কতোটুকু কাজে আসছে হোম কোয়ারেন্টাইন?

করোনাভাইরাস, যার পোশাকি নাম কোভিড-১৯, সেই রোগটিকে এখন বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর আগে ভাইরাসটি বিজ্ঞানীদের অজানা ছিল। ফলে ভাইরাসটি আতঙ্কে পরিনত হয়েছে। এর মধ্যেই চীনে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৮১ হাজার। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ২শ’ ৪৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭০ হাজারেও বেশি। বাকিরা চিকিৎসাধীন। চীনে সংক্রামনের সংখ্যা শূণ্যের কোটায় আসলে প্রকোট আকার ধারণ করেছে ইতালিতে।

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে এরই মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও রেহাই পায়নি। ইতোমধ্যে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাড়িছে ২০। একজনের মৃত্যুও হয়েছে। তবে সুস্থ হয়ে ৪ জন বাড়ি ফেরার সুসংবাদও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটার এর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভাইরাসটি ভয়ঙ্কর হলেও মৃত্যুর হার গড়ে ৩.৬৯ শতাংশ। যা অন্যান্য রোগে মৃত্যুর হারের চেয়ে অনেকটা কম। সচেতন থাকলে এ রোগে আক্রান্ত বা মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেকটাই কম।

করোনা ভাইরাসটির জন্য হোম কোয়ারেন্টাইন ও কোয়ারেন্টাইন শব্দগুলো সাধারন মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসোলেশন, হোম কোয়ারেন্টাইন ও কোয়ারেন্টাইনের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্যও রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে তা ধরা পড়লে তাকে আইসোলেশনে পাঠানো হয়। আইসোলেশনের সময় চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে থাকতে হয় রোগীকে। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সতর্কতার স্বরুপ আইসোলেশন ব্যবস্থা। করোনাভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পরই তার উপসর্গ দেখা দেয় না। অন্তত সপ্তাহখানেক সেটি ঘাপটি মেরে বসে থাকে। তাই কোনও ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে ঘুরে এলে বা রোগীর সংস্পর্শে এলে তার শরীরেও বাসা বাঁধতে পারে কোভিড-১৯। তিনি আক্রান্ত কিনা এটা নিশ্চিত হওয়া মাত্রই কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয় রোগীকে। অন্য রোগীদের কথা ভেবেই কোয়ারেন্টাইন কখনও হাসপাতালে আয়োজন করা হয় না।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে এমন ব্যক্তিকে সরকারি কোয়ারেন্টাইন পয়েন্টে রাখা হয়। এদিকে কোন ব্যক্তি যখন নিজের বাড়িতেই কোয়ারেন্টাইনের সব নিয়ম মেনে, বাইরের লোকজনের সঙ্গে ওঠা-বসা বন্ধ করে আলাদা থাকেন তখন তাকে হোম কোয়ারেন্টাইন বলে।

সম্প্রতি আক্রান্ত দেশ থেকে ঘুরে এলে রোগীকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। এক্ষেত্রেও নূন্যতম ১৪ দিন আলাদা থাকার কথা। কোনও ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে ঘুরে এলে, বা রোগীর সংস্পর্শে এলে তার শরীরেও বাসা বাঁধতে পারে কোভিড-১৯। বাসা আদৌ বেঁধেছে কি না বা সে আক্রান্ত কিনা এটা বুঝে নিতেই এই ব্যবস্থা নিতে হয়।

মুল কথা হচ্ছে হোম কোয়ারেন্টাইন কতোটুকু মানা হচ্ছে? মফস্বল এলাকায় দেখা যাচ্ছে হোম কোয়ারেন্টাইন মানার দিক দিয়ে শূণ্যের কোটায়। মানাটা এতো সহজও না। প্রবাসীরা দেশে এসে স্বজনদের সাথে মিশবে এটাই স্বাভাবিক। দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানকে দুরে রাখাটা আসলেই কষ্টদায়ক। ফলে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা থাকলেও আসলেই কেউই থাকছে না হোম কোয়ারেন্টাইনে।

অধিকাংশ জেলা সিভিল সার্জন দিনের শেষ ভাগে হোম কোয়ারেন্টাইনে কতো হল এর একটি তালিকা নিয়ে প্রেস ব্রিফিং দেন। এরপর তাদের অবস্থা নিয়ে কোন আলোচনা নেই। কেও কেও দেশে ফিরে খোলামেলা ঘুরছে। আবার কেও কেও কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা স্বীকার করলেও অন্তত পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলামেলা মিশছে। সহজেই এটা বোঝা যাচ্ছে।

প্রশাসন পরিদর্শণে গেলেই দেখছে হোম কোয়ারেন্টাইন মানছে না। তখন তাকে জরিমানা করা হচ্ছে। জরিমানার সংবাদ আমরা প্রতিদিন দেখছি। জরিমানায় ততোটা লাভ আসবে না। জরিমানা দেওয়ার পর ফলোআপটা কি?

জরিমানা দিয়ে ভাবছে এরপর আর প্রশাসন তাকে কিছু বলবে না। কারন সে জরিমানা দিয়েছে। প্রশাসনই বা কতোবার যাবে এক বাড়িতে। এদিকে হোম কোয়ারেন্টাইন নামে মাত্র থাকায় হয়ত সে বাড়ির বাইরে বের হচ্ছে না। তবে পরিবারের সদস্য তার সাথে মিশে সমাজের অন্যদের সাথেও মিশছে। এক্ষেত্রে ভাইরাসে যদি আক্রান্তও থাকে তবে প্রত্যক্ষ না ছড়িয়ে পরোক্ষভাবে ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েই গেলো। যদিও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির স্বজনদেরও অন্যদের সাথে মেশা নিষেধ করা হয়েছে তবে ওই ব্যক্তি যখন গণপরিবহনে যায় তাকে সবার না চেনাটাই স্বাভাবিক।

হোম কোয়ারেন্টাইন আশানুরুপ ফলাফলের পরিবর্তে ঝুকির পরিমান বাড়ছে। হোম কোয়ারেন্টাইনে নিজ দায়িত্বে থাকতে হয়। কারও পক্ষেই নিজ দায়িত্বে এমন নিয়ম মান সম্ভব হচ্ছেনা। সরকারিভাবে উপজেলা বা জেলা পর্যায়েও কোন নির্ধারিত জায়গায়ে প্রবাসী ফেরত বা সন্দেহভাজনদের রাখার ব্যবস্থা করলে সবার পক্ষেই নিয়মটা মানা সহজ হতো।

সাধারণ মানুষ আক্রান্তের ঝুঁকি থেকে নিরাপদে থাকতো। দরজা খোলা রেখে জানালা বন্ধ করে ভালো ফলাফল না আসাটাই স্বাভাবিক। যেহেতু ভাইরাসটি দেশে ছিল না। অন্য দেশে আক্রান্তদের মাধ্যমে আমাদের দেশে ডুকছে সেক্ষেত্রে পুরো জাতির স্বার্থে বাংলাদেশে সবকটি এয়ারপোর্টের বিমান ফ্লাইট ও ল্যান্ড করা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখাটা প্রথম মাধ্যম। যদি বিমান বন্ধ করাটা সরকারে পক্ষে কঠিন হয়ে যায় সেক্ষেত্রে বিমান থেকে নামার পর নির্ধারিত গাড়িতে করে নির্ধারিত জায়গায় ১৪ দিন রাখার পর তাদের বাড়িতে পাঠানো দ্বিতীয় উপায়। দুর্বল হোম কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি চালু রেখে করোনা মুক্ত থাকায় নিশ্চিন্তে থাকলে পরে করোনা ঝুকি কমানো দেশের পক্ষেও ঝুকি হয়ে উঠতে পারে। যদিও সরকার সেনাবাহিনীর মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরায় দিয়াবাড়িতে সরকারি কোয়ারেন্টাইন চালু করতে চাচ্ছে সেক্ষেত্রে জাতির স্বার্থে কিছু বিরোধিদের জন্য পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। যেকোনভাবে সরকারিভাবে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা চালু করে পুরো জাতিকে নিরাপত্ত্বা দেওয়াটা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। অনথ্যায় প্রবাসী বা আক্রান্তদের অনিশ্চয়তা হোম কোয়ারেন্টাইনে রেখে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মিলকারখানা, বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখে ততো ভালো ফলাফল আশা করা যায় না।

এর সাথে ইতালিতে আক্রান্তের হার বৃদ্ধির কারন ও চীনে আক্রান্তের সংখ্যার শূণ্যের কোটায় আসায় মাধ্যমকে অনুসরন করাও আমাদের জন্য জরুরী।

১৭২০ সালে প্লেগে এক লাখ মানুষ মারা যায়, ১৮২০ সালে কলেরাতে লাখের ওপরে মানুষ মারা যায়, ১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ (এইচ-১ এন-১ ফ্লুতে) ১০০ মিলিয়নের মতো মানুষ মারা গিয়েছিল। । তখন অত্যাধুনিকা চিকিৎসা ছিল না। এমন কি মানুষও এতোটা সচেতন ছিল না। কিন্তু আধুনিক যুগেও এমন মহামারী আতঙ্কের বিষয়।

(লেখক: রেজাউল করিম, সংবাদকর্মী/ ঘাটাইল ডট কম)/-