একজন প্রকৃত যোদ্ধা হামিদুল হক বীরপ্রতীক

৪ এপ্রিল বুধবার ছিল মায়ের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। মা ছাড়া জীবন অন্ধকার। অন্য দিনগুলো তবু নানাভাবে কিছুটা ভুলে থাকা যায়। কিন্তু চলে যাওয়ার নির্দিষ্ট দিন যখন আসে তখন শত চেষ্টা করেও বুকের ভিতর পাথরচাপা ব্যথা ভুলতে পারি না। স্ত্রীকে নিয়ে মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই গ্রামের বাড়ি ছাতিহাটি গিয়েছিলাম। ছোটবোন সেলিনা সিদ্দিকী শুশু বহু বছর পর গ্রামের বাড়িতে ঘর করেছে। গিয়ে বসেছিলাম ওর নতুন ঘরে। শরীর খারাপ থাকায় ঠিক সময় যেতে পারিনি। তবু দেখা হয়েছে। নামাজ শেষে দোয়া মাহফিল করে রাতেই ঢাকায় ফিরেছিলাম। কারণ পরদিন ছিল কুশিমণির পরীক্ষা। ফেরার পথে সোহেলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, হামিদুল হক বীরপ্রতীক কেমন আছেন। দুই দিন আগে তাকে মৌচাকে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে দেখতে গিয়েছিলাম। হামিদুল হক ছিলেন ১৪ তলায়। আগের রাতে কয়েকবার বমি করায় আইসিওতে আনা হয়েছিল। আমি যখন যাই তখন লাইফ সাপোর্টের কাটাছেঁড়া চলছিল। হাসপাতালের লোকজন তাকে যথেষ্ট আদরযত্ন ও গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাকে চিনতে পারেন কিনা, বুঝতে পারেন কিনা সেজন্য জুনিয়র ডাক্তার যেভাবে বাবা বাবা বলে নাড়া দিচ্ছিল প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম হামিদুল হকের কোনো বেটা-ভাইস্তা। হামিদুল হক বেশ কয়েকবার চোখ খুলেছিলেন। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারেননি। খুবই ক্লান্ত ছিলেন।

ইনটেনসিভ কেয়ারের ইনচার্জ অধ্যাপক এম এ মান্নান তাঁর ঘরে বসিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন এবং আপ্যায়ন করেছিলেন। সেই সময় চট্টগ্রামের জুনিয়র ডাক্তার তৌফিক এলে তাকে আমার খুবই ভালো লেগেছে। আমি যখন দেখেছিলাম আশা করার মতো অবস্থা ছিল না। তাই সোহেলকে খবর নিতে বলেছিলাম। সে খবর নিয়ে বলেছিল, তেমন ভালো না। আমারও বুকটা কেমন যেন খুঁতখুঁত করছিল।

ঘুম থেকে উঠে কেবলই বারান্দায় বসেছি। হন্তদন্ত হয়ে বেগম বলল, হামিদুল হক সকালের দিকে মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বুকের ভিতর কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠল। চলে যাবেন জানতাম। কিন্তু খবরটা তখনই শুনব সেভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। এরপর ফোন আসতে থাকে। একের পর এক। প্রথমে সোহেলের ফোন, তারপর শামীম, লাল মিয়া, উপজেলা চেয়ারম্যান শওকত শিকদারের। আসলে ও রকম সময়ে কারও মাথা ঠিক থাকে না। কেউ বুঝে বলে, কেউ শুনে, কেউ বা না বুঝেই।

লাল মিয়া বলল, বাদ জোহর কচুয়ায় জানাজা হবে। একটু পর শওকত শিকদারের ফোন, ‘স্যার, হামিদুল হক সাহেব মারা গেছেন। বাদ জোহর উপজেলা মাঠে জানাজার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

শওকতকে বলেছিলাম, উপজেলা মাঠে কেন, পাইলট স্কুল মাঠে কর। শওকত বলেছিল, পাইলট স্কুল মাঠ একটু ছোট। বলেছিলাম, তা হোক। এখন তো মানুষের মন আরও ছোট। শওকতকে আগাগোড়াই অত্যন্ত স্নেহের চোখে দেখি। এমনিতে সে অতিসাবলীল ভদ্র। পাইলট স্কুল মাঠেই হামিদুল হকের জানাজা হয়েছে। উপজেলা মাঠের পরিবর্তে পাইলট স্কুলের মাঠ বলার কারণ ওই মাঠ থেকেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

২০ জানুয়ারি ২০১৪ শওকত মোমেন শাজাহানের উপজেলা মাঠে জানাজা আমার পছন্দ ছিল না। পাইলট স্কুল মাঠে হলে ভালো হতো। কে কার কথা শোনে। উপজেলা মাঠেই জানাজা হয়েছিল।

শাজাহানের জানাজায় বলেছিলাম, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শওকত মোমেন শাজাহানের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। তাই আমি তাকে মাফ করে দিলাম। যে কারণে তার কোনো ভুলত্রুটি অন্যায় এখন আর বলতে যাই না। চোখে কাঁটার মতো বিঁধলেও তেমন কিছু বলি না। কালমেঘায় পিলখানার দলছুট কিছু ইপিআর আশ্রয় নিয়েছিল। কুতুবউদ্দিনের সহায়তায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু যখন আমরা যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে সখীপুর পাইলট স্কুলে, তখন খবর পেলাম তারা চলে গেছে। কোথায়? পূর্ব-উত্তরে আঙ্গারগারার দিকে।

শওকত মোমেন শাজাহান, খোরশেদ আলম, মনিরুল ইসলামকে নিয়ে ছুটলাম আঙ্গারগারা। কচুয়ায় পেলাম হামিদুল হককে। ছিলাম চারজন, হলাম পাঁচজন। আঙ্গারগারা গিয়ে শুনলাম তারা মল্লিকবাড়ির দিকে গেছে। গেলাম মল্লিকবাড়ি, পেলাম না। সেখান থেকে তারা পূর্ব-দক্ষিণে কাওরাইতের পথ ধরেছে। আবার সেদিকে রওনা হলাম। রাত তখন প্রায় ১২টা। কেউ কেউ বলল, আফসার মেম্বার নামে এক বয়সী ভদ্রলোক কিছু বলতে পারবেন। তাকে খুঁজে পেলাম না। বলে এলাম সাত দিনের মধ্যে সে যেন আমার সঙ্গে দেখা করে। ১০ দিনের মধ্যে সে কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। আর পূর্ব-উত্তর-দক্ষিণে ছোটাছুটি না করে পশ্চিমে সখীপুরের দিকে এগোলাম। এতক্ষণ অস্ত্র পাওয়ার আশা ছিল, ছিল যুদ্ধের নেশা, এখন নেশা-আশা কিছুই নেই। পা চলে না, চোখে জ্বালা। ওভাবেই হাঁটতে হাঁটতে এক বাড়িতে উঠলাম। আড়াইপাড়া থেকে আড়াই-তিন মাইল দূরে শুনলাম শওকত মোমেন শাজাহানের দূর সম্পর্কের কোনো দুলাভাইয়ের বাড়ি। খাবার চাইতেই তারা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আলু ভাজি-ডাল ভাত খাওয়ালেন। তখনো ঘণ্টা দুই রাত ছিল। কেউ ঘুমালাম কেউ জেগে রইলাম। সকালেই আবার ছুটলাম রেখে আসা সহকর্মীদের কাছে। রাস্তায় দেখা পেলাম আবু হানিফের। সে শুনে এসেছে বাসাইল থেকে হানাদাররা আসছে। সখীপুর না গিয়ে আড়াইপাড়ায় একত্র হলাম। সেখানেই জানলাম আঙ্গারগারা পরশুরাম মেম্বারের বাড়িতে ইপিআররা সব অস্ত্র মাটিচাপা দিয়ে গেছে। সে দলের তিন-চার জন আশপাশে ঘোরাফেরা করছে।

খুঁজতে পাঠানো হলো হামিদুল হক, শওকত মোমেন শাজাহান আর খোরশেদ আলমকে। সাবদুল, রাজ্জাক সিদ্দিকী আর আবদুল মালেককে নিয়ে হামিদুল হক হাজির। এর পরের ঘটনা আরও চমকপ্রদ।

তারা রাতেই পরশুরাম মেম্বারের বাড়ি থেকে অস্ত্র নিয়ে এল। ধুমখালীর ছালাম ফকিরের নেতৃত্বে তার বাড়ির আশপাশে লুকিয়ে রাখা হলো। পরদিন বিকালে পাইলট স্কুল মাঠ থেকে বেছে বেছে ৪০ জন যোদ্ধা নেওয়া হলো। আগে পেয়েছিলাম আবু হানিফ, নুরে আজম ও আবদুল মোতালেব গুরখাকে, সেদিন পেলাম আবদুল হালিম, মকবুল হোসেনসহ আরও কয়েকজনকে। যারা মুক্তিযুদ্ধকে আলোকিত করেছিল। কাদেরিয়া বাহিনীর সাফল্যে শীর্ষ ভূমিকা রেখেছে। ধীরে ধীরে কাদেরিয়া বাহিনী প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন আর ভালোবাসায় এক মহীরুহে পরিণত হয়ে গেল। বহেড়াতলীতে শপথ নিলাম। পরদিন বল্লা যুদ্ধে জয়ী হলাম। অসংখ্য যোদ্ধা কোম্পানিতে কোম্পানিতে ভাগ করা হলো।

কিছুদিনের জন্য আমি গেলাম পশ্চিমাঞ্চলে গোপালপুর, ভূঞাপুর আরও পশ্চিমে বেলকুচি-বেতিল-সোহাগপুর। এক সপ্তাহ-দশ দিন পর ফিরে এসে দেখি অভাবনীয় সব কারবার। আমি আন্ধিতে হেডকোয়ার্টার করেছিলাম। খোরশেদ আলম আর ও, হামিদুল হক আর শওকত মোমেন শাজাহান মিলে তার আরও ব্যাপক সম্প্রসারণ করেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা, গরিব মানুষদের খোঁজখবর, যুদ্ধাহত এবং সাধারণ মানুষের অসুখ-বিসুখের চিকিৎসা নিয়ে শুধু আলাপ করেছিলাম। সেই আলাপ প্রায় বাস্তব রূপ দিয়ে ফেলেছে বীর সাথীরা। যা করা খুব সহজ ছিল না। বলতে গেলে প্রায় অসম্ভব ছিল। সেই অসম্ভবকেই অনেকটা সম্ভবের কাছাকাছি করে ফেলেছিল পাহাড়ের বন্ধুরা। তাদের কায়কারবার দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। শুরু থেকেই কমান্ডার ইদ্রিস, আবদুস সবুর খান, মনিরুল ইসলাম, সাইদুর, আবদুল মালেক, মোতালেব গুরখা, আবু হানিফ আজাদ ছিল প্রত্যক্ষ যোদ্ধা। হামিদুল হক, স ম আলী আজগর, আমজাদ মাস্টার, শওকত মোমেন শাজাহান, কবি রফিক আজাদ, মাহাবুব সাদিক, সায্যাদ কাদির, বুলবুল খান মাহাবুব, অধ্যাপক কাজী আতোয়ার, বাছেত সিদ্দিকী এমপি, আওয়াল সিদ্দিকী, খোরশেদ আলম, নয়া মুন্সী ছিল যুদ্ধের সহযোগী; কেউ কেউ পরিচালনাকারী। কেউ ১৫ দিন আগে, কেউ কেউ এক মাস পরে কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দিলেও যোগদানের পরপরই তারা বাহিনীর সঙ্গে লতায়পাতায় অন্তরাত্মায় মিশে যেত। আনোয়ারুল আলম শহীদ কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন মাস দেড়েক পরে। সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে আরও দিন পনেরো লেগেছিল।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর তার ভূমিকা যাই হোক, কাদেরিয়া বাহিনী থেকে রক্ষীবাহিনীর পরিচালক নিযুক্তি পর্যন্ত কোনো ত্রুটি ছিল না। আনোয়ারুল আলম শহীদের সহকারী ছিলেন হামিদুল হক। কতটা দক্ষ-যোগ্য-নিবেদিত হলে বেসামরিক প্রধান বীরত্বসূচক খেতাব পাননি, সহকারী পেয়েছেন। আমাদের সঙ্গে এমপি বাছেত সিদ্দিকী ছিলেন। এমপি হওয়ার পরও তার নামে খেতাবের সুপারিশ করা হয়নি, যা হয়েছিল হামিদুল হকের নামে। আরও অনেক যোদ্ধার নামে সুপারিশ করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক খেতাব নিয়ে যে টানাহেঁচড়া হয়েছে, আগে জানলে খেতাবের জন্য কোনো সুপারিশ করতাম না। দু-তিন হাজার পাকিস্তানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত সাড়ে ছয় শ খেতাবের ছয় শই নিয়ে নিয়েছে। এসব কারণে ভাবীকাল মুক্তিযুদ্ধকে একটা জনযুদ্ধ মনে নাও করতে পারে।

শুধু হামিদুল হককে নিয়ে পরে লিখব। তবু যুদ্ধের একেবারে শেষের দিকের একটা ঘটনা উল্লেখ করছি। সেটা ছিল নভেম্বরের শেষ দিকের ঘটনা। আমি অক্টোবরে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছি। কাদেরিয়া বাহিনীর আক্রমণ ক্ষুরধার হয়েছে। ইতিমধ্যে ঈদুল ফিতরের দিন ঢাকার কালিয়াকৈর থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুর পর্যন্ত প্রায় ৭০ মাইল মহাসড়কের ২৫-৩০টি ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানিদের স্তম্ভিত করে দেওয়া হয়েছে। তারা কখনো ভাবতেও পারেনি অত শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী তাদের নাকের ডগায় কামান নিয়ে বসে আছে। সালাম ফকিরের বাড়ি ধুমখালীতে তখন হেডকোয়ার্টার। ভাঙা ঘরে যুদ্ধকালীন অফিসের কাজকর্ম দেখলে অনেকের জেনারেল রোমেলের কথা মনে পড়বে। দুই বা তিন দিন আগে সামাদ গামা দুটি খাসির ১৭-১৮ সের মাংস খেয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। কাউলজানীর খাঁ বা ভূইয়াদের একাই ১০-১২ সেরের খাসি খাওয়া নিয়ে প্রবাদ ছিল। কিন্তু সে প্রবাদকেও সামাদ গামা পিছে ফেলে দিয়েছে। আমি হেডকোয়ার্টার ছেড়ে নাগরপুর এসেছি। হেডকোয়ার্টারের পুরো দায়িত্ব তখন হামিদুল হকের। কারণ, বেসামরিক প্রধান আনোয়ারুল আলম শহীদ মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ভারতে গেছে। শুরু থেকে যে আমার একমাত্র সঙ্গী সেই ফারুক আহমেদ, সৈয়দ নুরু, ডা. শাহাজাদা চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম তার সঙ্গে গেছে। তাই সদর দফতরে হামিদুল হক আর বাছেত সিদ্দিকীই বল-ভরসা। সে সময় হঠাৎ পাকিস্তান হানাদারদের আচমকা আক্রমণে পাথরঘাটা ঘাঁটির পতন ঘটে। তখন আমাদের দুর্বার গতি, অপরিসীম শক্তি। একের পর এক আমরা হানাদার ঘাঁটি দখল করে চলেছি। ঠিক সেই সময় আমাদের একটি শক্তিশালী স্থায়ী ঘাঁটির হানাদারদের কাছে পতন সে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আমি চলে যাওয়ার তিন-চার দিন পর মুক্তিবাহিনীর পাথরঘাটা ঘাঁটির পতন ঘটে। সেখানকার কমান্ডার মতি, আজাদ কামাল ও মজিবর রহমান হেডকোয়ার্টারে দূত পাঠায়। দূত হামিদুল হককে পাথরঘাটার নাজুক পরিস্থিতি জানিয়ে মর্টার সাহায্য চায়।

হামিদুল হক নিজে সামাদ গামার শিবিরে গিয়ে পাথরঘাটায় মর্টার-প্লাটুন নিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। কিন্তু সামাদ গামা হামিদুল হকের নির্দেশে তেমন গা করে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব বার বার বোঝাতে চাইলে সামাদ অনেকটা নির্বিকার কণ্ঠে বলে, ‘আপনারে তো স্যার-স্যার বইলাই মনে অয়। আমি যুদ্ধ দেইখা ডরাই না, আর যাইতে পারুম না— তাও কই নাই। স্যার, আমারে যার-যার অর্ডার শুনতে কইছে, তাগো অর্ডার ছাড়া যাইতে পারুম না।’ হামিদুল হক উৎপাণ্ঠা ও অস্বস্তিতে পড়েন। যথাসম্ভব স্বাভাবিকতা বজায় রেখে সামাদ গামাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাকে কার কার অর্ডার মানতে বলা হয়েছে?’ কোঁচায় গোঁজা কাগজ বের করে হামিদ সাহেবের হাতে দিয়ে বলে, ‘দেহেন, আমি তো নেহাপড়া জানি না, এইডার মধ্যে নেহা আছে। শহীদ বইল্যা একজন আছে, যারে আমি হেই অর্জুনার চরে দেখছি। এ ছাড়া আর দুই স্যারের কী নাম জানি না, তাগোর আমি জীবনে দেহিও নাই।’ হামিদ সাহেব কাগজ হাতে আরও অস্বস্তি ও সংকটে পড়েন। যখন কাগজে নাম লিখে স্বাক্ষর করেছিলাম হামিদুল হক তখন পাশেই ছিলেন। তাই তিনি জানেন, ওই কাগজে কার কার নাম আছে। তখন তার মনে হয় সামাদ গামা তাকে চেনে না। আর তিনি যে হামিদুল হক এ কথা সামাদ গামা যদি বিশ্বাস না করে! তিনি বললেন, এই কাগজে আনোয়ার-উল-শহীদ, হামিদুল হক এবং খোরশেদ আলম আর ও লেখা আছে। আমার নামই হামিদুল হক। তোমাকে অর্ডার দিচ্ছি, তুমি এখনই পাথরঘাটায় যাও। সামাদ গামার কল্পনায় ছিল, বড় স্যার যার-যার অর্ডার শুনতে বলেছেন, তারা বড় স্যার থেকে শারীরিক গড়নে লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান না হতে পারেন তবে নেহায়েত ছোট হবেন না। দেখতে ছোটখাটো ঘন শ্যামল হামিদুল হককে প্রথম থেকেই স্যার ভাবতে পারলেও হেডকোয়ার্টারের প্রধান কর্মকর্তা কস্মিনকালেও ভাবতে পারেনি। তাই ‘আমার নামই হামিদুল হক’ কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার ধারণা বাস্তবের কড়কড়ে শুকনো ডাঙায় হোঁচট খায়। তার ধারণার সঙ্গে এত বিস্তর ফারাক সে সহজে মেনে নিতে পারে না। তাই আকাশ থেকে পড়ার মতো চমকে উঠে বলে, ‘অ্যাঁ! কী কন? আপনি হামিদুল হক স্যার অইবেন ক্যামনে? তিনি এহন হেডকোয়ার্টারের সব চাইয়া বড় স্যার। স্যার দেহেন, আমারে বিপদে ফেলাইয়েন না। সত্যিই আপনি হামিদুল হক?’

হামিদুল হক একেবারে বোকা বনে রেগেমেগে দফতরে চলে যান। একেবারে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে না দিয়ে অফিসে ফিরে চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠান। হামিদুল হকের চিঠি এসেছে শুনে সামাদ উল্কার মতো সদর দফতরে যায়। সেখানে গিয়ে তার আগের দেখা লোককে দেখে ভূত দেখার মতো আঁতকে ওঠে! হামিদুল হককেই জিজ্ঞাসা করে, ‘স্যার, হামিদুল হক স্যার আমারে ডাইক্যা পাঠাইছেন। তিনি কোথায়?’ বুঝুন ব্যাপার। মর্টার-সাহায্য যত দ্রুত পাঠানোর চেষ্টা চলছে, ততই জল ঘোলা হচ্ছে। উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতির গিঁঠ যতই খোলার চেষ্টা হচ্ছে, ততই গিঁঠের ফাঁস আটকে যাচ্ছে। হামিদুল হক বনাম সামাদের ভুল বোঝাবুঝি উত্তরোত্তর আরও গভীর হয়ে উঠছে। একের পর এক মানসিকভাবে নাজেহাল হয়ে কঠিন অবস্থা সামাল দিতে গিয়ে হামিদুল হক ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। কিছুটা উষ্মার সঙ্গে বলেন, ‘ব্যাপারটা খুবই গুরুতর। প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। তোমার এখনই পাথরঘাটা যাওয়া উচিত। আমি তো বলেছি, আমিই হামিদুল হক।’ বলিষ্ঠ সামাদ গামা, যে আস্ত খাসি খেয়ে ফেলতে পারে, যে সাড়ে চার-পাঁচ মণ বোঝা অনায়াসে কয়েক মাইল কাঁধে নিয়ে যেতে পারে, মাঝারি গোছের সজীব গাছ শুধু সিনার বলে ভেঙে উপড়ে ফেলতে পারে সেই ‘সামাদ গামা’ এই নাজুক অবস্থায় পড়ে একেবারে অসহায়ের মতো কাঁদো-কাঁদো হয়ে চেয়ারে বসে থাকা হামিদুল হককে বিনয়ের সঙ্গে বলে, ‘স্যার, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করি নাই, কেন আমারে এই রকম বিপদে ফেলাইছেন? আপনি হামিদুল হক তা আমি বুঝুম কেমনে?’ অবস্থা যখন ‘কেহ কাহারে বুঝতে নারে, দোহার ভাষা দুই মেতো’ এ সময়ে কমান্ডার খোরশেদ আলম কোনো কাজে অফিসে ঢুকে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিপদ থেকে হামিদুল হক ও সামাদ গামাকে রক্ষা করে। কমান্ডার খোরশেদ আলম সামাদ গামার পূর্বপরিচিত। তাই সে হামিদুল হককে দেখিয়ে সামাদকে বলে, ‘ইনার নামই হামিদুল হক।’ সামাদ গামা কিছুটা আশ্বস্ত হওয়ার পরও, হামিদুল হকের পাশে বসে থাকা গণপরিষদ সদস্য বাসেত সিদ্দিকীকে বলে, ‘স্যার, বড় স্যার আপনারে খুব সম্মান করেন দেখলাম। আপনি বয়সী মানুষ, আপনিই বলেন, ইনিই কি হামিদুল হক?’ রসিক বাসেত সিদ্দিকী মিটিমিটি হেসে বলেন, ‘হ্যাঁ ভাই, ইনিই হামিদুল হক।’ সামাদ গামা তার উত্তর পেয়ে গেছে। এতক্ষণ পরিস্থিতির কারণে যার সঙ্গে কানামাছি ভোঁ-ভোঁ খেলছিল, তিনিই যে তাকে নির্দেশ দেওয়ার স্যার এবং তিনিই স্বয়ং হামিদুল হক, এই কথা বিশ্বাস করার পর সামাদ গামার সে এক ভিন্ন চেহারা। হামিদুল হকের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, বুক ফুলিয়ে দফতরের মাটি কাঁপিয়ে সামরিক অভিবাদন করে বলে, ‘স্যার, কী করতে হবে বলুন।’ হামিদুল হক ক্রমবর্ধমান জটিল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যারপরনাই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন দোষ কারও নয়, পরস্পর পরস্পরের কাছে অপরিচিত হওয়া এবং সামাদ গামা বড় বেশি নিয়ম-কানুনের লোক বলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, সামাদ গামার আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। খুশিমনে পাশের দুজনকে দেখিয়ে বললেন, ‘তুমি এদের সঙ্গে পাথরঘাটা যাও। যেভাবেই হোক পাথারঘাটা ঘাঁটি পুনর্দখল করতে হবে।’ ‘স্যার, এই কথাটাই আমারে লিইখ্যা দেন, আমি এক দৌড়ে পাথরঘাটা চইল্যা যাই।’ হামিদুল হক সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশনামা লিখে দেন। নির্দেশের কাগজ হাতে নিয়ে দৌড়ে দফতর থেকে বেরিয়ে নিজের শিবির থেকে ঝড়ের বেগে মর্টার নিয়ে পাথরঘাটায় গিয়ে হানাদারদের ওপর নির্ভুল নিশানায় গোলা করে। মাত্র এক ঘণ্টায় হানাদারদের বিতাড়িত করে পাথরঘাটা ঘাঁটি পুনর্দখলে সামাদ গামা যে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছিল, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পাথরঘাটা পুনর্দখলে ওই দিন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে আরেকজন অপরিসীম সাহায্য করেছিলেন। তিনি শাহ সুফি ছামান ফকির। হামিদুল হক নেই তাকে নিয়ে কত কথা মনে পড়ে অথচ আর কোনো দিন তাকে পাব না। আল্লাহ তাকে মাফ করুন। বেহেশতবাসী করুন। আমিন।

(লেখক : বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, রাজনীতিক, www.ksjleague.com)/-