এতিম মিসকিনের হক কেঁড়ে নিল সিন্ডিকেট, ঠকবাজ ও প্রতারকরা

টাংগাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়াতে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ চামড়া বাজার। ১৯৮১ খ্রিঃ গড়ে উঠা এই হাটটি এখনো অত্র অঞ্চলের সর্ববৃহৎ হাট হিসাবে পরিচিত। প্রতি সপ্তাহের রবিবার ও বুধবার চামড়ার হাট বসে এখানে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ কেরানীগঞ্জ, বৃহত্তম ঢাকা বিভাগ ও ময়মনসিংহ বিভাগের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা থেকেই ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচা কেনা করতে আসেন এই হাটে।

হাটের আগের দিন রাতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চলে আসেন টেনায়ী মালিক, মহাজন, ঋষি, ফড়িয়া থেকে শুরু করে ছোট খাটো মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। ভোর থেকে মধ্যেরাত পর্যন্ত চলে চামড়া বেঁচা কেনা। স্থানীয় তিন শতাধিক লোক জন সপ্তাহে ২ দিন শ্রম বিক্রি করে চালান তাদের সংসার। ঈদ আসলেই তাদের ব্যাস্ততা যেমন বেড়ে যায়, তেমনি বাড়তি ইনকাম করে পরিবার পরিজন নিয়ে সারা বছর ভালভাবে চলতে পারবে এমন আশাতে বুক বেঁধে সারা বছর ঈদের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু এতিম, গরীব দুখি মানুষের মতই শ্রমজীবি মানুষগুলোর সেই আশাগুলো আজ এবার দুরাশায় পরিণত হয়েছে। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে এবারের ঈদ তাদের জন্য অভিষাপ হয়ে এসেছে।

মাবনসৃষ্ট এই অভিষাপ এক দিকে যেমন এতিম, অসহায় গরীব দুখি মানুষের পেটে লাথি দিয়েছে অপর দিকে শ্রমজীবি মানুষ গুলোও পরিবার পরিজন নিয়ে সারা বছর কিভাবে চলবেন এমন ভাবনা ও দুঃচিন্তায় তাদের মাঝে চরম হতাশা নেমে এসেছে। সারা দেশের ন্যায়  টাংগাইলেও এর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ঘাটাইল উপজেলায় দেশের সর্ববৃহৎ চামড়া হাট থাকায় সরেজমিনে ঘুরে কঠিন বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

ঘাটাইলের ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা ঘুরে দেখা যায় যাদের কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য আছে তারা অনেকেই একা, কেউ সামাজিকভাবে ভাগাভাগি করে কোরবানী করেছেন। আলাদা-আলাদা ভাবে ৬ থেকে ১০-১২ জন করে এক জায়গায় বসে গোল হয়ে কোরবানির গোস্ত-কাটা কাটি ও ভাগ বাটোয়ারা উৎসাহের সাথে উৎসব মুখর পরিবেশে বিরামহীন ভাবে করে যাচ্ছেন। এ সব কাজে কোন ক্লান্তি বা বিরক্তি না থাকলেও-চামড়া বিক্রির সময় তারা বিরক্ত, হতভম্ব ও রাগান্তিত হয়েছেন।

জানা যায়,  এক লক্ষ টাকা দিয়ে গরু ক্রয় করে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে ৬০ থেকে একশত টাকায়। এক লক্ষ টাকার উপড়ের গরুর চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে ১৫০-৩০০ টাকায়, ছাগলের চামড়া ১০ টাকায়।

এতে অনেকেই রাগে ও দুঃখে চামড়া বিক্রি না করে মাটির নিচে পুতে ফেলেছেন।

খুচরা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পাড়া, মহল্লা ও গ্রামে গ্রামে ঘুরে এসব চামড়া নাম মাত্র মূল্যে ক্রয় করে ভ্যান, অটো, ছোট ছোট পিকআপ ও ট্রাক যুগে অধিক মুনাফা লাভের আশায় কাঁচা চামড়া নিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন ঘাটাইলের পাকুটিয়া চামড়া বাজারে। সেখানে এসে ঘটছে বিপত্তি। মৌসুমী ব্যবসায়ীরা যখন বড় বড় চামড়া এক জায়গায় ট্যাক করে রেখে ক্রেতার অপেক্ষা করতে থাকেন তখন বিভিন্ন কোম্পানীর এজেন্ট, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চামড়া সিন্ডিকেটের সাথে যাহারা জরিত তাহারা কোমড় বেধে ঝাপিড়ে পড়েন পানির দামে চামড়া ক্রয় করার জন্য।

মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখাচ্ছেন আর এসব সিন্ডিকেটের লোকেরা বিড়ালের মত কাটা বেছে বেছে ১০-১২টি করে চামড়া ক্রয় করা শুরু করছেন। বড় বড় চামড়া ২৫০-৪৫০ টাকায় সর্বোচ্চ ক্রয় করছেন তারা। অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট চামড়া, কাফা, বাদ কাফা চামড়া কেনা বন্ধ করে দেন। এসব চামড়া নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়ে গেছেন। মাথায় হাত দিয়ে আর চোখের জ্বলে গামছা ভিজিয়ে এসব চামড়া ফেলে দিয়ে রাতের অন্ধকারে বাধ্য হয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই আবার ৫০-৬০টাকা এসব চামড়া বিক্রি করে দেন। ছাগলের চামড়া পুরোটাই ফেলে দেন।

পাকুটিয়া চামড়া আড়তে গিয়ে দেখা যায় কমদামে কেনা এই চামড়া গুলো স্থানীয় কিছু শ্রমিক লবণ দিয়ে গুদামজাত করছেন। আগামী হাটে এসব চামড়া বিক্রি করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জন স্থায়ী সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা জানান আগামী হাটে বড় বড় কোম্পানির টেনারি মালিকরা আসবেন তাদের কাছে এসব চামড়া বিক্রি হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় এসব সিন্ডিকেটের এই চক্রটি বছর জুড়ে টেনারির মালিকের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে এসব অপকর্ম করে বেড়ান। ঈদ আসলে তাহারা বিভিন্ন অযুহাতে গরীবের পেটে লাথি দিয়ে অত্যান্ত শো কৌশলে টাকার বিনিময়ে তারা এ কাজটি করে থাকেন। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলে মানুষ ঠকিয়ে এ কাজ গুলো করে থাকে।

তাদের ভাষায় চামড়ার দাম কম হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে টেনারির মালিকরা এবছর চামড়া কেনার জন্য আমাদের কোন টাকা পয়সা দেয়নি। পূর্বেও তাদের কাছে আমাদের লক্ষ লক্ষ টাকা পড়ে আছেন। কাঁচা চামড়া অল্প টাকায় ক্রয় করলেও শ্রমিক খরচ, লবণ খরচ, ট্রার্সপোর্ট খরচ, হাটের খাজনা খরচ বাবদ প্রতিটি কাঁচা চামড়ার পিছনে আমাদের ২০০-২৫০ টাকার মত খরচ হয়। আমাদের কি করার থাকে।

আবার অনেক চামড়া ব্যবসায়ী আছেন যারা টাকার অভাবে এ বছর চামড়া ক্রয় করতে পারেনি তাদের অভিযোগ রাজনৈতিক ও দলীয় করনের কারণে চামড়া শিল্পের এমন ধস নেমে এসেছে। তারা বলেন সরকার তৈলের মাথায় আরোও বেশি বেশি তৈল দিচ্ছেন, ন্যাড়া মাথায় বেল ভাঙ্গার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। আর এই সুযোগে সরকার দলিয় কিছু নামধারী ব্যবসায়ী গরীবের পেটে লাথি দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন।

তাদের অভিযোগ আমাদের দেশ থেকে এসব চামড়া নাম মাত্র মূল্যে ক্রয় করে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করে দিচ্ছেন। আর আমার দেশের মানুষ দিন দিন আরো গরীব ও নিঃশ্ব হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে এতিম মিসকিন ও গরীব মানুষের হক না হক করে তারা কোটি কোটি টাকা মালিক হচ্ছেন।

পাকুটিয়া চামড়া হাট মালিক আব্দুল কাদের খান ঘাটাইলডটকমকে জানান, অধিক মূল্য দিয়ে এবারের হাট ডেকে এনেছি। আশা করি এবারের ঈদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে চামড়া আমদানী হবে। প্রতিটি চামড়া থেকে আমাদের ১০ টাকা কমিশন দিতে হয়। আশা করি এবার আমরা ভালো টাকা ইনকাম করতে পারবো। তবে এবারে চামড়ার দাম কম থাকায় এর প্রভাব পড়তে বাধ্য।

(আতিকুর রহমান, ঘাটাইলডটকম)/-