‘আসসালামুআলাইকুম- তোমরা তোমাদের পথে যাও, আমাদের পথ আমরা বেছে নেব’

“… ১৯৫৭ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ টাঙ্গাইলের কাগমারীতে এক ঐতিহাসিক বার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে আলোচিত মূল বিষয়গুলো ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসন আর আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত নিরপেক্ষ ও যে কোনো সামরিক মৈত্রীবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি। সভায় সভাপতিত্ব করেন করেন মওলানা ভাসানী। তাতে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় পার্টির নেতা ও আওয়ামী লীগের টিকেট থেকে নির্বাচিত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

মওলানা যখন নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির পক্ষাবলম্বন এবং পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে শোষণ চালানোর অভিযোগ তুলছিলেন তখন সোহরাওয়ার্দী দৃঢ়তার সঙ্গে দাবী করেন যে, “৯৮ শতাংশ স্বায়ত্ত্বশাসন ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে”। তিনি পাকিস্তান স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তি ও কেন্দ্র কর্তৃক গৃহীত অর্থনৈতিক নীতিমালার পক্ষেও রায় দেন।

এই সম্মেলনেই মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক শোষণ চালানোর সমালোচনা করে তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, “তোমরা যদি পূর্ব পাকিস্তানে তোমাদের শোষণ অব্যাহত রাখতে চাও, যদি তোমরা পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবী মেনে না নাও, তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কাছে আমার একটাই বক্তব্য আছে – তা হলো – আসসালামুআলাইকুম – তোমরা তোমাদের পথে যাও, আমাদের পথ আমরা বেছে নেব।”

তাৎক্ষণিকভাবে মওলানাকে একজন কমিউনিস্ট, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ও সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন পত্রিকাগুলোতে মওলানার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে জাতীয় রাজনীতি থেকে তাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার প্রচেষ্টা চালানো হয়। আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রে অবস্থানরত তার সরকার এই কাজে সক্রিয় অবদান রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সমর্থকরা মওলানার প্রতি সমর্থন প্রদানকারী বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের নির্দয়ভাবে প্রহার করে। এই ক্যাম্পাস যুদ্ধে মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামীসহ অন্যান্য বামপন্থী দলের সদস্যরা ছাত্রলীগের সঙ্গে যোগ দেয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রবক্তা হিসেবে চিহ্নিত করে বামপন্থী ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করার উদ্যোগ নেয়। তাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী, পাকিস্তানবিরোধী ও ভারতের দালাল হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।

এতে করে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্ত্বশাসনবাদীরা মওলানা এবং সোহরাওয়ার্দীর পক্ষাবলম্বন করে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যান। শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর ডান হাত হিসেবে তার সকল কাজ ও ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়ে শেষোক্ত পক্ষে অবস্থান নেন। এভাবে সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগের মূল অংশ পাকিস্তানের “জাতীয় সংহতির রক্ষক” হিসেবে চিহ্নিত হন।

এর ফলে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী নির্বাহী কমিটির অপর আট জন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানের প্রগতিশীল মনোভাবাপন্নদের এক প্লাটফর্মে সমবেত করার মানসে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেন।

সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব মওলানা এবং বাম শক্তির ক্ষমতা ভুলুন্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান। তারা সব রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যাতে করে নতুন রাজনৈতিক দলটি ভালোভাবে কাজ শুরু করতে না পারে।

এ অবস্থায় মওলানা ভাসানী ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই সকল প্রগতিশীল শক্তির সমন্বয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করলে সেই সম্মেলন হলের বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের সংগঠিত হামলার সম্মুখীন হয়। শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ আদেশে তার সহযোগিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলো থেকে বাসভর্তি ইট, পঁচা ডিম ও হকিস্টিকধারী ছাত্র জোগাড় করে সম্মেলনে আক্রমণ চালান।

তখন কেন্দ্র ও প্রদেশ উভয় স্থানেই ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের বিক্ষোভকারীরা সমবেতভাবে মওলানা ভাসানীর “রাষ্ট্রবিরোধী সম্মেলনে” হামলা চালায়। তাদের মতে, মওলানা “পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার” লক্ষ্যে সেই পার্টি গঠন করতে যাচ্ছিলেন।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর ইষ্টক বর্ষণ ও পঁচা ডিম নিক্ষেপ করা হয়। পুলিশ তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে বিক্ষোভকারীদের হামলা চালানোর সুযোগ দেয়। পরের দিন নবগঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) পল্টন ময়দানে প্রথম জনসভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পুলিশ তাতে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করেনি॥”

– মওদুদ আহমদ / বাংলাদেশ : স্বায়ত্ত্বশাসন থেকে স্বাধীনতা ॥ [ ইউপিএল – ২০০৩ । পৃ:৪৮-৪৯ ]