২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৬ই জুন, ২০২০ ইং

ঐতিহ্য হারাচ্ছে ঘাটাইলের পাকুটিয়া চামড়া বাজার, লোকসানের ভয়ে আতঙ্কিত ব্যবসায়ীরা

আগ ১৮, ২০১৯

টাংগাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়াতে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ চামড়া বাজার হাট। বৃটিশ আমলের পর থেকে অবিভক্ত ভারত পাকিস্তান শাসন আমল থেকেই এই হাটটি পকিস্তানের হাট নামে পরিচিত থাকলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮১ খ্রিঃ থেকে নতুন করে এই হাটের নামকরণ করা হয় পাকুটিয়া চামড়া বাজার। মূলত চামড়া শিল্পকে ঘিরেই এই হাটটি বর্তমানে দেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ চামড়ার বাজার। এবারে সারা দেশব্যাপি চামড়ার মূল্যে ধ্বস নামার প্রভাব এই বাজারেও সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত।

প্রতি সপ্তাহের রোববার ও বুধবার চামড়ার হাট বসে এখানে। চামড়ার পাশাপশি ধান-পাট সহ প্রয়োজনীয় সকল কিছুই পাওয়া যায় এই হাটে। মধুপুর, গোপালপুর ও ঘাটাইল উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে এই হাটটি গড়ে উঠায় সারা দেশের মানুষ এক নামে পাকুটিয়া চামড়া বাজার হিসেবে জানে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর সহ বৃহত্তম ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা থেকে চামড়া বেচা-কেনা করতে আসে এই হাটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টেনারী মালিক, বিভিন্ন কোম্পানীর এজেন্ট, বড়-বড় মহাজন, ঋষি, ফড়িয়া সহ মৌসুমী ব্যববসায়ীদের পদচারনায় লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে এই হাট। বিশেষ করে কোরবানি ঈদের পরে আরও বেশি লোকের সমাগম ঘটে এখানে।

আজ রোববার (১৮ই আগষ্ট) ছিল ঈদ পরবর্তি প্রথম হাট। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হাটের ভিন্ন চিত্র। যে হাটে অন্যান্য বছর কয়েক লাখ চামড়া আমদানী হয় সেখানে এ বছর ৫০ হাজার চামড়াও আমদানী হয়নি। যৎসামান্য যে পরিমাণ চামড়া হাটে উঠেছে সেগুলোও কেনার মত ক্রেতা হাটে আসেননি। এ চিত্র ঐতিহ্যবাহী এই চামড়া হাটের কয়েক বছরের ইতিহাসের সাথে একেবারেই বেমানান।

স্থানীয় বল্লা বাজার, নেত্রকোণা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ থেকে ১০/১২টি কোম্পানীর এজেন্ট, ছোট-খাটো কয়েকটি টেনারীর মালিক ও স্থানীয় কয়েকজন ক্রেতা ছাড়া বড় বড় কোন কোম্পানীর মালিক বা এজেন্টদের চোখে পরেনি এবার। যে কয়েকজন টেনারীর মালিক বা এজেন্ট এসেছেন তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকার এ বছর আমাদের চামড়া কেনার জন্য কোন ব্যাংক লোন দেয়নি। টাকার অভাবে আমরা চামড়া কিনতে পারছিনা।

তারা জানান, সরকার চামড়ার রেট নির্ধারণ করে দিয়েছেন ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় প্রতিবর্গ ফুট চামড়া ক্রয় করতে। স্থানীয়ভাবে চামড়া ক্রয় করতে হবে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা বর্গফুট। কারণ হিসাবে তারা বলেন- এখান থেকে চামড়া ক্রয় করে নিলে প্রতি চামড়া প্রতি আমাদের খরচ হবে আরোও অতিরিক্ত ২০০ টাকা। ট্রান্সপোর্ট খরচ, লবণ খরচ, শ্রমিক খরচ সহ আরোও অন্যান্য খরচ এর সাথে যুক্ত হবে।

মোঃ ইউসুফ হোসেন, এসেছেন ঢাকা কেরানীগঞ্জ থেকে। তার সাথে কথা হয় ঘাটাইলডটকমের। ইউসুফ লেদার কর্পোরেশন নামে তার একটি লেদার ফেক্টরী রয়েছে। তিনি বেছে বেছে মোটা প্রথম শ্রেণীর গরুর চামড়া ক্রয় করতে মৌসুমী ব্যবসায়ীর সাথে দর-দাম মিটাচ্ছেন ও উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে চামড়া দেখছেন। জামালপুর মেলান্দহ থেকে আসা মৌসুমী ব্যবসায়ী জগাই প্রতি চামড়ার দাম হাঁকছেন ১২০০ থেকে ১৪৫০ টাকা। চামড়া দেখাশুনা শেষে ইউসুফ হোসেন দাম বলছেন ৫০০ থেকে ৫৮০ টাকা। বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত চামড়া বিক্রি করতে পারলেন না জগাই।

এ রকম কালাম টেনারীর এজেন্ট আহাম্মদ বাদশা, মঞ্জু টেনারীর এজেন্ট দিন ইসলাম, হক ট্রেডার্সের এজেন্ট মোঃ সাইদুল হক, মাসুদ টেনারীর এজেন্ট ফরিদুজ্জামান, আর.কে লেদার কোম্পানীর এজেন্ট মোঃ মাসুম মিয়া সহ বেশ কিছু এজেন্টদের সাথে কথা বলে জানা যায় খুচরা ব্যবসায়ীরা যে পরিমান দাম চাচ্ছেন তাতে চামড়া কেনা সম্ভব নয়। আমাদের বাজেটের চেয়েও দুই তিন গুণ বেশি দাম চাচ্ছেন তারা।

অপরদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুচরা ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে হাটে এসেছেন। তাদের অভিযোগ আমরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বা স্থানীয়ভাবে যে চামড়া সংগ্রহ করেছি প্রতি পিচ চামড়ার পিছনে আমাদের লবণ, চামড়া ঝিলানো, ট্রান্সর্পোট খরচ, শ্রমিক খরচ, নিজের পারিশ্রমিক সহ আমাদের প্রতি পিচ চামড়া বাজার পর্যন্ত নিয়ে আসতে খরচ হয়েছে অর্থাৎ প্রতি চামড়ায় খরচ পরেছে গড়ে ৭৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা। সেখানে মহাজন ও টেনারী ব্যবসায়ীরা দাম বলছেন ৫০০ টাকা থেকে ৬৮০ টাকা।

ব্যবসায়ীরাঘাটাইল ডটকমকেজানান, আমাদের মতো অনেকেই ২০০ থেকে ৬০০ পিছ করে চামড়া নিয়ে এসেছে। প্রতি চামড়ায় লোকসান  দিতে হবে ৯০ টাকা থেকে ২২০ টাকা। এমন আকাশ-পাতাল তফাৎ হলে চামড়া বিক্রি করবো কিভাবে বলে ঘাটাইলডটকমকে উল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন অনেক ব্যবসায়ী। সারা বছর উপার্জন করতে পারিনা বুকভরা আশা নিয়ে চামড়া বিক্রি করতে এসেছি, কিছু টাকা লাভ করে পরিবার পরিজন নিয়ে ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার আশায়। সেখানে লাভতো দুরের কথা এবারের চামড়ায় আমাদের পথে বসাবে, ভিটে মাটি বিক্রি করে দিতে হবে, না খেয়ে থাকতে হবে।

এক ব্যবসায়ী ক্ষোভের সাথে ঘাটাইলডটকমকে বলেন, মানুষের কাছে ধার দেনা করে সুধে টাকা নিয়ে চামড়া ক্রয় করেছি। এখন যে পরিমাণ টাকা চামড়ায় লোকসান যাবে তাতে আমাদের বেঁচে থাকাও বুঝি সম্ভব হবে না। গলায় দড়ি দিয়ে মরা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমাদের।

বর্তমানে চামড়ার বাজারে সে ধস নেমেছে, এ ব্যাপারে টেনারী মালিক, বিভিন্ন কোম্পানীর এজেন্ট, খুচরা ব্যবসায়ী ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে যে টুকু বুঝা যায় তাহারা একে অপরকে দোষারোপ করছেন। বিশেষ করে সরকার যে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভাবে উদাসীন সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

এ দিকে হাট মালিকরাও বিপাকে পড়েছেন। চাহিদা মত চামড়া আমদানী ও বেঁচা-কেনা না হওয়ায় তাদের কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে। তাদের অভিযোগ চড়া মূল্যে দিয়ে হাট ডেকে আনতে হয়েছে। আর দিন-দিন, মানুষ চামড়া ব্যবসা থেকে যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, তাতে ভবিষ্যতে পাট শিল্পের মতই হাড়িয়ে যাবে চামড়া শিল্প।

ধানের দাম ৯ টাকা কেজি, অপর দিকে চাল কিনতে হচ্ছে ৫৫-৬৫ টাকা কেজি, গরুর চামড়া ১০০-২৫০ টাকা পিচ, ছাগলের চামড়া ৫-১০ টাকা পিচ। অপর দিকে চামড়া দিয়ে যে জুতা তৈরি হচ্ছে তার দাম ৩০০০-৪০০০ টাকা জোড়া। এক কাঠি বেনসন সিগারেটের দাম ১৩ টাকা আর ঈদে খাসীর চামড়া বিক্রি হয়ে ১০ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে চামমড়া শিল্প হারিয়ে যাবে রাতারাতি। আর দেশের সর্ববৃহৎ টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়ার এই চামড়া বাজারটি এক প্রকার হারিয়েই যাচ্ছে, যেটুকু বাকী আছে এবারের ধ্বসে আগামীতে এই হাটের অস্তিত্ত খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এই চামড়া হাটের সাথে সংশ্লিষ্টরা।

(আতিকুর রহমান, ঘাটাইলডটকম)/-

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

Divi Park

পঞ্জিকা

June 2020
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Adsense