এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই)। ২০১৯ সালের এই দিনে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এই উপলক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাতীয় পার্টি সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পার্টি কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, এরশাদের কবর জিয়ারত, পুষ্প অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া ও আলোচনা সভা।

সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর পল্লী নিবাসে এরশাদের কবর জিয়ারত করবেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জি এম কাদেরসহ পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা। পরে নেতৃবৃন্দ মিলাদ মাহফিল ও মুনাজাতে অংশ নেবেন।

বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানী অফিসে এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

সাবেক সেনাপ্রধান ও রাজনীতিবদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

এরশাদ ১৯৩০ সালের ২০ মার্চ অবিভক্ত ভারতের কোচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পরে তার পরিবার রংপুরে চলে আসেন।

রংপুরেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পেয়ে ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়।

১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। ১৯৯১ সালে এরশাদ গ্রেফতার হন। ১৯৯১ সালে জেলে অভ্যন্তরীণ থাকা অবস্থায় এরশাদ রংপুরের পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন।

১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও এরশাদ সংসদে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি জামিনে মুক্ত হন।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ১০ ও সবশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য হন। তিনি চলতি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা ছিলেন।

“সবশালা, কবি হবে, পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই;

বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই;

হঠাৎ আকাশে ফুঁড়ে তৃতীয় বিশ্বের গঞ্জে গাঁয়ে

হুট করে নেমে আসে জলপাই লেবাস্যা দেবতা;

পায়ে বুট; হাতে রাইফেলের উদ্ধত সঙ্গীন;

এইবার ইনশাআল্লাহ সমস্যার যথাযথ

সমাধান হবে; দীন-গরীবের মিলবে বেহেস্ত;

জলপাই লেবাস্যা দেবতা অবিশ্বাস্য বাণী ঝাড়ে।”

– মোহাম্মদ রফিক / খোলা কবিতা

“… আমরা যারা ৮০ র দশকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে সামিল ছিলাম, তাদের কাছে খুবই পরিচিত এই কবি আর তার এই কবিতা। মনে পড়ে, সেই সময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্মেলন বা নবীন বরণে এই কবি বা তার এই কবিতার উপস্থিতি। এই কবিতার জন্য এই কবিকে সেনাবাহিনীর ৯ম ডিভিশনে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কবির মুখ থেকেই শুনুন, সেই সব আগুনঝরা দিন গুলোতে একজন অঙ্গিকারাবদ্ধ মানুষের কথা –

শিলালিপি : ‘কপিলা’, ‘গাওদিয়া’ নিয়েও অনেক কিছু বলার ছিল। তবে আপনার ‘খোলা কবিতা’ বোধ হয় বেশি পঠিত, আলোড়িত ও আলোচিত। এ কবিতা লেখার জন্য আপনাকে সেনাছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা বলেন।

রফিক : সেটা ১৯৮৩ সালের কথা। আমাকে নিয়ে গিয়েছিল ৯ নম্বর সেক্টর, নবীনগরে। দিনটা মনে করতে পারছি এখন। সেদিন সকালে অতর্কিতে সেনাবাহিনীর গাড়ি থামে আমার বাসার সামনে। সেনাবাহিনীর এক সৈনিক আমার বাসায় এসে বলে, আমাদের অফিসার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমাদের সঙ্গে চলুন।

শিলালিপি : আমরা জানি, সেনাবাহিনীর চারজন অফিসারের সমন্বয়ে একটি বোর্ড আপনাকে সেদিন নানা প্রশ্ন করেছিল। সেদিনের কথা বলুন।

রফিক : সেখানে গিয়ে দেখি ‘খোলা কবিতা’-র একটি কপি তাদের হাতে। সেনাবাহিনীর ওই বোর্ড আমাকে প্রথম প্রশ্ন করে, এটা কি আপনার লেখা। আমি উত্তরে বললাম – হ্যাঁ, আমারই লেখা। তারপর আমার দিকে একে একে ছুড়ে দেওয়া হয় প্রশ্নবাণ। আমি বলি, আপনারা আমাকে যা যা প্রশ্ন করবেন, আমি সঠিক উত্তর দেব। শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর দেব না। সেটা হলো, এই কবিতার প্রকাশক ও বইটি কোথায় থেকে বের হয়েছে তার ঠিকানা বলব না।

শিলালিপি : আপনাকে মারধর করেনি?

রফিক : নাহ!

শিলালিপি : বলেন কী! শুধু প্রশ্ন করেই ছেড়ে দিয়েছে, কিছুই করেনি?

রফিক : একপর্যায়ে তারা একটু চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। আমি তাদের বললাম, দেখুন আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না। এটাই প্রথম নয় যে আমি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়েছি। আমি যখন রাজশাহী কলেজের ইংরেজি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন ‘মার্শাল ল কোর্টে’ আমার বিচার হয়। তাতে কোর্টের প্রধান বিচারক ছিলেন পাকিস্তান আর্মির একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। বিচারে আমার ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। আমাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। এতে বরং আমারই লাভ বেশি, আপনাদের নয়।

শিলালিপি : তারপর কি জেলের ভাত খেলেন পেটভরে। সেনাবাহিনীর ওই বোর্ডের সদস্যরা আর কিছু বলেননি?

রফিক : বেশি দিন খেতে হয়নি। আমি অবশ্য ছাত্র আন্দোলনের কারণে দ্রুত ছাড়া পেয়ে যাই। সেনাবাহিনীর ওই সদস্যদের বলি, আপনারা এবার বড়জোর আমাকে ধরে ১৪ বছর কারাদণ্ড দিতে পারেন। এতে আমারই লাভ, আপনাদের ক্ষতি। একজন অফিসার আমাকে বললেন, কী করে? আমি বললাম, এখন আমি হয়তো আপনাদের জন্য সমস্যা নই। তবে ১৪ বছর কারাদণ্ডের কারণে আমি এতই বিখ্যাত হয়ে যাব স্বদেশে ও বিদেশে, তখন কিন্তু আপনাদের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ সময় আরেকজন অফিসার মাঝখান থেকে বলে বসলেন, আপনি আমাদের ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলেছেন। আমি তাদের বিনীতভাবে বললাম, আপনারা কি শুয়োরের বাচ্চা যে আমি আপনাদের শুয়োরের বাচ্চা বলব। আপনারা ভালোভাবে পড়ে দেখেন, কাদের শুয়োরের বাচ্চা বলা হয়েছে।

শিলালিপি : এরশাদকে নিয়ে কিছু বলেনি?

রফিক : বলবে না আবার, এটাই তো ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য। শেষদিকে এক অফিসার আমাকে বলেন, আপনি আমাদের প্রধানকে ‘শালা’ বলে গালি দিয়েছেন। আমি বললাম, আপনি কেন ধরে নিচ্ছেন যে এখানে শুধু আপনার প্রধানকেই শালা বলা হয়েছে। এই দেশে যার যা করার নয়, তাদের অনেকে তাই করতে চায়। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা ক্ষমতাবলে শিল্প-সাহিত্য করার চেষ্টা করে। আপনাদের প্রধানও শিল্প-সাহিত্য করতে চান। আমি কেন আপনাদের প্রধানকে ঈর্ষা করতে যাব। তবে আপনি বলুন না, এরশাদ সাহেব যা লেখেন, আপনি যদি কোনো পত্রিকার সম্পাদক হতেন, পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় তা কী ছাপতেন। আমার কথায় ভদ্রলোকগোছের ওই অফিসার একটু আনমনা হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর কথাবার্তা একটু ধীর লয়ে চলে। তাঁদের বলেছিলাম, আমি কবিতা লিখি। সুতরাং এ কবিতার জন্য আমাকে যদি দায় বহন করতে হয়, আমার তাতে আপত্তি নেই। আপনারা ইচ্ছা করলে এখনই আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। শাস্তি দিতে পারেন। আমার কথায় বোর্ড নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে। সমাধান খুঁজে না পেয়ে, ঢাকার সঙ্গে একজন যোগাযোগ করতে উঠে গেলেন। ইতিমধ্যে প্রায় বেলা ২টা বেজে গেছে। কিছু সময়ের মধ্যে ওই অফিসার ফিরে এসে বললেন, আপনি এবার যেতে পারেন। তবে আপনাকে প্রয়োজনে আবার ডাকব। আমি আচ্ছা বলে বলে চলে আসি॥”

তথ্যসূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ (শিলালিপি) / ২২-১০-২০১০ইং

Print Friendly, PDF & Email