ইতিহাসে মওলানা ভাসানীর আসন

পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের গ্রামগুলো আজ নেই। পল্লিতে বিদ্যুৎ গেছে। বহু বাড়িতে টেলিভিশন চলে। হিন্দি সিনেমার কর্কশ সংলাপ কানে এসে লাগে। সে শব্দে ঘুঘুর ডাক শোনা যায় না। তা সত্ত্বেও প্রত্যন্ত পল্লিতে এখনো হাঁটতে ভালো লাগে।

কিছুদিন আগে এক নিঝুম গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলাম। এক বাড়িতে এক বৃদ্ধ তাঁর ভাতিজাকে ধমকাচ্ছেন। বকাঝকার মধ্যে চাচার একটি উক্তি: ভাত খাও ঠাকুর চেনো না। জোয়ানমর্দ ভাতিজা গোয়ালঘরের বেড়ায় ঠেস দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু যে একজন ভাতিজা তার ঠাকুরকে চেনে না, তা নয়। পৃথিবীর অনেক জাতি ও জনগোষ্ঠী ভাতটা খায় ঠিকই, কিন্তু ঠাকুর চেনে না।

গান্ধী, নজরুল ও বাংলা ভাগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমাকে ভারতের শ তিনেক মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে অথবা তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। তাঁদের একজন সদ্যপ্রয়াত কংগ্রেসনেতা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। কয়েক মাস আগে আমি তাঁর বেলতলার বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। মেদহীন, দীর্ঘ, সুদর্শন ও সম্ভ্রান্ত সিদ্ধার্থশঙ্করকে সেদিন দেখে মনে হয়নি, এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন। হাঁটুর ব্যথার কথা বললেন, তবুও হাসিখুশির সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। সারা বাড়িভর্তি বই। আঠারো শতকের প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে এ বছর প্রকাশিত হয়েছে, এমন বইও আছে। কলকাতার প্রকাশনী Biblophil থেকে আমার গান্ধী, নেহরু অ্যান্ড নোয়াখালী প্রকাশিত হচ্ছিল। আমি মাত্র একবার অনুরোধ করাতেই তিনি ভারতীয় সংস্করণের ভূমিকা লিখে দিতে সম্মত হন।

কথা প্রসঙ্গে রায়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, মওলানা ভাসানীর কে আছে? আমি বলেছিলাম, তাঁর কেউ নেই। তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আপনার দাদুও (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ) মারা গেছেন, ভাসানীও তাই। তাঁদের নামে রাস্তা ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তাঁদের কেউ নেই।

আমার কথার মর্ম বোঝার মতো পর্যাপ্ত মেধা তাঁর ছিল। বললেন, মারা গেছেন সে তো জানিই। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীদের কে আছেন?

বললাম, তিনি যে দলের প্রতিষ্ঠাতা, সেই দলই তো এখন ক্ষমতায়। তবে সর্বশেষ তিনি যে দলের নেতৃত্ব দেন, সেই দলের নেতা-কর্মীরা মদনভস্মের মতো ছড়িয়ে আছেন সারা দেশে।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে ভাসানীর সঙ্গে রায়বাবুর কথা হয়েছিল কলকাতা বা দিল্লির কোথাও। মওলানার কাছেই তিনি শেখ মুজিবের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কথা বিস্তারিত জানেন। ভাসানী চীনপন্থী ছিলেন, সে কথা উল্লেখ করেও সিদ্ধার্থশঙ্কর বললেন, সব ব্যাপারে সহমত পোষণ করতে না পারলেও তাঁর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণ উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

ভাসানী এবং তাঁর রাজনীতিকে উপেক্ষাই করা হয়েছে। তাঁর শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণাকে তাঁর জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার ধারণাকে উপেক্ষা ও অবহেলা করা হয়েছে। কোনো বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করেননি তাঁর উত্তরাধিকারীরা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদ্বানেরাও। কেউ তাঁকে শুধু ‘হুজুর হুজুর’ করেছেন, কেউ তাঁকে কোনো দামই দেননি।

মূলধারার মধ্যশ্রেণীর কাছে, সুবিধাবাদিতাই যাদের ধর্ম, উপেক্ষিত তিনি এতটাই যে তাঁর মৃত্যুদিনটিতেও তাঁকে স্মরণ করার প্রয়োজন মনে করে না তারা। ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মৃত্যুদিন। এবার তাঁর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ওই দিনই ঈদ, তাই কাগজ বের হয়নি। ১৬ নভেম্বরের দু-একটি কাগজ ছাড়া প্রধান কাগজগুলোতে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী সম্পর্কে কোনো খবরই নেই। প্রায় ৪০ বছর আমিও সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছি। মিডিয়ার এই অবহেলাকে আমার কাছে ক্ষমাহীন মনে হয়েছে। যদিও আমাদের সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এমন সব মানুষের জন্ম-মৃত্যুদিন উপলক্ষে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যাদের ৯০ শতাংশেরই দেশের জন্য কোনো অবদান ও ত্যাগ নেই।

একটি কুঁড়েঘরও আপনা-আপনি তৈরি হয় না, তারও নির্মাতা থাকে। একটি দেশও আপনা-আপনি স্বাধীনতা অর্জন করে না। তারও একাধিক নেতা থাকেন। ১৭ নভেম্বর থেকে আমার মনে হচ্ছে, আমরা ওই ভাতিজার মতো ভাত খাই, কিন্তু ঠাকুর চিনি না। কিন্তু কর্তব্যে অবহেলার কারণে আজ আমাদের তিরস্কার করার জন্য কোনো চাচা নেই।

উপমহাদেশে রাজনীতিবিদ বলতে যা বোঝায়, মওলানা ভাসানী তা ছিলেন না। কুড়ি শতকের শুরুতে তিনি যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তখন জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতেন খুব বড় সামন্তপ্রভু, রাজা-মহারাজা, নবাব, ব্যারিস্টার, নামকরা আইনজীবী অথবা অভিজাত পরিবারের মানুষ। তাঁদের বিপরীতে ভাসানী ছিলেন এক গ্রাম্য যুবক, যাঁর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার দৌড় প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত, পরে কিছুদিন দেওবন্দেও ছিলেন। তবে অস্থির প্রকৃতির আবদুল হামিদ সেখানেও যে খুব বেশিদিন বিদ্যাভ্যাস করেছেন, সে প্রমাণ নেই।

সিরাজগঞ্জ শহরসংলগ্ন এক গ্রামে মোটামুটি সচ্ছল পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা মোহাম্মদ শরাফৎ আলী খান অল্প বয়সেই হজ করেন।পারিবারিক অবস্থা ভালো না থাকলে সেই উনিশ শতকে অপেক্ষাকৃত কম বয়সে কেউ হজ পালন করতে পারতেন না। কিন্তু ভাসানীর যখন বয়স পাঁচ-ছয় বছর, তখন তাঁর বাবা এবং তার কয়েক বছর পর মা ও ভাইবোন মহামারিতে মারা যান। আমাদের সমাজে যা হয়, জ্ঞাতি-আত্মীয়স্বজনের ষড়যন্ত্রে পৈতৃক সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান—বেরিয়ে যান কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নয়—আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে গিয়ে তিনি মিশে যান কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে, যাদের অধিকাংশই কৃষক, ক্ষেতমজুর, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার প্রভৃতি।

আমি এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘হুজুর, আপনার বাড়িতে কেউ গেলেই সঙ্গে সঙ্গে আপনি তাঁকে কিছু খেতে দেন। কারণ কী?’ মওলানা বললেন, ‘মানুষের খিদা কী জিনিস, তা আমি ছোটকালেই দেইখেছি। কচু, ঘেঁচু, জোয়ার, বাজরা খাইয়া মানুষকে বাঁচতে দেইখেছি। যে কৃষক জমিদার-জোতদারের ফসল ফলায় সেই কৃষকেরে আমি ভাত না খাইয়া মরতে দেইখেছি। দূরদারাজ থিকা মানুষজন আমার কাছে আসে, কোন সময় কী খাইয়া রওনা দিছে—।’

দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও তাদের শোষণ-নিপীড়ন বন্ধের প্রতিজ্ঞা নিয়েই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ভাসানী।

কৈশোর ও প্রথম যৌবনের বহুদিন কাটে তাঁর দরিদ্র কৃষকের কুঁড়েঘরে, তাঁতির তাঁতঘরে, জেলের নৌকায়, কামার ও কুমারের পর্ণকুটিরে। তাদের সঙ্গে মিশে তিনি দেখতে পান, দুই বেলা তাদের চুলায় আগুন জ্বলে না। তারা ভাত পায় না। তারা সুদখোর মহাজনের ঋণের জালে কেঁচিকলে ইঁদুরের মতো আটকে পড়েছে। ওদিকে জমিদারের শোষণ ও অত্যাচার। সেই শোষণ-অত্যাচার থেকে বাঁচতে ভিটে-মাটি, থালা-ঘটি-বাটি সব তুলে দিতে হচ্ছে মহাজনের হাতে। মক্তবে শিক্ষকতা ও মোল্লাগিরি-ইমামতি করে দিন যাচ্ছিল তাঁর একরকম। নিজের নিরুপদ্রব জীবন তিনি চান না। তিনি সমাজের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। জীবনের শেষ দিকেও তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত।’

ভাসানীর রাজনৈতিক ধারা তাঁর নিজস্ব। উপমহাদেশের কোনো প্রধান রাজনৈতিক ধারা থেকেই তিনি প্রেরণা পাননি। উচ্চশিক্ষিত ও বড়লোকদের সংগঠন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ থেকে তো নয়ই। তবে আঠারো-উনিশ শতকের কৃষক বিদ্রোহগুলো, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের বিদ্রোহ, নীলকরদের বিদ্রোহ, হাজি শরিয়তউল্লাহ, দুদু মিয়াদের জমিদার ও ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়ে থাকবেন।

শতাব্দীর প্রথম দশকে হিন্দু-মুসলমান বড়লোক নেতারা যখন বাংলা ভাগ নিয়ে তাঁদের নিজ নিজ শ্রেণীর স্বার্থে উত্তাল রাজনীতি করছিলেন, তখন যুবক ভাসানী মহাজনি শোষণ ও জমিদারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে পাবনা-সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইলে স্থানীয়ভাবে লড়াই করছিলেন। মওলানার তৎপরতার কথা জমিদারেরা শাসকদের কানে পৌঁছে দেন। সরকারি নথিপত্র থেকে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি গোপনে গিয়ে দেখেন, সন্ধ্যার পর ভাসানী কৃষকদের মধ্যে ওয়াজ করছেন। কিন্তু ওয়াজে ধর্মীয় কথা একটিও নেই। সমাজের অন্যায়-অবিচারের কথা। তাঁর শেষ কথাটি হলো, ‘ভাইয়ো, আমাদের ইসলাম ধর্ম বলে, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও।’

মওলানার দাড়ি-টুপি ও লেবাসের কারণে তাঁর প্রতিপক্ষের পক্ষে প্রচার করা সহজ যে তিনি একজন গ্রাম্য মুসলমান নেতা ছিলেন। সেকালের বাংলার জমিদারদের ৮০ শতাংশ ছিলেন হিন্দুধর্মাবলম্বী এবং তাঁদের প্রজাদের ৭০ শতাংশ ছিলেন মুসলমান। সুদখোর মহাজনদের ৯০ শতাংশের বেশি ছিলেন হিন্দু। খাতকদের চারজনের তিনজনই ছিল মুসলমান। তিনি যখন জমিদার-জোতদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তা যাদের গিয়ে আঘাত করে, তাদের বারো আনাই হিন্দুধর্মাবলম্বী। সুতরাং বলা সহজ, ভাসানী একজন মুসলমান নেতা ও সাম্প্রদায়িক। যদিও তাঁর অনুসারীদের একটি বিরাট অংশ ছিল হিন্দু। বাংলা ও আসামের বহু হিন্দু তাঁকে অবতার জ্ঞান করত। তিনি বলতেন, হিন্দুর ক্ষুধা, মুসলমানের ক্ষুধা, বৌদ্ধের ক্ষুধা, খ্রিষ্টানের ক্ষুধা একই রকম। শোষক ও জালেমের কোনো ধর্ম নেই। মজলুমের কোনো ধর্ম নেই। জালেম হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, দেশি হোক আর বিদেশি হোক, কালো চামড়ার হোক আর সাদা চামড়ার হোক—সব সমান।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ভাসানী চরমপন্থী অনুশীলন দলের সঙ্গে কাজ করেন কিছুদিন। হবিগঞ্জের কবি ও গবেষক দেওয়ান গোলাম মোর্তজা বছর বিশেক আগে মারা গেছেন। গুণী মানুষ ছিলেন। ঢাকার বিখ্যাত ব্যক্তিদের কাছে তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাননি। তাঁর স্ত্রী সম্ভবত এখনো বেঁচে আছেন। ছোট শহরের প্রান্তে তাঁর ছায়াচ্ছন্ন বাড়িতে আমি আতিথ্য গ্রহণ করেছি। মূল্যবান গ্রন্থ ও অমূল্য প্রত্নসামগ্রীর সংগ্রহ ছিল তাঁর। তিনি এক সাক্ষাৎকারে আমাকে প্রমাণসহ জানান, ১৯১২-১৪ সালের দিকে ভাসানী হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বেশ কিছু ‘স্বদেশি ডাকাতি’তে অংশ নেন এবং জোতদারের ধানের গোলা লুট করেন।

সন্ত্রাসবাদী ওই রাজনীতি ভাসানীর ভালো লাগেনি। নেতৃত্ব ছিল হিন্দু দেশপ্রেমিকদের হাতে। তাঁরা হিন্দুত্ব ছাড়া আর কিছু বোঝেন না। তাঁদের প্রেরণা তাঁদের ধর্ম। আধুনিক বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী দর্শন নয়, ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে তাঁরা দেশপ্রেমে দীক্ষা নেন। বঙ্গের অর্ধেকের বেশি মানুষ যে অ-হিন্দু, যাদের বলা হয় ‘মোছলমান’, তা তাঁরা বিবেচনা করেননি। আন্দোলনে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে তাঁরা যুক্ত করতে পারেননি। ওই হিন্দুত্ববাদী বিপ্লবী আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রথম উদ্বেগ প্রকাশ করেন রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুর কবির সঙ্গে গ্রাম্য ভাসানীর সাংস্কৃতিক দূরত্ব আকাশ-পাতাল। ভাসানী ওই বিপ্লবীদের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।

একদিন চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে তাঁর কথা হওয়ায় তাঁকে ভাসানীর ভালো লাগে। ১৯১৭ সালে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৩০-এর দশকের আগে মুসলিম লীগের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। ওই দলের নেতা মুসলমান জমিদারদের তিনি সহ্য করতে পারতেন না।

মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে তিনি ১৯২১-এ অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অহিংস আন্দোলনের মানুষ ভাসানী নন, তবু তিনি স্বরাজের আশায় যোগ দেন এবং ২৬ দিন জেল খাটেন। গান্ধীজির কথামতো যখন স্বরাজ এল না, তখন কংগ্রেসের সেবামূলক কাজে তিনি যুক্ত হন। ১৯২১-২৩ সালে উত্তরবঙ্গে বন্যার সময় তিনি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখ নেতার সঙ্গে গলা পর্যন্ত পানিতে হেঁটে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।
জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের উত্তেজিত করে তোলায় ১৯২৬ সালে ভাসানী ময়মনসিংহ জেলায় ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষিত হন। গ্রেপ্তার এড়াতে চলে যান আসাম প্রদেশে। সেখানে বহিরাগত বাঙালি কৃষকদের অধিকার রক্ষায় তিনি যে আন্দোলন গড়ে তোলেন, তার সঙ্গে শুধু তুলনীয় গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকার সত্যাগ্রহ আন্দোলনের। ভাসানীর ‘লাইনপ্রথাবিরোধী’ আন্দোলনের তীব্রতা ছিল আরও বেশি। বারবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয় এবং তিনি পরিণত হন এক কিংবদন্তির নায়কে। অসমিয়াদের ‘বাঙাল খেদা আন্দোলনের’ বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিরোধ ইতিহাসের আরেক অধ্যায়।
১৯৩৭ থেকে ’৪৭ পর্যন্ত ভাসানী ছিলেন আসাম আইন পরিষদের সদস্য। সংসদে তিনিই বাংলা ভাষা ও বাঙালির পক্ষে প্রথম কথা বলেন। ১৯৪০ থেকে ’৪৭ পর্যন্ত তিনি ছিলেন আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকারের গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তিনি দ্বিধা করেননি এবং সরকারের পতন ঘটিয়েছেন।

১৯৪৭-৪৮ সালে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি পরিষদে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য প্রথম দাবি তোলেন। ১৯ মার্চ ’৪৮ বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি গর্জে ওঠেন, ‘আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম?’ এ কথা সহ্য করা পাকিস্তানি সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর সংসদীয় রাজনীতির সেখানেই সমাপ্তি। ১৯৪৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ।

১৯৪৭ থেকেই পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম করতে থাকেন মওলানা। তিনি দাবি করেন, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ছাড়া সব বিষয় প্রদেশকে দিতে হবে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সোচ্চার হন। বায়ান্নর সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের তিনি ছিলেন সভাপতি। ’৫৪-এর নির্বাচনে তাঁর আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটায়। আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে মতপার্থক্য হওয়ায় দল থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫৭-তে তিনি গঠন করেন বামপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। ’৫৮-তে আইয়ুবের সামরিক শাসন জারি হলে চার বছর তিনি কারাগারে থাকেন।

ষাটের দশকে মাও সেতুঙের সঙ্গে তাঁর দুবার বৈঠক হয়। সোভিয়েত নেতাদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ঘটে। ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বৈঠক করেন। ষাটের দশকে পাকিস্তানে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে তিনি কৃষক-শ্রমিকের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলেন।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভাসানী ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক শিবিরের একজন নেতা। ১৯৫৪-এর নভেম্বরে স্টকহোমে বিশ্বশান্তি সম্মেলনে তিনি অবিস্মরণীয় ভাষণ দেন। সে সম্পর্কে আমি বিস্তারিত শুনেছি তাঁর দোভাষী দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক এস এম আলীর কাছে। মওলানা ইংরেজি মোটামুটি বুঝতেন, কিন্তু বলতেন না। ১৯৫৮-তে তিনি সুইডেনে ‘নিরস্ত্রীকরণ ও আন্তর্জাতিক মৈত্রী’ শীর্ষক বিশ্বকংগ্রেসে যোগ দেন। তিনি প্রেসিডেন্ট জামাল নাসেরের আমন্ত্রণে কায়রোর আলেকজান্দ্রিয়া প্রাসাদে তাঁর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

ভাসানী সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের সঙ্গে দামেস্কে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির ব্যাপারে মতবিনিময় করেন। ’৫৮-এর প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী নেহরু মওলানাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করে। সে কাহিনি আমি আতাউর রহমান খানের কাছে শুনেছি।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হলে ভাসানী শেখ মুজিবের পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ফরাসি বিপ্লবের মতো গণ-আন্দোলন করে মুজিবকে মুক্ত করে আনব। ১৯৬৮-এর ডিসেম্বরে সূচনা করেন গণ-অভ্যুত্থানের। তখন টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘প্রোফেট অব ভায়োলেন্স’ আখ্যা দেয়।

সত্তরের নির্বাচনে মওলানা চাইছিলেন, আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি আসন পাক। তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে দক্ষিণপন্থী মশিউর রহমান ও কট্টর বামদের মতবিরোধ ঘটে। ’৭০-এর ২৩ নভেম্বর তিনি পল্টনের জনসভায় স্লোগান দেন, ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। শামসুর রাহমান কবিতা লিখলেন—‘হায়, একি মন্ত্র জপলেন মওলানা ভাসানী’।

একাত্তরের মার্চে গণহত্যা শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর সন্তোষের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। তিনি ভারতে চলে যান। সেখানে তাঁকে জাতীয় নেতার মর্যাদা দেওয়া হলেও তাঁকে নজরবন্দী করে রাখা হয়। তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের ‘সর্বদলীয় পরামর্শ কমিটি’র চেয়ারম্যান। অন্য সদস্য ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, মণি সিংহ, মোজাফ্ফর আহমদ, মনোরঞ্জন ধর প্রমুখ। স্বাধীনতার পর ভাসানী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। জামায়াতে ইসলামীর মৌলবাদী রাজনীতির তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। তাদের হাতে হয়েছেন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত।

জীবনের শেষ ৫০ বছর ভাসানী বহু বড় বড় আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, যার সুফল নিয়েছেন অন্য দলের নেতারা। ভাসানী ভুলভ্রান্তি ও দুর্বলতার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। রাজনীতিতে তাঁর পাহাড়সমান ব্যর্থতা রয়েছে। কিন্তু জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতা মওলানা ভাসানীকে সজ্ঞানে হোক বা অজ্ঞতাবশতই হোক—যারাই অস্বীকার ও অবহেলা করবে, ইহজগতে তারা কিছুকাল ভালো থাকলেও, তাদের স্থান হবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। ইতিহাসে মওলানা ভাসানীর মর্যাদার আসনখানি কেউ নড়াতে পারবে না।

(সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক, ঘাটাইলডটকম)/-

১১ Views