১৮ই আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা জুলাই, ২০২০ ইং

ইস্পাহানী পুরস্কারের দুই টাকা লইয়া এখন কী করিব!

ডিসে ১০, ২০১৯

এই বয়সে আমি বড়ই ভাগ্যবান। দেশের বিখ্যাত চা কোম্পানি “ইস্পাহানী মির্জাপুর” এর টীব্যাগ কিনিয়া স্ক্র্যাচ কার্ড ঘষিয়া দুই টাকা পুরস্কার পাইয়াছি। এই খুশি ভাগাভাগির জন্য অনেককেই ফোন করিয়া আনন্দ ভাগাভাগি করিয়াছি।

যৌবনে সুন্দরী নারীদের একতরফা প্রেমে পড়িতাম। আর এখন চা, কফির প্রেমে পড়িয়াছি। বাজারের সেরা চা, কফি প্রায়ই কালেকশনে থাকে। দিনে তো বটেই রাতবিরাতে ও নাক চুঁবিয়ে পান করি এই নির্যাস।

আঙ্গুর তথা দ্রাক্ষা রসের মদ গলায় না ঢুকিলে নাকি ওমর খৈয়ামের কবিতার পাখা মেলিত না। সুলতান মাহমুদের সভাকবি ফেরদৌসী যে ‘শাহনামা’ রচনা করেন, সেটিতে ষাট হাজার শ্লোক ছিল। প্রতিটা শ্লোক মিলাইতে কমপক্ষে দুই দিন করিয়া লাগিত। আর শ্লোক মিলানোর কাজে কমপক্ষে তিন গ্লাস করিয়া দ্রাক্ষা রসের আস্বাদন লইতেন তিনি। তাহা হইলে, ষাট হাজার শ্লোকে আঠারো হাজার গ্লাস মদ তিনি পিয়াইয়াছেন। ইহা ছাড়াও, তাহার আরো পাঁচ পাঁচটি গ্রন্থের কথা জানা যায়। ওমর খৈয়ামের মতো, তিনি যদি সেই সব রচনায় সারাক্ষণ দ্রাক্ষারস পান করিয়া থাকেন তো টনকে টনে গিয়া তাহা দাড়াইবে।

যাহাই হোক, চা কফির কথা বলিতেছিলাম। সিলেট, চট্রগ্রাম তো বটেই দুই বছর আগে পঞ্চগড়ে গিয়া নানা বৈশিষ্ট্যের তিন কেজি টী আনিয়াছিলাম। ইন্ডিয়া ভ্রমণে গিয়া সেখান থেকেও গ্রীন টী, কালার্ড টী আনিয়াছি। তবু কি কথা ভাবিয়া, আজ (৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় দোকান হইতে ইস্পাহানীর মির্জাপুর টীব্যাগ কিনিলাম। ৫০টির প্যাকেট ৯০ টাকা। ওজন ১০০ গ্রাম।

বহু দিন পর দেশী টী এর স্বাদ লইবো ভাবিয়া প্যাকেটটি খুলিলাম। দেখিলাম ভিতরে হলুদ রংয়ের স্ক্র্যাচ কার্ড। তাহাতে লিখা রহিয়াছে, ‘ঘষুন নিশ্চিত স্মার্টফোন অথবা নগদ টাকা মিলিবে’। “ইস্পাহানী ধামাকা অফার” নামের পুরস্কার পাইবার ক্ষেত্রে একটি নিয়মাবলী ও সাঁটাইয়া দেওয়া হইয়াছে। যাই হোক, ঘষিয়া ঘষিয়া কার্ডের আবৃত অংশটি বাহির করিলাম। পরিস্কার বাংলায় তাহাতে লেখা, ‘দুই টাকা’।

পুরস্কার পাইয়া খুশিতে আটখানা হইয়া স্ক্র্যাচ কার্ডে দেয়া ইস্পাহানীর কেয়ার লাইন নম্বরে (০৯৬৭৮৭৭১১০০) তখনি ফোন করিলাম। ওপার হইতে একজন ফোন ধরিলেন।

-হ্যালো কে বলছেন?
– মধুপুর থেকে জয়নাল আবেদীন
– জ্বী বলুন
-আমি আপনাদের টীব্যাগ কিনে স্ক্র্যাচ কার্ডে পুরস্কার পেয়েছি।
– কিন্তু স্যার তো এখন নাই। তিনি নামাজে আছেন। আপনি পরে ফোন দিন।

আধা ঘন্টা পর আবার ফোন দিলাম। আরেক ভদ্রলোক ফোন রিসিভ করিলেন। আমি একই ভাষায় আমার সৌভাগ্যের কথা রিপিট করিলাম।
আমাকে লাইনে থাকিতে বলিয়া তিনি প্রস্থান করিলেন। মিনিট তিনেক পর তিনি ফিরিয়া আসিয়া জানাইলেন, ‘স্যার তো ডিউটি শেষ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। আপনি পরে ফোন দিন।’ ‘পরবর্তী শিপ্টে যিনি ডিউটি করিতে আসিবেন আপনি তাহার সহিত পরামর্শ করিবেন।’

অগত্যা ঘন্টাখানেক পর আবার সেই কেয়ার লাইন নম্বরে ফোন করিলাম। এবার এক ভদ্রমহিলা ফোন রিসিভ করিলেন। পরিচয় পর্ব শেষে আমার পুরস্কার প্রাপ্তির কথাটা তাহাকে আবার জানাইলাম। ইহার মধ্যে আরেকটি ফোন আসায় তিনি আমাকে লাইনে রাখিয়া সেই ফোনে ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। মিনিট চারেক পর তিনি সরি বলিয়া আমাকে পুনরায় কোয়ারী করিলেন, কেন তাহাকে ফোন করিয়াছি। আমি আনুপূর্বিক অদ্যোপান্ত মুখস্ত বলিলাম।

তিনি পরামর্শ দিলেন স্ক্র্যাচ কার্ডটি যেন আগামী ২৯ ফেব্রুয়ারীর আগে সরাসরি চট্রগ্রামস্থ পাহাড়তলী ইস্পাহানী ভবনে স্বশরীরে লইয়া যাই। অথবা ময়মনসিংহ এজেন্সীতে নাগরিক সনদপত্রসহ যেন স্ক্র্যাচকার্ডটি নিজে গিয়া জমা দিয়া আসি।

ইস্পাহানী চা কোম্পানি দেশের সেরা চা উৎপাদন ও বিপনণ প্রতিষ্ঠান। সেই কোম্পানির পুরস্কার তো আর হেলাফেলায় রাখিয়া দিতে পারি না। তাই ভাবিলাম গিন্নীকে সুখবরটি প্রদান করি। অসুস্থ বিধায় গিন্নী বেশ কয়েকদিন ধরিয়া ঢাকায় বোনের বাসায় থাকিয়া চিকিৎসা লইতেছেন।

-হ্যালো একটা সুখবর আছে।
– হা বলো কি সুখবর।
– আমি মির্জাপুর চায়ের স্ক্র্যাচকার্ড ঘষে পুরস্কার পেয়েছি।
– বলো কি পুরস্কার! আমার তো বিশ্বাস ই হচ্ছেনা গো। তা পুরস্কার কি টাকায়? তাহলে তো তুমি আবার ইন্ডিয়ায় ছুটে যাবে।
– না এবার তোমাকে নিয়েই ইন্ডিয়া যাবো।
– তা কতো টাকাগো? এক লাখের উপরে না নিচে।
-বেশি উপরেও না, নিচেও না।
-তাহলে কতো ?
– ভয়ে ভয়ে বলিলাম’ দুই টাকা।
– গিন্নী তেলবেগুনে জ্বলিয়া উঠিল। বলিল, বারান্দায় ডাইনিং টেবিলের পাশে অনেকগুলি দুই টাকার নোট রেখে আসছি। রবিবার তো ভিক্ষা বার ছিল। ভিখারীদের মধ্যে সেসব বিলিয়েছ কি?
– আহা রাগ করছো কেন? আজকালকার ভিখারীরা তো দুই টাকা ভিক্ষা নিতে চায়না। তাদের দাবি কমপক্ষে পাঁচ টাকা। তাই দুই টাকার নোটগুলোর কোনো সৎগতি করতে পারিনি।
– তাহলে কার্ড ঘষে দুই টাকা পুরস্কার পেয়ে এতো আহ্লাদিত
কেন?

গিন্নীর কথায় সম্বিত ফিরিয়া পাইলাম। দেশ স্বাধীন হইবার পর চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় ভুখা বাঙ্গালীদের ইস্পাহানীরা দুই আনা করিয়া ভিক্ষা দিতেন। আর সেই দুই আনা নিয়া মিশকিন বাঙ্গালীদের মধ্যে ছিল কাড়াকাড়ি। চারদশক পর ইস্পাহানীরা পুরস্কারের নামে আমাদের দুই টাকা করিয়া ভিক্ষা দিতেছেন। ষোল আনায় একটাকা। বত্রিশ আনায় দুই টাকা।

ইস্পাহানীরা ৪৬ বছর পর ভিক্ষার জন্য তিরিশ আনা বাড়াইয়েছে ছেচল্লিশ বছরে। পক্ষান্তরে কোটি আনা ভরিয়াছে নিজ ঝুলিতে। আমরা এখনো স্বভাবে সওয়ালী জাত। তাই ভিক্ষার টাকায় কতোনা খুশি হইয়া যাই!

(জয়নাল আবেদীন, সিনিয়র সাংবাদিক/ ঘাটাইলডটকম)/-

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

পঞ্জিকা

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Adsense