আশুরা দিনটি মুসলিমদের জন্য কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ

আরবি বর্ষের প্রথম মাস, অর্থাৎ মহরম মাসের ১০ তারিখ মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনটি আশুরা হিসেবে পরিচিত।

ইসলামি বর্ষপঞ্জিতে যে চারটি মাস মুসলিমদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে মহররম অন্যতম। ১০ই মহররম দিনটিকে ‘বিশেষ মর্যাদার’ দৃষ্টিতে দেখে মুসলিমরা।

ইসলামের ভেতর দুটি মত- সুন্নি এবং শিয়া- উভয়ের কাছেই আশুরার দিনটি গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, আশুরা বা ১০ই মহররম দিনটি মুসলিমদের জন্য নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন নবী মোহাম্মদের সময় থেকে মুসলিমরা ১০ই মহররম পালন করতো। এর পেছনে নানা ধর্মীয় বিশ্বাস নিহিত ছিল।

মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, এই দিনটিতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে এবং এই দিনেই পৃথিবী ধ্বংস হবে, যেটি মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী কেয়ামতের দিন।

এছাড়া ইসলামের দৃষ্টিতে যারা নবী এবং রসুল বলে পরিচিত তাদের জীবনে এই দিনটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটছে বলে বিশ্বাস করেন মুসলিমরা।

অধ্যাপক রশিদ বলেন, মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী ১০ই মহররম ইসলামের নবী এবং পয়গম্বরদের কেন্দ্র করে নানা ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোর স্মরণ করেই নবী মোহাম্মদের সময়কাল থেকে এই দিনটি পালন করা হতো।

পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয়েছে কারবালার ঘটনা।

৬৮০ সালে এই দিনে বর্তমান ইরাকের কারবালা নামক স্থানে ইসলামের নবী মোহাম্মদের দৌহিত্র হোসাইন ইবনে আলীকে, যিনি ইমাম হোসাইন নামে পরিচিত, প্রতিপক্ষ হত্যা করে।

এরপর থেকে এই ঘটনাটিও যুক্ত হয় আশুরা পালন করার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে শিয়া মতাবলম্বীরা এই ঘটনাটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সুন্নি মতাবলম্বীদের কাছেও এই ঘটনাটি গুরুত্ব বহন করে।

মুসলিমদের অনেকেই আশুরারা দিন রোজা রাখেন। অনেকে আশুরার আগের দিন এবং পরেরদিনও রোজা পালন করেন।

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে রমজান মাস চালুর আগে আশুরার দিন রোজা পালন করা বাধ্যতামূলক ছিল।

সুন্নি মুসলিমদের অনেকেই ১০ই মহররম বাড়িতে ভালো খাবারের আয়োজন করেন। বাংলাদেশে অনেকের মাঝে এই প্রথা প্রচলিত আছে।

কিন্তু ইসলামী চিন্তাবিদরা মনে করেন, আশুরার দিনে ভালো খাবারের আয়োজন করতেই হবে – এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, এই দিনটিতে ইসলামের নবী মোহাম্মদের পরিবারের যেসব সদস্য মারা গেছেন তাদের জন্য দোয়া পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে সুন্নি এবং শিয়া মতাবলম্বীদের অনেকেই বাড়তি নামাজ আদায় করেন।

তবে সুন্নি মুসলিমদের চেয়ে শিয়া মুসলিমরা আশুরার দিনটিকে যেভাবে পালন করেন সেটি বেশ চোখে পড়ার মতো।

বিভিন্ন জায়গায় তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিয়া মতাবলম্বীরা তাদের নিজেরে শরীরে ছুরি মেরে কষ্ট অনুভব করেন।

তাদের বিশ্বাস নবী মোহাম্মদের দৌহিত্র হোসাইনকে হত্যার সময় যে তিনি যে কষ্ট পেয়েছিলেন, তারাও নিজেদের পিঠে ছুরি মেরে সে কষ্ট অনুভবের চেষ্টা করেন।

তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। বাংলাদেশে যেসব তাজিয়া মিছিল বের হয় সেখানে প্রচুর সুন্নি মতাবলম্বীরাও অংশ নেয়।

বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ১০ই মহররমকে সরকারিভাবে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়।

এদিন সরকারি ছুটিও থাকে সবসময়।

কোরআন কারিমে রয়েছে, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারো, তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।’ (সুরা-৯, তাওবা, আয়াত: ৩৬)।

হাদিস শরিফে মহররমকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে ‘অতি সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ চার মাস’ বলতে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব—এই চার মাসকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাজহারি)।

আশুরার দিন রোজা রাখা সুন্নাত। আশুরার রোজা সব নবীর আমলেই ছিল।

নবী করিম (সা.) মক্কায় থাকতেও আশুরার রোজা পালন করতেন। হিজরতের পর মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখতে পেলেন, ইহুদিরাও এই দিনে রোজা রাখছে।

প্রিয় নবী (সা.) তাদের রোজার কারণ জানতে পারলেন, এদিনে মুসা (আ.) সিনাই পাহাড়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওরাত লাভ করেন। এদিনেই তিনি বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কয়েদখানা থেকে উদ্ধার করেন এবং এদিনেই তিনি বনি ইসরাইলদের নিয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করেন। আর ফেরাউন সেই সাগরে ডুবে মারা যায়। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ইহুদিরা এই দিন রোজা রাখে।

মহানবী (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ। অতঃপর তিনি মহররমের ৯-১০ অথবা ১০-১১ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে বললেন, যাতে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়।

দ্বিতীয় হিজরিতে রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হলে আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। তবে রমজানের রোজা রাখার পর আশুরার রোজা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এ মাসের নফল রোজা ও অন্যান্য ইবাদত রমজান মাস ব্যতীত অন্য যেকোনো মাস অপেক্ষা অধিক উত্তম। (মুসলিম ও আবুদাউদ)।

হজরত কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আশাবাদী আল্লাহ তাআলা এর অছিলায় অতীতের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (তিরমিজি ও মুসনাদে আহমাদ)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রমজানের রোজার পর মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ, যেমন ফরজ নামাজের পর শেষ রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন।

উম্মুল মুমিনিন হজরত হাফসা (রা.) বলেন, রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারটি কাজ কখনো পরিত্যাগ করেননি। আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, আইয়ামে বিদের রোজা তথা প্রতি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোজা এবং ফজর ওয়াক্তে ফরজের আগে দুই রাকাত সুন্নাত নামাজ।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধি করবে, ভালো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করবে; আল্লাহ সারা বছর তার প্রাচুর্য বাড়িয়ে দেবেন।’

হজরত সুফিয়ান ছাওরি তাবিয়ি (রহ.) বলেন, ‘আমরা এটি পরীক্ষা করেছি এবং যথার্থতা পেয়েছি।’ (মিশকাত: ১৭০; ফয়জুল কালাম: ৫০১, পৃষ্ঠা ৩৪৯; বায়হাকি ও রাজিন)।

মহররম মাস সম্পর্কে সাধারণে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন এই মাসে বিয়েশাদি না করা, নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ না করা, কোনো শুভ কাজ বা ভালো কাজের সূচনা না করা, গোশত না খাওয়া ও নিরামিষ আহার করা, পান না খাওয়া, নতুন কাপড় ও সুন্দর পোশাক পরিধান না করা, সাদা কাপড় বা কালো কাপড় তথা শোকের পোশাক পরা, সব ধরনের আনন্দ উৎসব পরিহার করা ইত্যাদি। এসবই কুসংস্কার। কোরআন ও হাদিসে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। ইবাদত ও ইসলামি পর্বসমূহ কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে পালন করা বিধেয়, দলিল–প্রমাণহীন আমলে সুফল আশা করা যায় না। বরং এতে বহুবিধ ক্ষতির আশঙ্কা বিদ্যমান রয়েছে।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-