এরশাদনামা

মারা গেছে স্বৈরাচার, মারা গেলো স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির এক অধ্যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র সামরিক শাসক যিনি স্বাভাবিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র স্বৈরশাসক যিনি ক্ষমতা থেকে প্রবল জনরোষের মুখে বিদায় নিলেও আবার মানুষের ভোটেই সংসদে এসেছেন বারংবার। তাকে বহু মানুষ ঘৃণা করেন তার স্বৈরাচারী শাসনের জন্য, অনেকে ঈর্ষা করেন তার নারী প্রীতির জন্য, অনেকে আবার গালিগালাজ করে তার রাজনৈতিক চতুরতার জন্য।

ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে কারো কাছে তিনি ছিলেন হাস্যরসের পাত্র, কারো কাছে সুবিধাবাদী রাজনীতিক, আবার কারোর কাছে ‘পল্লীবন্ধু’। ১৯৯০ এর গণআন্দোলনের সময় এরশাদকে নিয়েই ‘বিশ্ব বেহায়া’ শিরোনামে বিখ্যাত চিত্রকর্মটি এঁকেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান।

এরকম নানা অভিধায় মানুষ তাকে মনে রেখেছে। নয় বছর দেশ চালিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি প্রায় ছয় বছর জেলে থাকেন এবং জেলে থেকেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে পাঁচটিতেই জিতে প্রমাণ করেন যে তিনি উত্তরবঙ্গের একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী নেতা।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মানে মোহাম্মদ এরশাদ হোসেন ১৯৩০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন কুচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মোহাম্মদ মকবুল হোসেন। ভারতভাগের পর কোচবিহারের দিনহাটা থেকে মোহাম্মদ মকবুল হোসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রংপুর শহরের সেনপাড়ায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মোহাম্মদ এরশাদ হোসেন পরে তার সেনা বিভাগের কমিশন লাভের সময় নাম পরিবর্তন করে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ করেন।

মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম তার ‘বিরোধের প্রথম প্রহর’ বইয়ে লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধে এরশাদের ভূমিকার কথা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এরশাদ পাকিস্তানে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল বাহিনীর প্রধান হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুরে ছিলেন। তিনি যুদ্ধে যোগদান না করে এপ্রিলের প্রথম দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান এবং সপ্তম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক হিসেবে কাজে যোগদান করেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অসুস্থ পিতা মোহাম্মদ মকবুল হোসেনকে দেখার জন্য সেপ্টেম্বরে এরশাদ রংপুর এসেছিলেন। এবারও তিনি যুদ্ধে যোগদান না করে পাকিস্তান ফিরে যান। পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের দেশদ্রোহিতার অভিযোগে পাকিস্তানে বিচার শুরু হলে এরশাদ সেই ট্রাইবুন্যালের চেয়ারম্যান/ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রাণভয়ে এরশাদ বাংলাদেশে ফেরত আসেন এবং চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন।

তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ও কুড়িগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মিয়া একদিন সন্ধ্যায় এরশাদকে পাজামা-পাঞ্জাবি ও একটি মুজিব কোট পরিয়ে তার হয়ে তদবিরের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমার ভাগ্নের চাকরিটা না থাকলে যুদ্ধ করে আমার কি লাভ হলো!!” এ কথা বলার সাথে সাথে এরশাদ শেখ মুজিবের পা ছুঁয়ে সালাম করেন। শেখ মুজিব তাকে চাকরিতে বহাল রাখার নির্দেশ দেন।

১৯৭১ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এরশাদ অনেকটা চুপচাপই ছিলেন৷ জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর এরশাদকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান করা হয়৷ এর কিছুদিনের মাথায় জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন এরশাদকে৷ ১৯৮১ সালে বিপথগামী সেনা সদস্যদের জিয়াউর রহমানকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এরশাদ- যদিও এরকম অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি৷

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এরশাদ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি সাত্তারকে অনেকটা বাধ্য করেন ক্ষমতা ছাড়তে৷ একপর্যায়ে ১৯৮২ সালে এরশাদের কাছে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেন বিচারপতি সাত্তার৷ সামরিক আইন জারি করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ও সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন এরশাদ৷

১৯৮৪ সালে ১৮ দফা ঘোষণা করে বাস্তবায়ন পরিষদ তৈরি করেন তিনি৷ সেবছরই সিনিয়র রাজনীতিকদের নিয়ে গঠন করেন ‘জনদল’৷ কিছুদিন পর ‘জনদল’ পরিবর্তন করে তৈরি করেন বর্তমানের জাতীয় পার্টি৷

১৯৮৬ সালের পাতানো নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়৷ বিরোধী দল হয় আওয়ামী লীগ৷ ১৯৮৮ সালে ওই সংসদ ভেঙে দিয়ে আবারও নির্বাচন দেন এরশাদ৷ কোনো দল ওই নির্বাচনে অংশ না নিলে অনুগত বিরোধী দল বানান আ স ম আবদুর রবকে৷ এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করে এরশাদের বিরুদ্ধে৷

নয় বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ৷ তারপরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জেল থেকে অংশগ্রহণ করে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন সাবেক সামরিক শাসক এরশাদ।

১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ৷ ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপিসহ অন্যান্য অনেক দল বয়কট করলে এরশাদের জাতীয় পার্টি হয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল। এরশাদ হন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আর ২০১৮ এর নির্বাচনের পরে তিনি হন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। যদিও অনেকে একে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ বলেও কটাক্ষ করেন।

এরশাদের সবই কি খারাপ ছিলো? দেশের ওষুধনীতি তার সময়েই করা। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনে উপজেলা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। ৪৬০ থানাকে উপজেলায় উন্নীত করেন তিনি, জাতীয় প্রেস কমিশন গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, জাতীয় ঈদগাহ নির্মাণ, তিন জাতীয় নেতার মাজারের নির্মাণ কাজ, ঢাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ আরো অনেক কিছুই তিনি করেছেন ক্ষমতায় থাকাকালে। আজকের তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তারেও ছিলো তার অবদান।

এরশাদের সময়েই ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক, যা বর্তমানে প্রায় অকার্যকর।

আবার তিনি নিন্দিত হয়েছেন নানান কাজের জন্য। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার মধ্য দিয়ে সংবিধানের মূল চেতনায় আঘাত হানেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের ফলে অন্য ধর্মের লোকজনকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেন এই শাসক। তিনি ক্ষমতায় এসে শুক্রবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। আবার ঢাকা শহরের বিভিন্ন খাল ভরাট করে কালভার্ট নির্মাণ করেন তিনি যার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই ঢাকা শহর পানিতে তলিয়ে যায়।

অন্যান্য সামরিক শাসকদের মতো তার হাতও ছিলো মানুষের রক্তে রঞ্জিত। ১৯৮৩ সালে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে গুলি চালানো হলে প্রাণ হারান জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহাসহ বেশ কয়েকজন। তারপরের বছরই ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করে সেলিম-দেলোয়ারকে।

ডা. মিলন, নুর হোসেনসহ অনেকের রক্তে রঞ্জিত হয় এরশাদের হাত।

১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি এরশাদের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে মোট ৪৩টি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। এর তিনটিতে নিম্ন আদালতে তার সাজার আদেশ হলেও হাইকোর্টে একটিতে খালাস পান। বাকি দুই মামলায় তিনি সাজা খাটা শেষ করেন।

কিন্তু, ৩৮ বছর আগে সেনাবাহিনীর মেজর মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এরশাদের গলার কাঁটা হয়েই ছিলো। বাকি সব মামলা থেকে এরশাদ একে একে মুক্ত হলেও মঞ্জুর হত্যা মামলা এরশাদকে আটকে রেখেছিলো রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে। জোট আর ভোটের রাজনীতিতে এরশাদকে ‘বশে রাখতে’ এ মামলাটিকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ ছিলো জাতীয় পার্টির নেতাদের। আর এ কারণেই কী না তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাজনীতিতে আনপ্রেডিক্টেবল।

বন্দুকের নলের জোরে তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবন থেকে বিদায় করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন; দেশের সংবিধান স্থগিত করে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন; চার বছরের বেশি সময় সংবিধান স্থগিত রেখে নিজের তৈরি করা সামরিক আদেশ বলে খেয়াল-খুশিমতো দেশ চালিয়েছেন। সংবিধানের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলেও পরবর্তী আরও চার বছরের বেশি সময় তিনি দেশে স্বৈরতন্ত্র বহাল রেখেছিলেন। দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছেন। রাজনীতিকে করেছেন দুর্নীতির আখড়া। নির্বাচনকে পাঠিয়েছিলেন নির্বাসনে।

রাষ্ট্রপতি থাকাকালে পাওয়া উপহার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে আর্থিক অনিয়মের মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত এরশাদকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়। দুই যুগ পর হাইকোর্ট সেই সাজা বাতিল করে এরশাদকে খালাস দেন।

জাপানি নৌযান কেনায় অনিয়মের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এরশাদের প্রথমে তিনবছর এবং পরে হাইকোর্টে আপিলে সাজা কমে দুই বছরের কারাদণ্ড হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুই বছর কারাগারে কাটানোয় এরশাদকে নতুন করে আর ওই মামলায় দণ্ড ভোগ করতে হয়নি।

জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালত এরশাদকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলো। প্রায় ১৭ বছর পর হাইকোর্ট সাজা কমিয়ে এরশাদকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা করে।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল চলাকালে এরশাদের সাড়ে ৩ বছর কারাভোগ শেষ হওয়ায় আপিল বিভাগ পরে জরিমানার দণ্ড বহাল রেখে এরশাদকে অবশিষ্ট দেড় বছর সাজাভোগ থেকে অব্যাহতি দেয়।

এছাড়া স্বর্ণ চোরাচালান, টেলিকম দুর্নীতি, পোল্ট্রি ফার্ম দুর্নীতি মামলা, আয়কর ফাঁকি, জাহাজ কেনায় দুর্নীতি, রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, হরিপুরে তেল অনুসন্ধানে দুর্নীতি এবং রাডার কেনায় দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও ১৯টি মামলা ছিলো এরশাদের বিরুদ্ধে।

এর মধ্যে কয়েকটিতে তিনি নিম্ন আদালত থেকে বেকসুর খালাস পান। কয়েকটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একের পর এক বিদেশ সফর নিয়েও সমালোচিত ছিলেন এরশাদ। তাই তাকে বলা হতো গরিব দেশের ধনী রাষ্ট্রপতি।

গুজব আছে কবি এরশাদের কবিতা নাকি দেশের বিখ্যাত কবিরা লিখে দিতেন। তার লেখা গান গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোরসহ অনেকেই।

এরশাদের জীবনে নারী বিতর্ক সারাজীবনই ছিলো। এ তালিকায় রয়েছে মেরী, জিনাত মোশাররফ, রওশন, বিদিশাসহ আরো অনেকের নাম। তবে এরশাদ এসব নিয়ে খুব একটা রাখঢাক করতেন না। তিনি বলতেন, “তিনি নারীদের কাছে যান না, নারীরাই তার কাছে আসেন।”

এরশাদ তার নারী প্রীতি, কবিতা প্রীতি, ইসলাম প্রীতিসহ আরো বহু কাজের জন্য নন্দিত, নিন্দিত হয়ে থাকবেন মানুষের মনে। সারাজীবন নিজেকে রহস্যময় রাখতে পছন্দ করতেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এরশাদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিলো অস্পষ্ট- না সরকারে, না বিরোধী দল। এমন একটা ধোঁয়াশার মধ্যে দলকে রেখে তিনি বিদায় নিলেন। বিদায় নিলেন রাজনীতির নাটকীয় মঞ্চ থেকেও।

(মোহাম্মদ আল-মাসুম মোল্লা, ঘাটাইলডটকম)/-