আ.লীগ ছেড়ে ন্যাপ গঠন করেছিলেন যে কারণে ভাসানী

0Shares

ঢাকার এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ঘোষণা করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান ৯৮% স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। সে সময় ওই জনসভায় একমাত্র মওলানা ভাসানীই তাঁর বক্তৃতায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মনসুর আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রমুখ বক্তা ও নেতারা সোহরাওয়ার্দীর এই বক্তৃতার কোনো প্রতিবাদই করেননি। অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা নিজেদের সভা-সমিতিতে জোরালো ভাষায় পূর্ব পাকিস্তানের দূরবস্থার কথা উল্লেখ করে স্বায়ত্তশাসনের দাবি করতেন। উল্লেখযোগ্য যে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুহুর্তেই তারা ৯৮% স্বায়ত্তশাসনের কথা বাদ দিয়ে আবার স্বায়ত্তশাসনের আওয়াজ তোলেন।

মওলানা ভাসানীর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি তার সভা-সম্মেলনের কর্মসূচিতে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি রাখতেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও গান-বাজনার আয়োজন থাকত। ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রয়াত ইয়ার মোহাম্মদ খানের (আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা কোষাধ্যক্ষ) বাসভবনে মওলানা ভাসানী আবু জাফর শামসুদ্দিনসহ কয়েকজনকে বললেন, ‘তোমরা কাগমারীতে একটি বড় ধরনের সাংস্কৃতিক সম্মেলন করো…।’

দু’চারদিনের মধ্যে মওলানা ভাসানী একটি কমিটি করে দেন। তার সদস্যরা হলেন, ইয়ার মোহাম্মদ খান, কাজী মোহাম্মদ ইদরীস, ফকির সাহাবুদ্দীন আহমদ, খায়রুল কবির, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, সদরি ইস্পাহানি, আবু জাফর শামসুদ্দিন।

(সূত্র : ভাসানীর কাগমারী সম্মেলন ॥ স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা, গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, দৈনিক নয়া দিগন্ত ৮ ফেব্রয়ারি ২০০৮)

আবু জাফর শামসুদ্দিন হলেন এই সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক। সদরে ইস্পাহানী ও ইয়ার মোহাম্মদ খান হলেন যুগ্ম কোষাধ্যক্ষ। এই কমিটি মওলানা ভাসানীকে করে কো-চেয়ারম্যান। প্রস্তুতি কমিটি প্রথম ৪৯ নম্বর নরেন্দ্র বসাক লেনে একটি বাড়ির দোতলায় অফিস স্থাপন করে। পরে জিন্নাহ এভিনিউর (বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) একটি বাড়ির দোতলায় অফিস স্থানান্তর করে।

সম্মেলন প্রস্তুতি সম্পর্কে আবু জাফর শামসুদ্দীন তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘…আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং তার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক (দার্শনিকও বটে) ভিতভূমি নির্মাণের তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার অন্যতম।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘জাতি মাত্রেরই সাংস্কৃতি আছে। বাঙালি একটি সুপ্রাচীন যৌথ সংস্কৃতির অধিবাসী। এই সাংস্কৃতিতে আদিবাসী হিন্দু-মুসলমান বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব সম্প্রদায় ও বর্ণের বিশিষ্ট অবদান আছে। বাঙালি জাতির যৌথ উদ্যমে ও আয়োজনে শত শত বছরব্যাপী গ্রহণ ও বর্জনের মাধ্যমে সৃজিত বাঙালির জাতীয় সত্তা ও সাংস্কৃতিক প্রতি বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক দৃষ্টি প্রথম আকর্ষণ করে কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন।’

(সূত্র : ভাসানী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, নওরোজ সাহিত্য সংসদ, জানুয়ারি ১৯৮৬)

সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে আয়োজিত সাংস্কৃতিক-কাম রাজনৈতিক এই সম্মেলন এক বিপ্লবী রূপ ধারণ করে। এই সম্মেলন উপলক্ষে ১৩ জানুয়ারি ‘পূর্ব বাংলার গরিব, চাষী, মজুর, ছাত্র, যুবক ও জনসাধারণের প্রতি আমার আবেদন’ শিরোনামে একটি লিফলেট প্রকাশিত হয়েছিল।

(সূত্র : ভাসানী-মুজিবের রাজনীতি, এম আর আখতার মুকুল, সাগর পাবলিশার্স, ১৫ অক্টোবর ১৯৮৯)

সম্মেলনটিকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ার জন্য দূতাবাসের মাধ্যমে চিঠিপত্র লিখে, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন করে দেশ-বিদেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীদের দাওয়াত করা হয়। ৬ দিনব্যাপী এই সম্মেলনের জন্য নেয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। কাগমারীকে বিদ্যুতায়ন করা হয়, অস্থায়ীভাবে শতাধিক সনের দোচালা ঘর নির্মাণ করা হয়, হাজার হাজার মানুষের অস্থায়ী বাসস্থান, মেহমানদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, আহার্যের বন্দোবসন্ত, পানি ও পায়খানার সুবন্দোবস্ত ছিল আশ্চর্যজনক। গোটা এলাকা বিদ্যুতায়ন ছাড়া টেলিফোন, টেলিগ্রাম অফিস অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়েছিল। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হয়। শত শত প্রগতিবাদী তরুণ এবং ভাসানীর মুরিদ এই কাজে অংশগ্রহণ করে।

সম্মেলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সম্মেলন উপলক্ষে টাঙ্গাইল শহর থেকে কাগমারী পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রাস্তা যে অসংখ্য তোরণ নির্মিত হয়েছিল সেগুলোকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) থেকে শুরু করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী নেতাদের নামে করা হয়েছিল। উল্লেখ আরো তোরণগুলোর নাম হলো-মাহাত্মাগান্ধী, মওলানা মোহাম্মদ আলী, কাজী নজরুল ইসলাম, মহাকবি আল্লামা ইকবাল, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, হাজী শরীয়ত উল্লাহ, শহীদ তীতুমীর, পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু, হাজী মোহাম্মদ মহসীন, সিআর দাস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সেতুং, ওয়ার্ড ওয়ার্থ, বায়রন, শেলী, মাওলানা রুমী, হযরত ইমাম আবু হানিফা, ইমাম গাজ্জালীÑএভাবে ৫১টি তোরণের নামকরণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ তোরণটি ছিল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তোরণ।

(সূত্র : ভাসানীর কাগমারী সম্মেলন ও স্বায়ওশাসনের সংগ্রাম, শাহ আহমদ রেজা, গণপ্রকাশনী, ঢাকা-১৯৮৬)

এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য মওলানা ভাসানী আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকেও। তাদের মধ্যে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ সুকর্ণ অথবা কোনো প্রতিনিধি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় এবং ব্রিটিশ বিরোধী দলের নেতা।

নেহেরু, বিধান রায় ও নাসের চিঠি দিয়ে সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে মওলানা ভাসানীকে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি দিয়েছিলেন।

১৯৫৭ সালের ৮ ফেরুয়ারি ছয়দিনব্যাপী ‘কাগমারী’ তে পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন শুরু হয়েছিল। এর সাথে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভাও যোগ করা হয়েছিল। বর্তমানে কাগমারী মুহাম্মদ আলী কলেজ যে স্থানে অবস্থিত তারই পাশে বিস্তৃত ধানের মাঠে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী নিজেই বলেছিলেন, ‘কাগমারী বিশ্বভ্রাতৃত্ব আর স্বাধীনতার সড়ক’।

এই সম্মেলনের পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই সম্মেলনে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনায় যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. আখলাকুর রহমান, অধ্যক্ষ ওসমান গণি, ড. নুরুল ইসলাম (অর্থনীতিবিদ), ড. শামসুদ্দীন আহমদ, ডেভিড ঘাগ (যুক্তরাষ্ট্র), চার্লস অ্যাডামস (কানাডা), ড. এফএইচ কওসন (যুক্তরাজ্য) জাপানের প্রতিনিধি, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির (ভারত), আব্দুল কাদির (পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়), পাকিস্তানের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ম্যাডাম আজুরি, ড. হেদায়েত উল্লাহ, এমএন হুদা প্রমুখ। ড. হাসান দানীর প্রবন্ধ অন্যজন পাঠ করে শোনান।

আলোচকদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ব্যাপক। এর মধ্যে ছিল সাহিত্য, দর্শন, সঙ্গীত, নৃত্য, চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রভৃতি।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মিশর এবং ভারত থেকে অনেক প্রতিনিধিও এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবির। প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন কাজী আব্দুল ওদুদ, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব, প্রবোধ কুমার স্যানাল, রাধারাণী দেবী, মিসেস সুফিয়া ওয়াদিয়া।

ছয়দিনের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী যেন কাগমারীতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। তাঁবুতে অবস্থান করে অনেক মন্ত্রী দাফতরিক কাজ সমাধান করেছিলেন। প্রখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমদসহ অনেক বিদেশী মেহমান আসতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে বাণী পাঠিয়েছিলেন। সম্মেলনে পথের পাঁচালি ও আমেরিকার ‘ঈড়ি ইড়ু’ ছবিসহ অনেক ছবি প্রদর্শন করা হয়েছিল।

এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছে অনেক সাংস্কৃতিক দল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘ইয়ুথ লীগ’। চট্টগ্রামের দল, ঢাকার কল্লোল গোষ্ঠী, করাচির আজুরির নৃত্য শিল্পী দল, ফরিদপুরের কাঞ্চন যাত্রা, কুষ্টিয়ার লালশাহের দল, রংপুরের ভাওয়াইয়া দল-ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিন ছিলেন এর প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও ছিল শেরপুরের জারিগান, রমেশ শীলের কবিগান, ছড়া সম্প্রদায়ের ছড়া পাঠ। এরই সঙ্গে ছিল রামদা ও লাঠি খেলা, পদ্মা পাড়ের ঢালার চর থেকে আসা মজিবর সর্দারের লাঠিয়াল দলের লাঠির মহড়া, যা হাজার হাজার দর্শককে মুগ্ধ করেছে।

প্রথম অধিবেশন হয় ৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায়। এই অধিবেশন উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, সভাপতিত্ব করেন সম্মেলনের মূল সভাপতি ড. কাজী মোতাহার হোসেন। সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দু’ধরনের বক্তব্যই রেখেছিলেন। উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপরও দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, পূর্ব আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন না দিলেও সামরিক-বেসামরিক চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্রীয়াকলাপে সংখ্যাসাম্য নীতি পালিত না হলে পূর্ব পাকিস্তান ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলিবে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে।

একদিকে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচিবিরোধী সাম্রাজ্যবাদমুখী পররাষ্ট্রনীতির সমর্থনে সোহরাওয়ার্দীর আক্রমণাত্মক ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে একটি মীমাংসা তখন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সংগঠন নেতাদের পরিচালিত করবে, না ক্ষমতাসীনদের প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত হবে সংগঠনের কর্মসূচি। এই মীমাংসার প্রয়োজনে মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন টাঙ্গাইল মহকুমার কাগমারীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আহবান করেন। ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রচারপত্রে কাগমারীর সম্মেলনের উদ্দেশ্যে ব্যখ্যা করে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘পূর্ব বাংলার বাঁচার দাবি পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আদায়ের দাবি এবং মহান ২১ দফার বাকি ১৪ দফা দাবি পূরণের জন্য বিচ্ছিন্ন জনশক্তিকে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করিয়া তুমুল আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে হইবে।’

৮৯৬ জন কাউন্সিলরের উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে ভাষণদানকালে ১৯৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অপমৃত্যুর কারণসমূহ ব্যাখ্যা করে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা লাভের পটভূমি তুলে ধরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীসহ পাশে উপবিষ্ট ক্ষমতাসীনদের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি, মুদ্রা এবং দেশরক্ষা বিভাগ ছাড়া সকল বিভাগের ভার প্রদেশকে দিতে হবে।’ কারণ, এটাই আওয়ামী লীগ ঘোষণাপত্রের এবং একুশ দফার প্রধান কথা। তিনি বলেন, নিজের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করার পূর্ণ ক্ষমতা আর শিল্প, বাণিজ্য, ডাক ও রেলওয়েসহ সকল বিভাগের পূর্ণ কর্তৃত্ব পূর্ব বাংলার হাতে না আসা পযন্ত এবং অর্থনীতির বিচারে দুই প্রদেশকে দু’টি স্বতন্ত্রে সত্তা হিসেবে স্বীকার না করা পর্যন্ত পূর্ব বাংলার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল সম্ভব নয়। দেশরক্ষা বিভাগ সম্পর্কে মওলানা ভাসানী বলেন, একে কেন্দ্রের হাতে রাখার কথা বলার অর্থ এই নয় যে, তার নিযোগ থেকে পূর্ব বাংলার যুবকরা চিরদিন বঞ্চিত থাকবে। সামরিক বিভাগে কর্মরতদের মধ্যে শতকরা পাঁচজন পূর্ব বাংলা থেকে নেয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈদেশিক সাহায্যের বাইরে কেবলমাত্র রাজস্ব আয়েরই প্রায় সত্তর ভাগ অর্থ ব্যয়িত হয় দেশরক্ষা খাতে এবং পূর্ব বাংলা সে বিরাট আয় থেকে বঞ্চিত। জাপানি ও চীনাদের মতো খর্বকায়রা যুদ্ধের উপযোগী হতে পারলে পূর্ব বাংলার যুবকরা কেন পারবে না-তিনি প্রশ্ন করেন। অবিলম্বে পূর্ব বাংলায় সমরাস্ত্র কারখানা নির্মাণের এবং নৌবাহিনীর সদর দফতর স্থানান্তরের জন্যও তিনি দাবি জানান।

শিল্পায়ন সম্পর্কে মওলানা ভাসানী বলেন, পূর্ববাংলায় প্রতি বর্গমাইলে প্রায় নয়শ’ মানুষের বাস, পশ্চিম পাকিস্তানে এই সংখ্যা একশ’রও কম। সুতরাং বিজ্ঞানসম্মত বিধান হলো, পূর্ব বাংলায় শিল্পায়ন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে যান্ত্রিক চাষাবাদের ব্যবস্থা করা। কিন্তু পূর্ব বাংলায় কোনটারই ব্যবস্থা না করে কেন্দ্রীয় সরকার ভারী ও সকল শিল্পকারখানা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করেছে। পূর্ব বাংলার শিল্পায়ন এবং সুস্থ বাণিজ্যের স্বার্থে প্রাদেশিক সরকারের উদ্যোগে বাঙ্গালীদের কর্তৃত্বাধীন একটি বৃহদাকার ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দাবি জানান। পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সদর দফতর পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় প্রাদেশিক সরকার বিপুল পরিমাণ আয়কর প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি একতরফা আয়করের চাপে নিষ্পেষিত বাঙ্গালী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা তাদের কারবার গোটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে, তিনি তারও অবসান দাবি করেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পাওয়ার আন্দোলনের প্রয়োজনীয় শেষ হয়ে গেছে বলে যারা মনে করেন, তাদের ভুল ভাঙ্গনের কামনা প্রকাশ করে মওলানা ভাসানী বলেন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পূর্ব বাংলার অধিকার স্বীকৃত হয়নি, এর সংশোধনের জন্য আওয়ামী লীগকে সক্রিয় হতে হবে। পাশে উপবিষ্ট প্রধানমন্ত্রীর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তিনি পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের আশু প্রতিকারের ব্যবস্থা করার এবং অবিলম্বে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দানের দাবি জানান।

সতর্কবাণী উচ্চারণ করে এরপর মওলানা ভাসানী বলেন, না হলে ভবিষ্যতে আজ থেকে দশ বছর পর এমন সময় আসতে পারে যখন পূর্ব বাংলা ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলার প্রবণতা অনুভব করবে।

(জিবলু রহমান, ঘাটাইলডটকম)/-