় তিনি একটানা কয়েকদিন ধরে বাসার বাইরে যাচ্ছেন না। সীমিত সময়ের জন্য প্রাত্যহিক নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনাকাটার জন্য যদিও যাচ্ছেন বাইরে তবে ফিরে আসছেন অতিদ্রুততম সময়ের মধ্যে।

২০২০ সালের ৮ই মার্চ বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মানুষের মধ্যে শনাক্ত হওয়ার পর সেই মাসেরই ২৫ তারিখে দেশের সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে বন্ধ করে দেয়া হয় সকল প্রকারের যানবাহন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে বন্ধ রয়েছে পাড়ার চায়ের দোকান পর্যন্ত। সেই সাধারণ ছুটি সারাদেশে অঘোষিত লকডাউনে পরিণত হয়ে এখনও বলবৎ। অভূতপূর্বভাবে অত্যন্ত কার্যকর নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সহ দেশের সমস্ত জেলা উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়নগুলোর ওয়ার্ড পর্যায়ের পাড়ামহল্লা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মানুষের সাধারণ চলাচল। অতীব প্রবলভাবে মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে নিজ নিজ গৃহ থেকে বাইরে বের না হওয়ার জন্যে।

এমন একটা পরিস্থিতিতে আমাদের সকল শ্রেণী পেশার মানুষজনের সুযোগ আর সুবিধার তৈরি হয়েছে নিজের পরিবার সদস্যদের সাথে সময় অতিবাহিত করার। অনেকে মজা করে বলছেন নিজের স্ত্রীর সাথে গত এক বছরে যে পরিমানের সময় কাটিয়েছি তার থেকে অনেক বেশী সময় লকডাউনে ইতোমধ্যে ভালবাসার স্ত্রীকে দিয়েছি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খেয়াল করলে দেখা যায়, সকল সেলুন বন্ধ থাকার সুবাদে স্বামীর বড় বড় হয়ে যাওয়া চুল সযত্নে কেটে দিচ্ছেন স্ত্রী, আর সেইসবের ছবি ভিডিও শেয়ার করে পরস্পর খুনসুটি কুড়াচ্ছেন। অনেকে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে লুডু, পাশা খেলছেন, অনেকে পুড়নো সেলফের ধুলোজমা বইগুলোর ধুলো ছাড়িয়ে সেগুলো পড়ার চেষ্টা করছেন। অনেকের স্ত্রী আবার সাংসারিক কাজে স্বামীর সহযোগিতার ছবি শেয়ার করে মজা লুটছেন। আসলে আমাদের এখন কিছুই করার নাই। থমকে গেছে সারা বিশ্ব, শুধু বাংলাদেশই নয়।

আমার বসবাস যে এলাকায় সেখানকার পৌরশহরের প্রায় ২২০০ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এক মাস ধরে। শুধুমাত্র নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকানগুলো এবং কাঁচাবাজার চালু থাকছে সকাল আটটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত, সেখানেও রয়েছে প্রশাসনের যথোপযুক্ত তদারকি। নানাভাবে মানুষের সাথে মানুষের মেলামেশা বাধাগ্রস্থ করে বলা হচ্ছে বাসার বাইরে না বের হয়ে নিজের পরিবার সদস্যদের সাথে সময় কাটানোর কথা। মানুষকে বুঝানো হচ্ছে করোনার হিংস্রতা থেকে মুক্তির জন্য প্রথমত আবশ্যক গৃহের বাইরে না যাওয়া।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বাজারগুলো স্থানান্তর করা হয়েছে আরও বড় পরিসরের জায়গায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে একটু দূরে দূরে দোকান বসানোর লক্ষ্যে। যেন বাজার করার সময় একজনের থেকে আরেকজনের দূরত্ব বেশ ভালো পরিমাণের থাকে। এমন একটা অসহনীয় পরিস্থিতি আমরা মোকাবেলা করছি যা অনেকটা কল্পনারও বাইরে।

আমরা আমাদের পরিবারে একে অপরের সাথে হাসি ঠাট্টা করে যখন সময় কাটাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের মনে কার্যকরভাবে কাজ করছে একটা অজানা ভয়াল আতঙ্ক। সামনে কি হবে আর কি হচ্ছে, সেসবে আমরা ভীত। আমাদের সমাজের নিম্নবিত্ত, বিত্তহীন, দিনমজুর, খেটে খাওয়া আর গৃহহীন মানুষজন রয়েছে সবথেকে বিপদ আর অসহ্য কষ্টকর পরিস্থিতে। রিকশার চাকায় যার সংসার চলতো, সেটি বন্ধ। যে দোকান থেকে পাঁচটি সংসারের অর্থ সংস্থান হতো, তা ভঙ্গুর। যে চায়ের দোকানের উপার্জনে নির্ভরশীল বৃদ্ধা মায়ের ওষুধ কেনার বিষয়াদি, করোনা ভাইরাসের করাল গ্রাসে এখন সেসব অন্ধকার।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের অন্তত ৫৫টি জেলায় শনাক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাস। এক টাঙ্গাইল জেলার করোনা শনাক্ত হয়েছে অন্তত তেরজনের শরীরে, একজন মারাও গেছেন। সবথেকে বেশী সংক্রমিত রাজধানী ঢাকা এবং তার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে।

এদিকে একদিকে মা তার সন্তানের দুধ কেনার জন্য নিজের মাথার চুল বিক্রি করছেন, অন্যদিকে সরকারকে হিমসিম খেতে হচ্ছে চালচোরদের থকে ত্রাণের চাল রক্ষা করার বিষয়ে। সাথে রাষ্ট্রর মাথাতে যেন গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে ধেয়ে আসা মৃত্যুভয় আর অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের যাদুকরী কর্মপন্থা নিরূপণ না করতে পেরে। শুধু রাষ্ট্র বাংলাদেশই নয়, খোদ আমেরিকা কানাডার মত ধনী ও তথ্য প্রযুক্তিতে নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রও দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলেছে এই মহামারী দুর্যোগ দুর্ভোগে। মানুষের প্রাণ আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে রক্ষার সকল দাওয়াই যেন অকার্যকর।

হয়তোবা একদিন ঘর থেকে বের হয়ে করোনাভাইরাসমুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরে একটা নিশ্বাস নিয়ে পারবো, কিন্তু সে পর্যন্ত আমাদের বেঁচে টিকে থাকাই রীতিমতো অসম যুদ্ধ। এই যুদ্ধ যেন পারমাণবিক যুদ্ধ থেকেও নির্মম, করুণ, নিষ্ঠুর। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের সীমিত সম্পদ জাতিগতভাবে আমাদের অচেনা অজানা অনিশ্চিত এক আগামীর পথ দেখাচ্ছে। সেখানে আমাদের ভিন্ন গ্রহে নিয়ে যাওয়ার থেকে এই গ্রহটিই পরিণত হচ্ছে আদিম যুগের সেই অস্পষ্ট বাসস্থানে।

যদিও মানুষের অহংবোধ ভাবতে দিচ্ছে না, মানুষ আজও কতো অসহায় আর নিরস্ত্র। তারা সামান্য একটা ভাইরাসের কাছে পরাজিত হয়ে অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছে তাদের বাবা মা ভাই বোন বন্ধুর প্রাণ। এমনকি তারা তার আত্মজকে সমাহিতও করতে পারছেন না। কেউ মারা গেলে সরকারের বিশেষ নিয়োজিত লোকজন সীমিত আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কোন লোক সমাগম ব্যতিরেকে দাফন করছে। অনেক সময়ই লাশ নেয়ার জন্য আত্মীয়রা আসছেন না। কারো বাবা মারা গেলে সেই সন্তান ঠিকমতো যেমন কাঁদতে পারছে না, তেমনই কবরে গিয়ে তিনমুঠো মাটি দেয়ার ভাগ্যের লিখন ঘটছে না। করোনাভাইরাসের আতঙ্কে চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে সাধারণ চিকিৎসা সেবাও। ইতোমধ্যে আমাদের অনেক চিকিৎসক, নার্স, প্রশাসনের লোকজন আক্রান্ত হয়েছেন এই ভাইরাসে। এ এক বিভীষিকাময় মানব বিপর্যয়।

এখন আমাদের সংসারে ব্যয় করা অশেষ সময়ের অনেকটা সময় জুড়ে থাকে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা, আকুতি, আক্ষেপ। করোনা ভাইরাস থেকে মানুষ পরিত্রাণ চায়। মানুষ ক্ষমায় মুক্তি আশা করে স্বপ্ন দেখে একটি ভালবাসাময় সকালের, যখন তাকে শুনতে হবে না তার ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর সংবাদ।

(সারোয়ার জাহান কলি, সম্পাদক ঘাটাইল ডট কম)/-

রিলেটেড নিউজ

নতুন ৪ জন সহ টাঙ্গাইলে করোনা আক্রান্ত বেড়ে ১৩৫

নতুন ৪ জন সহ টাঙ্গাইলে করোনা আক্রান্ত বেড়ে ১৩৫

টাঙ্গাইলে নতুন করে আরও চারজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৩৫ জনে। জানা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলায় দুজন,...

বিস্তারিত
ঘাটাইলে গাজীপুর ফেরত জুলফিকার করোনা আক্রান্ত

ঘাটাইলে গাজীপুর ফেরত জুলফিকার করোনা আক্রান্ত

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার আনেহলা ইউনিয়নে গাজীপুর ফেরত এক যুবকের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আজ বুধবার (২৮ মে) উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়...

বিস্তারিত
অসহায় মানুষদের জন্য আপনাকে বাঁচতে হবে স্যার

অসহায় মানুষদের জন্য আপনাকে বাঁচতে হবে স্যার

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধের এক কিংবদন্তি যোদ্ধা। রণাঙ্গনে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন অসংখ্য আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধার।...

বিস্তারিত
ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুন, ৫ রোগী নিহত

ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুন, ৫ রোগী নিহত

ঢাকার গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে পাঁচজন মারা গেছেন। তারা সবাই করোনার রোগী ছিলেন। নিহতদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও একজন...

বিস্তারিত

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

Divi Park

পঞ্জিকা

মে 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

Adsense

%d bloggers like this: