আহমেদ ছফার জন্মদিন এবং কিছু কথা

লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ আহমদ ছফার জন্মদিন আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন)। ১৯৪৩ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান।

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন; একই বৎসরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে। পরে বাংলা বিভাগে ক্লাশ করা অব্যাহত রাখেননি। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পরীক্ষা দেন। তার পিএইচডি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

১৯৭১ সালে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ গঠন ও এর বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ নেন। ৭ই মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা’ হিসেবে প্রতিরোধ প্রকাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এপ্রিল মাসে কলকাতা চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সেখান থেকে দাবানল নামের পত্রিকা সম্পাদনা করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ফিরে লেখালেখি করতে থাকেন। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সহায়তায় কাঁটাবন বস্তিতে ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ চালু করেন।

পরে ১৯৮৬-তে জার্মান ভাষার ওপর গ্যেটে ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ডিগ্রিও লাভ করেন তিনি, যা তাকে পরবর্তী সময়ে গ্যেটের অমর সাহিত্যকর্ম ফাউস্ট অনুবাদে সহায়তা করেছিল।

আহমদ ছফা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন দীপ্তিময়ভাবে। গল্প, গান, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি মিলিয়ে তিরিশটির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার জনপ্রিয় লেখা হলো আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে লেখা “যদ্যপি আমার গুরু”, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাঙালি মুসলমানের মন, গাভী বিত্তান্ত, পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ, অলাতচক্র।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী আহমদ ছফা ১৯৭৫ সালে লেখক শিবির পুরস্কার ও ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমির সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে সাহিত্যে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের আটাশে জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মিরপুরের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

২।

মনীষী লেখক, দার্শনিক, ও কবি আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখার জন্য করোনাকালে কবিগুরুর বয়ানে ‘যাসনে ঘরের বাহিরে’ বিধান উপেক্ষা করে বাংলা একাডেমির ভেতরে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। গত ২৫ জুন তোলা ছবিগুলোর একটি আমার ফেসবুকে প্রকাশ করেছি। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ঢাকা শহরে অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকডজন শাখা থাকতে বাংলা একাডেমির শাখাটির ছবি কেন? এই কৈফিয়ত দেয়ার আগে দুটো কথা বলে নিতে চাই।

১৯৯৬-৯৭ খ্রিষ্টাব্দের কথা। সরকারি জগন্নাথ কলেজের (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র হলেও দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় সরকারি অফিসে অফিসে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে ও রিপোর্ট লিখতে। একটা রিপোর্ট প্রকাশ হলে তখন যে আনন্দ হতো এখন ৫০ হাজার টাকা পেলেও তার সমান আনন্দ পাই না। একটি লেখা প্রকাশ হলে সহপাঠীদের অনেকে ঈর্ষার চোখে দেখতো। তখন তা খুব মজার বিষয় ছিল।

তবে, এই লেখালেখিতে কত টাকা পেতাম তা সাংবাদিকদের বেতন-কড়ির খবর যারা রাখেন তাদেরকে আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। টাকা বড় বিষয় নয়, ছাপার অক্ষরে লেখা প্রকাশ হয়েছে সেটাই ছিল পরিতৃপ্তির বিষয়।

সেইসব দিনগুলোতে ঢাকার বাংলামোটরে আহমদ ছফার বাসা অথবা শাহবাগের আজিজ মার্কেটের আড্ডাখানায় প্রায় প্রতিদিনই যেতাম। আড্ডা ছাড়াও আমার কাজ ছিল ছফা ভাইয়ের লেখার ডিকটেশন নেয়া। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন ছফা ভাই। বিশেষ করে সাহিত্যপাতায় তার লেখা বেশি ছাপা হতো। তখন ডিজিটাল পদ্ধতি ছিল না। মোবাইলও ফোনও খুব কম ছিল।

ছফা ভাইয়ের একটা ৯৬৬.. টিএন্ডটি নম্বর থাকলেও আমার কোন ফোনই ছিল না। অগত্যা ফোন-ফ্যাক্সের দোকান থেকে মাঝে-মধ্যে ফোন দিয়ে জেনে নিতাম কখন কোন লেখার জন্য বাসায় অথবা আজিজে যেতে হবে। এই যে টাকা নেই তারপরও টাকা খরচ করে ফোন করতাম কেন? আমার লাভের জন্যই। দুইভাবে লাভ। যেসব লেখার ডিকটেশন নিতাম সেগুলোতে  লেখক ছফা ভাইয়ের নাম থাকতো। আর নিচে লেখা থাকতো, অনুলিখন: সিদ্দিকুর রহমান খান।

ছফা ভাইয়ের লেখার সাথে আমার নাম যাচ্ছে তা সে সময় আমার কাছে এটার যে কি মূল্য তা এখন পুরোটা বোঝাতে পারবো না। রীতিমতো গর্ব করতাম। এখানেও সহপাঠী ও সহকর্মী সাংবাদিকদের ঈর্ষাপরায়ণতাটাকে উপভোগ করতাম। ওই সময়ে ছফার মতো মনীষীর নামের সাথে আমার নাম ইত্তেফাক, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হওয়াকে বিশাল পাওয়া মনে করতাম।

দৈনিক পত্রিকার হার্ড রিপোর্টার হিসেবে নিজের লেখা হাজার হাজার রিপোর্ট প্রকাশ হলেও ছফা ভাইয়ের নামের সাথে আমার নাম প্রকাশ হওয়াটাকেই আমার কাছে ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন মর্যাদার মনে হতো, এখনও হয়। এখনও মনে করি বিশাল সৌভাগ্য আমার, ছফার এ্যাতো এ্যাতো স্নেহ পেয়েছি। এখনও কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘সিদ্দিক, আপনার সাথে তো আহমদ ছফার জানাশোনা ছিল, তাই না। তখন ঘুরিয়ে আমি বলি, শুধু পরিচয় ছিল না। আহমাদ ছফার অনেকগুলো প্রবন্ধ/নিবন্ধ ও বইয়ের মধ্যে যে সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমান খানের উল্লেখ দেখেন সেই সিদ্দিকুর রহমানই আমি’।

প্রিয় পাঠক, এবার আসি অগ্রণী ব্যাংকের ছবি তোলা প্রসঙ্গে। ২৫ জুন ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। দেখলাম আগের সেই জীর্ণ ভবনটি নেই। কাঁচঘেরা অত্যাধুনিক এক ভবন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে মনে পড়ছিল সেই ম্যানেজার সাহেবের কথা। তাঁর নামটি অনেকবছর মনে রেখেছিলাম, এখন মনে পড়ছে না। এই ম্যানেজার সাহেব অন্য দশজন ম্যানেজারের চেয়ে আলাদা। আহমদ ছফার সাথে সখ্য না থাকলেও ছফার লেখালেখি এবং আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানা ছিল তাঁর।

খুব সম্ভবত ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের শেষদিকে। দুদিন ধরে ছফা ভাই আমাকে বলছেন, সিদ্দিক তোমাকে কিছু টাকা দেবো। আমার খুব খুশি হওয়ার কথা থাকলেও জানতাম ছফা ভাইয়ের টাকা নেই। তাই নিম্ন স্বরে বলতাম, না ভাই, দরকার নেই। আমি অফিস থেকে কদিন আগেই কিছু টাকা পেয়েছি। যদিও সংবাদপত্র অফিস থেকে টাকা পাওয়ার কথাগুলো কতটা সত্য বা সত্যের কাছাকাছি তা আমি ছাড়া আর কে জানতো!

যাহোক, এক সকালে ছফা ভাইয়ের বাসায় গেলাম। এক নাগাড়ে তিনটা বড় লেখা লিখতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। তখন কর্ণফুলি পেপার কোম্পানির লম্বা সাইজের সাদা কাগজে লিখতেন ছফা ভাই। এক পাতায় লিখতে হতো। এপিঠ-ওপিঠ লিখতে মানা। লেখা শেষে আমার হাতে একট চেক দিলেন। চেকের দিকে তাকালাম না। ভাজ করে পকেটেও ঢুকালাম না। শুধু বললাম ছফা ভাই লাগবে না। বললেন, তাড়াতাড়ি যাও ব্যাংক আওয়ার শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলামোটর থেকে মনে হয় বাংলা একাডেমির অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় যেতে আমার পনেরো মিনিটের বেশি লাগেনি। অগ্রণী ব্যাংকে ঢুকে চেকটা দিতে চাইলাম একজনের কাছে, তিনি ইশারা করে বললেন, এখানে না ওখানে। গেলাম সেই ডেস্কে। চেকটা রেখে একটা পিতলের টোকেন ধরিয়ে দিল মনে হয়। পুরোটা মনে পড়ছে না। কিছুক্ষণ পড়ে একজন অফিস সহকারী টাইপের ভদ্রলোক লোক এসে বললেন, সিদ্দিকুর রহমান খান কে? আমি এগিয়ে গেলাম। বললেন, আসেন আমার সাথে। তিনি নিয়ে গেলেন ম্যানেজার সাহেবের রুমে। ম্যানেজারের হাতে থাকা চেকটার দিকে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম লাল কালি দিয়ে কি যেন লিখেছেন ব্যাংকেরই কেউ। আমাকে আর টাকা দেবে না এমনটা সন্দেহ হলো। মন খারাপ হলেও বুঝতে না দেয়ার চেষ্টা করে যেতে থাকলাম।

চশমার ফাঁক দিয়ে ম্যানেজার সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ছফা সাহেব আপনার কি হন? আমি কি করি? কখন এই চেক লিখে দিয়েছেন ছফা সাহেব? এ্যাতো এ্যাতো প্রশ্ন শুনে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবুও জবাব দিলাম। সব  শেষে জিজ্ঞেস করলেন, এই টাকা দিয়ে আমি কি করবো? আমার উত্তর শুনে ম্যানেজার সাহেব খুব খুশি হয়েছেন মনে হলো। লাল কালি দিয়ে আকাঁবুকি করা চেকটার ওপর ফের কি যেন লিখলেন ম্যানেজার সাহেব। ক্যাশিয়ার বা ক্যাশ শাখার কেউ একজনের সাথে ম্যানেজারের আলাপে বুঝলাম ছফা ভাইয়ের ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তিনশ টাকা ছিল না। দুশো অথবা দুশো পঞ্চাশ টাকার মতো ছিল। তবু, মনীষী ছফার চেকটি ডিজঅনার করেননি। তিনশ টাকাই দিয়েছিলেন আমাকে।

ম্যানেজার সাহেব আমাকে বললেন, ছফা সাহেবকে বলবেন, খুব তাড়াতাড়ি যেন কিছু টাকা এই শাখায় জমা রাখেন। ম্যানেজারের মুখের দিক তাকিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে বের হলাম। ক্যাশ শাখা থেকে একজন ডেকে নিয়ে আমাকে তিনশ টাকা দিলেন। আমি ব্যাংকের ভেতরে থেকেই গোপন পকেটে টাকাগুলো ঢুকিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করলাম ছফা ভাইয়ের বাসার দিকে। এবার পকেটে টাকা আছে। এবার মনে হয় দশ মিনিটে  পৌঁছে গেলাম বাংলামোটরে।

টাকাগুলো হাতে দিতে চাইলে ছফা বললেন, ‘আরে বোকা এটাতো তোমাকে দিয়েছি। যাও অফিসে যাও। কাল বিকেলে আজিজে এসো। মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে আজকের কাগজের জন্য একটা লেখা দিতে হবে। সাহিত্য সম্পাদক সালাম সালাহউদ্দিন সাহেব ফোন দিয়েছিল।’

আমার কাছে মনে হলো ম্যানেজার সাহেব যা বলেছেন এবং আমিও ম্যানেজারের প্রশ্নবানে যে ভড়কে গিয়েছিলাম তা ছফা ভাইকে বলা দরকার। সবশেষে বললাম, ম্যানেজার বলেছেন খুব শিগগিরই যেন কিছু টাকা জমা রাখেন। শুনে হেসে দিলেন ছফা। বললেন, বুঝতে পেরেছো, তিনশ টাকা ছিল না আমার এ্যাকাউন্টে। তবুও তোমাকে টাকা দিলেন। ম্যানেজারের নামটা আবার বলো সিদ্দিক।’

পাদটীকা : দুই যুগেরও বেশি সময় আগের ছফাভক্ত সেই অসাধারণ ম্যানেজারের নামটা ভুলে যাওয়া বা তার খোঁজ না রাখা আজও আমার কাছে অপরাধ মনে হয়। আর মাত্র কয়েকবছর আগে সরকারি বেসিক ব্যাংক যে ‘সরল বিশ্বাসে, কোনো কাগজ বা গ্যারান্টার ছাড়াই এক ব্যক্তিকে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দিলেন।’ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনগুলো এবং ঋণ গ্রহীতার নাম এবং বেসিক ব্যাংকের সেই শাখার ম্যানেজারের নাম মনে রাখাও অপরাধ!

আহমদ ছফা বেঁচে থাকলে এইসব অপরাধের রকমফের নিয়ে দারুণ লিখতেন। তাঁকে মিস করি, তাঁর লেখা মিস করি।

৩।

আহমদ ছফার একটি কবিতা বা গান নিয়ে এই লেখা।
ঘরে পরে তফাৎ আমার
কখন গেছে মুছে
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।
আসতে যেতে নানান মানুষ
ঘরের খবর লয়
আমার কখন ঘর ছিল কি
মনেতে সংশয়
হাল সাকিনের লজ্জা আমার
কেমনে জানি মুছে।

যদি বলি ঘরটি হবে
সাগর জলের নিচে
ঘাড় দুলিয়ে বলবে মানুষ
কখখনো নয় মিছে
নিত্যি নতুন ঘরের খবর
শ্রবণে না রুচে।
যদি বলি ঘরটি হবে
নীল আকাশের নীলে
মিটিমিটি চেরাগ জ্বলা
লক্ষ তারার বিলে
বলবে মানুষ সে সব খবর
সত্য হবার নয়
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।

আহিতাগ্নি/আহমদ ছফা


পরকে আঁকিবার এহেন দৌলতের নাম পরকীয়া। মানে পরকে পরখ করিয়া লওয়া। মনকে আঁকিয়া লওয়া বলা যাইবে।


জার্মান গুরুকবি যোহান ভলফ্‌গ্যাঙ ফন গ্যেটে তাহার জীবনের ‘সত্য আর কল্পনা’ (Dichtung und wahrheit) বহিতে সাংঘাতিক ঘটনা চাউর করিয়াছেন। বহিতে ওয়ের্থার রচনায় গ্যেটের ভাষ্য, ‘আমি এক ইংরেজ ভদ্রলোকের গল্প শুনিয়াছি। যিনি নিত্যদিন পোশাক বদলের বিড়ম্বনার হাত হইতে বাঁচিবার তাগিদে গলায় রশি দিয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন। অপর একজন চিত্তবৈভবের প্রভু। একদিন বাগানে বেড়াইতে বেড়াইতে চিৎকার করিয়া বলিলেন, বৃষ্টি ভরা মেঘের পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে যাইবার দৃশ্যই কি আমাকে জীবনভর দেখিতে হইবে? তেসরা, আমার দেশের এক বিখ্যাত আদমি—যিনি বসন্তে পত্রপল্লবে সবুজ দেখিয়া যারপরনাই ক্লান্ত হইয়া বলিলেন, এইবার না হয় তো লাল হইতে পারিত! কত না নানা রকমফেরে মানবসন্তান আত্মহত্যা করিতেছে।’ তিন আদমির আত্মহত্যা কি সরল পদার্থ? গ্যেটে আরো জানাইতেছেন, ইংরেজ জাতি কথায় কথায় আত্মহত্যা করিতে উস্তাদ।

গ্যেটে কারণ হিশাবে দেখাইতেন, জীবনের বড় দায় দেহ আর মনের। কেননা মনের দায় মিটাইতে না পারিলে জীবনের দায় মিটাইবে কী করিয়া? মন তো দেহের মহাশয় বটে। মনে জাগিলে দেহ তাহা ঘটাইবে। আর জীবন তাহাতে ভর করিয়া চলে। চলা আর চালাইবার গতিই তো মন। দেহ তার আধার মাত্র। তাহা নহে কি? তাঁহার চারিত ঘটনায় তিন আদমির আত্মহত্যার কারণ কি সামান্য? তাহা অতি কম নহে, বরং বেশি। দুনিয়াবি সাহিত্যের বাজারে শোনা, মহাত্মা গ্যেটে মনের জগতে খুঁড়িয়া বেড়াইতেন। গ্যেটে তরুণ বয়সে রাতালি সময়ে বুকের ’পরে নাঙা ছুরি ঘুরাইতেন। আর মৃত্যুকে কিভাবে সহজ করা যায় তাহাই ভাবিতেন। তো গ্যেটের লাহান আহমদ ছফাও নাকি কোমরে বিষের বোতল রাখিতেন। এহেন রাখার ভিতরে গ্যেটের ভাব কি ছফার ভিতরে ছিল? তবে সত্য, দৈহিকভাবে গ্যেটে আত্মহত্যা করেন নাই। আর বিষ পান করেন নাই আহমদ ছফাও। দুই মনীষীর ভিতর অদ্ভুত মিল এইখানে।

তাহারা হয়তো ভাবিয়াছিলেন, এই জীবন লইয়া কী করিব? কোথায় রাখিব দেহ? শুদ্ধ ‘ঘর’ নামক বোতলে বন্দি করিলে জীবন-নামক পদার্থের পদ খাটো হইতেছে। তাহাতে পরও দরকার। পরকে আঁকিবার এহেন দৌলতের নাম পরকীয়া। মানে পরকে পরখ করিয়া লওয়া। মনকে আঁকিয়া লওয়া বলা যাইবে। আর পর বাসা বাধিলেই ঘর বাক্য হইয়া ওঠে?

বাংলার মনীষী আহমদ ছফার কবিখ্যাতি বিশেষ নাই, এহেন কথা আমরা হলফ করিয়া বলিতে পারিব না। কবিখ্যাতি তাহার গানের লাহান। গান টান মারিলে প্রাণও নড়িয়া ওঠে। টান দেখিব কিসে? কবি হিশেবে তাহার বিশেষ কুখ্যাতিও রহিয়াছে তেমন সাক্ষ্য-প্রমাণ নাই। তাহার কারণ বিস্তর। কারণের আস্তর তুলিতে আমাদের পাড়া কথা খানিক পাড়াতে পাড়াতে রটাইব। আমাদের রটনার নাম ‘সত্য’। আস্তরের নাম ‘মায়া’। জনে জনে জিজ্ঞাসিতে পারেন, সত্যের জমিনে মায়া কী পদার্থ? বাংলা চিন্তার জগতে ‘মায়া’ বা ‘মা’ স্ত্রীলিঙ্গ বিশেষ। আমরা মায়ার অন্য অর্থ দেখিতে পাইতেছি। মায়া মানে মা ভাবের আয়া। আয়া ভাব মা ডাকিলেই মায়া ভাব জাগিয়া যায়। বলা যাইতে পারে, মা ভাব যাহাতে আসিয়া বাসা বাঁধে। এই বাঁধা লিঙ্গের বাঁধা নহে। তাহা লিঙ্গেরও অধিক কিছু বাড়া। এহেন ‘বাড়া’কে কি আমরা কায়া বলিতে পারি? না, তাহাতেও এক বেহায়াপনা মাথাচাড়া দিয়া উঠিতেছে। তাহা ছায়া বা ঘর। ভাবার্থ ধরিলে ‘ঘর’ মালটা তো আস্তর অশেষ। আস্তরের পলেস্তরা খসিলে গোপন রহস্য আর গোপন থাকিতেছে না। তাহাতে ছায়াও ছায়াহীন হইয়া পড়ে। ঘরও পাইতেছে পরের আকার। ঘরকে পরের রূপই তো পরকে অপর করিবার আদি নিয়ম। তাহা কী রকম?


ইংরাজ বুদ্ধিজীবী জন মিল্টনের মতে, সহজ-সরল, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও আবেগের চেরাগ জ্বালানোই কবিতা।


মহাত্মা ছফা রচিত অনেক কবিতায় ঘরের খবর চাউর করিয়াছেন। আলোচনার স্বার্থে আমরা মহাত্মা আহমদ ছফার আহিতাগ্নির বার নম্বর কবিতাখানি বাছিয়া লইলাম। ছফার কবিতায় তথাকথিত আধুনিকতাবাদীদের মতো ভানভণিতা নাই। নাই কলাকৈবল্যবাদীদের আঙ্গিকের বৈকল্য। আঙ্গিক যাহাতে বিষয়াবলিকে ক্ষুণ্ন করিয়া থাকে ছফা সেই আইলে পা রাখেন নাই। ফলে তাহার কবিতা কাইলও পড়া যাইতে পারে। তাহার কবিতার সরল তর্জমা এই—জগৎসংসারে তিনি ঘর আর পরের তফাৎ ঘুচাইয়া ফেলিয়াছেন। তবুও লোকে তাহাকে পুছ করিতেছে ঘরের খবর। লোকের এহেন জিজ্ঞাসায় ছফার মনে সংশয়—আমার কখনো ঘর ছিল কি?

কবি কহেন, সাগর জলের নিচে কিংবা নীল আকাশের নীলে আমার ঘর। না না, তাহাতে লোকে কয়, সেসব খবর সত্য নয়। তাহার পরও লোকে পুছে ঘরের খবর কী! মানবসংসারে এহেন কলা কাঁদির মতো যেন আঁটি আঁটি ঝুলিয়া থাকে। গোপন বাসরেও সার সার কলা ঝুলিয়া আছে যেন!

ইংরাজ বুদ্ধিজীবী জন মিল্টনের মতে, সহজ-সরল, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও আবেগের চেরাগ জ্বালানোই কবিতা। ইন্দ্রিয় তো আবেগের বায়ুধার। প্রশ্ন জাগিতেছে, কবিতার আয়ুই-বা কোথায়? যাহা ইন্দ্রিয়ানুভূতি আবেগের আধার তাহা কি সহজ সরল হইবে? না সেই রকম সরল শপথ কবিতায় নাই। এমন ধরাবাঁধা বালাই কবিতা কতখানি কবিতা তাহাও দেখিবার বিষয় বটে। কেননা একক বান্দার চেতনা তাহার অস্তিত্ব নির্ধারণ করিতেছে না। তাহার অস্তিত্ব নির্ধারণ করিতেছে ব্যক্তির অপর। পর-অপরের সম্বন্ধের নামই তো মিলন।

যাহাকে আমরা ছপ্পর মারিতেছি সামাজিক চেতনা বলিয়া। এই চেতনা একা চলিতেছে না। একা চলিতেই পারে না। তাহার অঙ্গে সঙ্গ চায়। এইরূপ সঙ্গ অপরের সহিত সম্বন্ধ করিতেছে। করিতেছে কি?

ধুরন্ধর কবি জন মিল্টনের এহেন তত্ত্বকে খানিক আড়মোড়া মারিয়াছেন স্পেনের যুদ্ধে শহিদ ইংরাজ বুদ্ধিজীবী র‌্যাল্ফ ফক্স (১৯৯০-১৯৩৭)। ফক্স তাহার কাহানি ও মানুষ বহিতে কহিলেন অন্যকথা, ‘সৃজনের মর্ম পরম, যাহা বাস্তবের লড়াই’। আর এই বাস্তবের ভিতর দিয়া সত্যের উৎপাদন করা। বাস্তব নির্ধারিত হইলে অবাস্তবও নির্ধারিত হইবে। কেননা বাস্তবের অচিন রূপ অবাস্তব বটেন। আর বাস্তবই বলিতেছে অবাস্তব কী মাল! মিল্টনের বড় দোষ কবিতার সংজ্ঞায় ভাষা প্রশ্নখানি মীমাংসা করেন নাই। আমরা বলিতেছি না, ভাষা মাত্র চরম। বলিতেছি ভাষার পরমের কথা। কহিতে শরম নাই আজি। তাহা কী?


ছফা বর্ণিত ‘আমার’ শুধু আত্মরতির ‘আমি’ বা নিছক ‘বান্দা’ থাকিতেছে না। ‘আমার’ হইতেছে তফাৎ ঘর আর পরের যৌথ উৎপাদন।


পশ্চিমের ডাহা ডাহা পণ্ডিতেরা বলিয়াছেন, ভাষা পদার্থখানি প্রকৃতি সারিত। মানে বস্তু বিশেষের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ। প্রশ্ন জাগিতেছে, ভাব মালটা আসে কোথা হইতে? খোদ বস্তু হইতে নাকি পরমের কোঠা হইতে? বলা দরকার, বস্তুমাত্র ভাব। ভাব মাত্রই বস্তু নহে, বস্তুর অধিক কিছু। তাহা হইলে অধিক কিছুই পরম নয় কি? যাহাতে বন্তু ও পর ভাবের ওম পায়। জনে জনে জিজ্ঞাসিতে পারেন, ছফার কবিতায় ভাবের ওম বহিতেছে কোথায়? উত্তর উপরে নহে, গভীরে।

জন মিল্টনের পাটাতনে বসিয়া খালি কতক ইংরাজ কবি নহে, কত কত বাঙালি কবি শহিদ হইয়াছেন তাহার খবর রাখিতেছে কে? প্রভু যুদ্ধের ময়দান কতদূর? নদ আর নদীতে কতইবা রক্ত বহিতেছে আর। নিছক ইন্দ্রিয়ানুভূতির আবেগের রসে ছফা সিক্ত হইতে চাহেন নাই। ছফা খানিক রক্তাক্ত হইয়াছেন। তাই ছফার মন সংশয়ী। কবিতায় তাহার জিজ্ঞাসা, আমার কখনো ঘর ছিল কি? সকলেই জানেন, বাংলা তালুকে ছফা জমিনদারির প্রভু হয়েন নাই। ব্যক্তিগত জীবনে ধুরন্ধর বুদ্ধিকে পুঁজি করিয়া রাষ্ট্রের অর্থকড়িও বেহাত করেন নাই। এই না করিবার আদিতে কি সামাজিক চেতনা কাজ করিয়াছে? বাংলা অর্থবিদ্যা মতে, ‘ঘর’ শব্দখানি সংসার আর খানিক বাসস্থান অর্থে চালু। ছফার কবিতায় ঘর শব্দখানি আরো নতুন অর্থে গড়া। তাহা কেমন?

তাহার কবিতার ভাষ্য—

ঘরে পরে তফাৎ আমার
কখন গেছে ঘুচে
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।

ছফার জগতে ঘর আর পরে ফারাক ঘুচিয়া গিয়াছে। কেননা ‘তফাৎ’ বা ‘বৈষম্য’ বিরুদ্ধে লড়াই তাহার সার। ভাবের লড়াইয়ে জয়ী হইয়াছেন ছফা। কেননা ছফা বর্ণিত ‘আমার’ শুধু আত্মরতির ‘আমি’ বা নিছক ‘বান্দা’ থাকিতেছে না। ‘আমার’ হইতেছে তফাৎ ঘর আর পরের যৌথ উৎপাদন। মানে বান্দার সহিত সম্পর্কিত পরমার বা সামাজিক মালিকানা। কেননা আত্মরতির আমি কানাই কানা। এই কানা না পারে দেখিতে না পারে বিলাইতে। কহিতে পারেন, ‘ইহাই ছফার ইউটোপিয়া’। ভাববেত্তা টমাস মোরের সন্দেশ হইলেও মন্দ শোনাইত না। না দেশ না পরদেশ।

প্রশ্ন খাড়াইতেছে, মায়ের ভগ হইতে ভাগ হইয়া বান্দা বা সন্তান ‘আমার’ বলিতেছে কেন? কারণ আমার ভাগ বা গর্ভে দুই পদ। একপদে আম বা তামাম, অন্য পদের নাম ‘আর’ সকল পদার্থকে লইয়া। আম অপর অপর অর্থ বিলাইলে গণ হইবে। এহেন মহামিলনের সন্ধান যাহারা পাইয়াছেন তাহারাই ‘মানুষ’ সাব্যস্ত হইয়াছেন। আর যাহারা পান নাই তাহারা বুর্জোয়া সমাজের অর্থ-মাংস-খেকো ‘সুশীল সমাজ’ হইতেছেন। দেখা যাইতেছে, ‘তবু’ অব্যয় মারিয়া কাহারা ছফাকে ঘরের খবর পুছ করিতেছে।


সুশীল সমাজ রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ব্যক্তি স্বার্থের প্রদায়ক। ছফা কথিত ‘লোক’ নামক গণ্ডুষই তো সুশীল সমাজ।


‘সুশীল সমাজ’ নয় কি? ছফাও তাহাদের ‘তবু’ বা ‘অব্যয়’ পদের কুঠুরিতে টুকাইয়াছেন। এই তবু ‘ধুরন্ধর’ ওর্ফে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলিয়া সাব্যস্ত। ‘সুশীল সমাজ’ নামক উপজাতখানি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সরল ক্রীড়নক। রাষ্ট্র তাহাদের লইয়া খেলে এবং খেলায়! রাষ্ট্র ও সুশীল (ওর্ফে বুর্জোয়া) সমাজই তো নিপীড়ন-সমাজের হোতা। কেননা সুশীল সমাজ রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ব্যক্তি স্বার্থের প্রদায়ক। ছফা কথিত ‘লোক’ নামক গণ্ডুষই তো সুশীল সমাজ।

তো আহমদ ছফার কবিতা কী পদার্থ? ইন্দ্রিয় আবেগের বশে যাহারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মর্ষকাম করিতেছেন, হয়তো তাহাদের কাছে ছফার কবিতা কবিতা-পদবাচ্য নহে। কবিতাখানি কবিতার অধিক গান। যাহা টান মারিয়া প্রাণকে জাগায়। এই প্রাণ পরকে জড়াইয়া ধরে। আর প্রাণ তাহাতে যৌথ জীবনের সামাজিক মর্ম ভেদিয়া ওঠে। আমরা বলিতেছি, কবিতাই তো যৌথ চেতনার সামাজিক মালিকানা। কারণ ভাষা ভাষাকে বিলায়। আলয়ে তাহার অর্থ হয়। তাহা নয় কি?

মহাত্মা ফিদারিক এঙ্গেলস ১৮৯০ নাগাদ জে ব্রশের সকাশে চিরকুট লিখিয়াছেন। তাহার ভাষ্য, ‘ইতিহাসের উপাদান শেষ নাগাদ জীবনের সত্য চাষ আর তাহার পুনরুৎপাদন করিয়া যাওয়া।’ তবে ইহাকে নিছক অর্থনৈতিক কোঠায় একমাত্র নির্ধারক উপাদন বলিলে ভুলে পর্যবসিত হইবার শঙ্কা থাকিতেছে। এই শঙ্কা মহামতি এঙ্গেলসের। তো পুড়িয়া পুড়িয়া কতখানি অঙ্গার হইলে ইতিহাস খাঁটি সোনা হয়? ছফার বয়ানে তাহাই তো ‘আহিতাগ্নি’। বাংলা ভাববিদ্যা মতে, আগুনের হিত ইতিহাসের গোড়া আহিতাগ্নি। ইতিহাসের আগুনে যাহা সম্পাদিত হয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বায়ুরোগের বাসনা তাহাতে নাই। কী আছে?

জর্মান বাড়ির দার্শনিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড ‘স্বপ্নের বয়ান’ বহিতে এক স্বপ্নদর্শির কথা চাউর করিয়াছেন। ফ্রয়েডের জবানে, এক ব্যক্তির ছাওয়াল গত হইয়াছে। চলরীতি মোতাবেক ছাওয়ালের চারিদিকে চেরাগ জ্বালানো হইল। পাহারা বসাইতে ভাড়া করা হইল লোক। পাশের ঘরে নিদ্রামগ্ন পিতা। দুই ঘরের দরজা খোলা। পিতা স্বপ্নে দেখিলেন অদ্ভুত! ছাওয়াল তাহার সামনে দাঁড়াইয়া বলিতেছে—আব্বাজান, দেখিতেছেন না আমি পুড়িতেছি। পিতার ঘুম ভাঙিয়া গেল। পাশের ঘরে দেখিলেন পাহারাদার ঘুমে অচেতন। একটি জ্বলন্ত কুপি পড়িয়া মরা সন্তানের গায়ে আগুন লাগিয়াছে। ফলে সন্তানের একখানা হাত পুড়িয়া গিয়াছে।

ইহাতে আমরা দেখিলাম সত্যের কেরামতি। ঘর ও পর কিভাবে সত্যের মুখোমুখি হইতেছে। মুখোমুখি হইতেছে পিতা আর ছাওয়াল। মনের ঘর ইহাতে অপর কুঠুরিও ভেদ করিয়াছে। কেননা পিতার বাসনায় ছাওয়ালের মরণ নাই। হয়তো এহেন বাসনাই সত্যের কুঠুরি। যাহা সত্য আকারে স্বপ্ন রূপ লাভ করিয়াছে। তবে সত্যের মুখোমুখি হইবার নাম কি বাসনা? যে বাসনার মৃত্যু নাই। জাগিবার আগে বারবার জাগায়। জাগে বারবার সামাজিক মালিকানায়। আহমদ ছফায়।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email