কঠিন সাজা সাইবার অপরাধে

কম্পিউটারে সিস্টেম বা ফেসবুক হ্যাকিং করেছেন, অনলাইনে মানহানিকর বা বিভ্রান্তিমূলক কিছু পোস্ট করেছেন, আপনার রেহাই নেই। অপরাধ প্রমাণ হলেই হতে পারে সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। সঙ্গে গুনতে হতে পারে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।

আইনজ্ঞরা বলছেন, সাইবার অপরাধে রয়েছে কঠিন সাজা। ফলে অনলাইন ব্যবহারে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)-এ রয়েছে সাইবার অপরাধের বিচারের বিধান। যদিও এই আইনের একটি ধারা নিয়ে বিতর্কের পর ওই ধারাটি বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে অন্যান্য ধারায় বিচারের সুযোগ রয়েছে সাইবার অপরাধের।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বা অনলাইন গণমাধ্যমে কাউকে নিয়ে মানহানিকর বা বিভ্রান্তিমূলক কিছু পোস্ট করলে, ছবি বা ভিডিও আপলোড করলে, কারও নামে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট দিলে, কোনো স্ট্যাটাস দিলে কিংবা শেয়ার বা লাইক দিলেও সাইবার অপরাধ হতে পারে।

কাউকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে হুমকি দিলে, অশালীন কোনো কিছু পাঠালে কিংবা দেশবিরোধী কোনো কিছু করলে তা সাইবার অপরাধ হবে।

আবার ইলেকট্রনিক মাধ্যম হ্যাক করলে, ভাইরাস ছড়ালে কিংবা কোনো সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ করলে সাইবার অপরাধ হতে পারে। এ ছাড়া অনলাইনে যে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তা-ও সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

যে অপরাধে যে শাস্তি :

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫৪ থেকে ৬৭ নম্বর ধারায় অপরাধের দণ্ড সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আইনের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার বা কম্পিউটার সিস্টেম ইত্যাদির ক্ষতি, অনিষ্ট সাধন যেমন ই-মেইল পাঠানো, ভাইরাস ছড়ানো, সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ বা সিস্টেমের ক্ষতি করা ইত্যাদি অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন সাত বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। আইনের এই বিধান অনুযায়ী উভয় (কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড) প্রদানের বিধানও রয়েছে। আইনের ৫৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটারের সোর্স কোড পরিবর্তন সংক্রান্ত অপরাধের কথা। এখানে বলা হয়েছে, কম্পিউটারের সোর্স কোড পরিবর্তন সংক্রান্ত অপরাধ করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

৫৬ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ক্ষতি করার উদ্দেশে এমন কোনো কাজ করেন, যার ফলে কোনো কম্পিউটার রিসোর্সের কোনো তথ্য বিনাশ, বাতিল বা পরিবর্তিত হয় বা এর উপযোগিতা হ্রাস পায় অথবা কোনো কম্পিউটার, সার্ভার, নেটওয়ার্ক বা কোনো ইলেকট্রনিক সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন, তবে এটি হবে হ্যাকিং অপরাধ, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা।

৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে কোনো মিথ্যা বা অশ্লীল কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয় অথবা রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে এগুলো হবে অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। উভয় (কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড) দণ্ড দেওয়ার বিধানও এই আইনে রয়েছে। উল্লেখ্য, তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের পর এই ধারাটি আইনে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। তবে একই ধরনের একটি ধারা ডিজিটাল নিরাপত্তা নামে নতুন একটি আইনে সংযুক্তির চেষ্টাও চলছে বলে জানা গেছে।

আইনের ৫৮ ধারায় লাইসেন্স সমর্পণে ব্যর্থতার দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। আইনের ৫৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন বা এর বিধি বা প্রবিধান প্রতিপালন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রক, আদেশ দিয়ে বা কোনো সার্টিফিকেট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ বা উহার কোনো কর্মচারীকে আদেশে উল্লিখিত মতে কোনো বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বা কোনো কার্য করা হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দিলে কোনো ব্যক্তি যদি ওই নির্দেশ লঙ্ঘন করেন, তাহা হলে ওই লঙ্ঘন একটি অপরাধ হবে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে এই আইনে।’

আইনের ৬০ নম্বর ধারায় জরুরি পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রকের নির্দেশ অমান্যে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনের ৬১ ধারায় সংরক্ষিত সিস্টেমে প্রবেশের অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনের ৬২ ধারায় সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট প্রাপ্তিতে মিথ্যা প্রতিনিধিত্ব বা তথ্য গোপন সংক্রান্ত অপরাধে।

আইনের ৬৩ ধারায় গোপনীয়তা প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড প্রদানের কথা বলা হয়েছে। ৬৪ ধারায় সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড প্রদানের কথা বলা হয়েছে ভুয়া ইলেকট্র্রনিক স্বাক্ষর সার্টিফিকেট প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধে। ৬৫ ধারায় বলা হয়েছে, প্রতারণার উদ্দেশে ইলেকট্র্রনিক স্বাক্ষর সার্টিফিকেট প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড প্রদানের কথা বলা হয়েছে।

আইনের ৬৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কারও কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে, অপরাধকারী যে দণ্ডে দণ্ডিত হবেন, ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধে সহায়তার জন্য কম্পিউটারের মালিকও সমান সাজা পাবেন। ৬৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি কর্তৃক এই আইনের অধীনে থাকা কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে ওই অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কোম্পানির এমন প্রত্যেক পরিচালক, ম্যানেজার, সচিব, অংশীদার, কর্মকর্তা এবং কর্মচারী উক্ত অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে গণ্য হবে। তবে ওই অপরাধ কোনো ব্যক্তির অজ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়েছে প্রমাণ হলে অথবা ওই ব্যক্তি অপরাধ রোধ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন প্রমাণ হলে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন।’

অনলাইন ব্যবহারে সচেতন থাকার পরামর্শ আইনজ্ঞদের :

আইনজ্ঞরা বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনটির যেমন সুফল রয়েছে, একই সঙ্গে এর কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। তারা বলেন, অসাবধানতাবশত কোনো অপরাধের জন্য কাউকে কঠিন সাজার মুখোমুখি করা সম্ভব এই আইনে। তাই অনলাইন ব্যবহারে সচেতনতার বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, কেউ যদি সাইবার অপরাধের শিকার হন তাহলে এই আইনে প্রতিকার পেতে পারেন। কারও ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হ্যাক হলে, কারও ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হলে তারাও এই আইনে মামলা করতে পারবেন। তিনি বলেন, তবে সব আইনেই কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে, ফলে আইনের অপব্যবহারও হয়। এই আইনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই আইনের আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি সচেতন হওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কেউ সাইবার অপরাধ করলে রেহাই পাবে না। এই আইনে কঠিন সাজার বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, আইনে কিছু শূন্যতার কারণে কেউ চাইলে আইনের অপব্যবহারও করতে পারে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতার বিকল্প নেই বলেও মনে করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

(আরাফাত মুন্না, ঘাটাইল.কম)/-