এ কোন অচেনা, অজানা ঘাটাইলের হামিদপুর?

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সিমান্তবর্তী কালিহাতী উপজেলা সংলগ্ন এবং কালিহাতী উপজেলার কিয়দাংশ নিয়ে অবস্থিত হামিদপুর বাজার। এই বাজারের চাল ডাল তেলে আমি বেড়ে উঠেছি আতেল হয়ে। আঞ্চলিকভাবে বলা হয়ে থাকে হামিদপুরের হাট হাশরের মাঠ। এই হাশরের মাঠের বিভিন্ন বিষয় আমাকে নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে। এই বাজারের অলিগলিতে আমার পদচারনা ছিল। আমি তৃপ্ত বিমোহিত গর্বিত ছিলাম হামিদপুর নিয়ে।

টাঙ্গাইলের পুরো জেলায় হামিদপুরের নিজস্ব একটা পরিচিতি আছে। কবি সাইয়েদ আতিকুল্লাহ, রফিক আজাদ, ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী, মোফাখখারুল ইসলাম, নাট্যকার মামুনুর রশিদ, শহিদুজ্জামান, ডক্টর এম এ ইউসুফ খান, আওয়ামী লীগ নেতা শামসুর রহমান খান, সাইদুর রহমান খান, সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ, শ্রমিক নেতা হবিবর রহমান খান, গ্রাম্য দ্বন্দ সংঘাত নিরসনে অগ্রনী ভূমিকা পালনকারী সাত্তার মিয়া, মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানী কমান্ডার রাজ্জাক খান, জাসদ নেতা আমিনুল ইসলাম খান সহ অজস্র মহান মানুষের স্মৃতিধন্য আমাদের হামিদপুর।

হামিদপুর হাটে ফরিদ পাগলার দাতের মাজন, ফজলু মিয়ার ফলের টনিক, বিশ্বনাথের সারিবাদি সালসা, হেকিম ফারুকের হারানো যৌবন ফিরে পাবার লেকচার শুনে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় পার করেছি। আমি আজো রোমাঞ্চিত ও পুলকিত হই ফেলে আসা দিন গুনে। আজো কানে ভেসে বেড়ায় চিত্রবানী সিনেমার মাইকিং, চোখের সামনে আরজু সান্দারে ক্যারাম বোর্ড সাদা/কালো ঘুটি।হামিদপুর কালিহাতীকে এক করে দেয়া ঝিনাইপাড়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে গামছা পেতে ছুনু সান্দারের তিন তাস খেলায় কত ঘন্টা দাড়িয়েছি তা বলা মুসকিল। পালপাড়া আমার পছন্দের জায়গা। রাজকুমারদের বাড়িতে কতদিন যে স্কুল ফাকি দিয়ে ঘুর্নায়মান কলসী বানানো দেখেছি তা দুই কান্ধের মুহুরী ছাড়া কেউ জানেনা!

সেই আলো ছায়া ঘেরা, মায়া ভড়া জোসনায় হামিদপুরের স্মৃতি পোটলাবন্দি করে আমি পালিয়ে বেড়াই প্রায় একযুগ। নাড়ীর টানে আকুল হয়ে দু একবার দু’তিন দিন থেকেছিও বটে। কিন্তু হায় হামিদপুর, আমার গ্রাম, আমার স্বজন সবাই যেন বদলেছে!! আমি তো ইহাদের চিনি না। বড় হতাশ হই তাদের আচরণে,তাদের ব্যবহারে??

আমাদের দিঘলকান্দি ইউনিয়নের একটা ঐতিহ্য ছিল, কোন অশিক্ষিত লোক চেয়ারম্যান হতে পারে না। পূর্বে যারা চেয়ারম্যান, মেম্বার নির্বাচিত হতেন তারা ছিলেন ভদ্র, মার্জিত, রুচিশীল সর্বোপরী বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোনো। কিন্তু এখন গত দশ বছর যাবত এরা কারা। সাইদুর রহমান খান মোহন যিনি আমাদের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি একসময় এমপি হয়েছিলেন, খলিলুর রহমান গবা, হাবিবুর রহমান তালুকদার, এনামুল হক ঠান্ডু, শাহিনুর রহমান শাহিন এরা তো সকলেই বিএ পাশ ছিলেন। আমাদের মেম্বার আহমেদ আলী কাগমারী কলেজের ভিপি ছিলেন।

কিন্তু এখন যিনি চেয়ারম্যান আছেন তিনি কোথায় কবে কোন কলেজ থেকে বিএ পাশ করলেন?? অভাবের তাড়নায় যার মা বিষ পানে আত্বহত্যা করেছেন, যার বাবা ছাগল চড়িয়ে হাপানি রোগশোকে ভোগে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যবরন করেছেন, যে ব্যাক্তির আজ থেকে দশ বছর আগে দশ শতাংশ পৈত্রিক জমি ছিল না, তিনি আজ শত শত কোটি টাকার মালিক!! প্রাসাদোপম বাড়ি, ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসা, গার্মেন্টস কত কি?? পুরো নাটশালা নিজ গ্রামকে যিনি ইয়াবা, হিরোইন ও জুয়ার গ্রাম হিসেবে পরিচিতি করেছেন, তিনিই আজ আমাদের ইউনিয়নের সুযোগ্য চেয়ারম্যান! সারাজীবন যৌবন বিএনপির সংগে থেকে আজ হাইব্রিড আওয়ামী লীগ নেতা তিনি।

এসব কাউয়াকে যে হামিদপুর বরণ করে সে হামিদপুর আমার হামিদপুর নয়। যে স্বজন এই কাউয়াদের পক্ষ নেয়, সে আমার স্বজন নয়।

জীবিকার খোঁজে দুমুঠো ভাতের সন্ধানে চাকুরিতে প্রবেশের আগে কিছুদিন সংবাদ পত্রে কাজ করেছিলাম। কালিহাতী প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক ছিলাম। তখন জেনেছিলাম হামিদপুরের উত্তর বেতডোবা গ্রামের ছিচকে চোর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)  তার বাড়িতে জুয়ার বোর্ড বসায়। আমি অনেকবার নিউজ করেছি, কিন্তু জুয়াড়িদের টিকিটিই স্পর্শ করতে পারেনি। এই গংরা তখনই শক্তিশালী চক্রে রুপ নেয়। তারা বর্ষামাসে দুর্গম এলাকার খাল বিলে শ্যালো নৌকায় জুয়ার আসর চালাতো। হামিদপুরের অর্থলোভী হিন্দু সাহা পাড়ায় বিভিন্ন বাসাবাড়িতে আসর বসাতো। জুয়াড়িরা দলে দলে ভাগ হয়ে একদল আওয়ামী লীগ করত তো আরেকদল বিএনপি করতো। এখনও সে অবস্থাতেই রয়েছে। এই তাদের পথচলা।

অঢেল অবৈধ টাকার কারণে মসজিদ বা মন্দিরে মোটা টাকা দান করে ধর্মপ্রান মুসুল্লিদের মন জয় করে সস্তা জনপ্রিয়তা বাগিয়ে নেন। এদের ফাঁদ এতটা সূক্ষ্ম যে আমাদের নেতাকর্মিরা পর্যন্ত ভিমরি খায়।

এই চেয়ারম্যানদের হাত এতটা লম্বা যে টাঙ্গাইল জেলার অন্যতম বানিজ্যক এলাকা হামিদপুর বাজার এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ, ভাংচুর করে অবরুদ্ধ করে রাখলেও প্রশাসন নির্বিকার। মাদক সন্ত্রাস জুয়া সামাজিক এমন কোন অপরাধ অধ্যায় নাই যে যেখানে এদের নাম নাই।

শেষবার যখন বাড়ি যাই দুই বছর আগে, তখন মজনু চাচা আমায় বলেছে, ‘মিয়াভাইয়ের মত ভুল করমু না, পোলাহানরে তোমাগো নেগালা পড়ামু না, তোমরা পইড়া কি করলা, এডা পাক্কা ঘর দিবার পারলা না’।

মজনু চাচা আপনার বাড়ির পোষা গরুর গোবরও কাজে দেয়, কিন্তু আমার বিদ্যা কোন কাজে আসলো না। আমি পরাজিত আপাতত ওইসব ক্ষমতাধরদের অবৈধ টাকার কাছে। আমি হয়তো ফিরব না আর তোমাদের জুয়ার আসরে, মাদক রাজ্যে! তবু মজনু চাচা তোমায় এও বলে রাখি যারা আমার শৈশব কিশোর বেলার হামিদপুর বাজারের ফজলু মিয়ার ফলের টনিক, বিশ্বনাথ অথবা হেকিম ফারুকের লেকচার শুনতে দিল না, তাদের স্বজন হারানো শ্মশানে চিতার আগুন আমি জ্বালাবই।

(রেজা রিমন, ঘাটাইলডটকম)/-